বুধবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২৬
২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত বিকাশে মানবজাতির অস্তিত্ব বিলুপ্তির চরম শঙ্কা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৫৬ পিএম

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত বিকাশে মানবজাতির অস্তিত্ব বিলুপ্তির চরম শঙ্কা
ছবি : Collected

প্রযুক্তি বিশ্বের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় বিস্ময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মানবসভ্যতার জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তুমুল বিতর্কের মাঝেই এক ভয়াবহ সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।

 

প্রখ্যাত এআই গবেষণা ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের শীর্ষ নিরাপত্তা গবেষক ইভান হাবিংগার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বর্তমানে যে অকল্পনীয় দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে আগামী এক দশকের মধ্যেই পৃথিবী থেকে মানুষের অস্তিত্ব সম্পূর্ণ মুছে যাওয়ার এক চরম শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

 

তার মূল্যায়নে, এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের কারণে মানবজাতির চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অন্তত দশ শতাংশের বেশি। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই সতর্কবার্তাকে মানবসভ্যতার ভবিষ্যতের জন্য এক অশনিসংকেত হিসেবে আখ্যায়িত করছে।

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে ইভান হাবিংগার এই ভীতিকর আশঙ্কার কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, যদিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বর্তমান মডেলগুলোর ঝুঁকির মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশ কম বলে মনে হচ্ছে, তবে এই প্রযুক্তি খুব শিগগিরই নিজে থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এত উন্নত ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে যা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে।

 

মূলত সম্প্রতি অ্যানথ্রোপিক ছেড়ে যাওয়া এবং পূর্বে ওপেনএআই-তে কর্মরত এআই গবেষক জ্যাকব কক্সনের একটি এক্স পোস্টের সূত্র ধরেই হাবিংগার এই গুরুতর মন্তব্য করেন। জ্যাকব কক্সন তার পোস্টে অভিযোগ করেছিলেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে কাজ করা শীর্ষস্থানীয় কোনো প্রতিষ্ঠানই দায়িত্বশীল আচরণ করছে না।

 

তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, অদূর ভবিষ্যতে এই মডেলগুলো মানুষের চেয়েও শক্তিশালী এক স্বয়ংক্রিয় সিস্টেমে পরিণত হবে। তখন এগুলো যেকোনো জায়গায় ভয়াবহ সাইবার হামলা চালাতে সক্ষম হবে, রাতারাতি বিশ্বের যেকোনো শিল্প খাতে অভাবনীয় বিপ্লব ঘটাবে এবং নিজস্ব ক্ষমতা ও বিপুল সম্পদ সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিতে পারবে, যা মানবজাতির জন্য এক অস্তিত্বের চরম সংকট তৈরি করবে।

 

ইভান হাবিংগার মূলত কাজ করেন অ্যানথ্রোপিকের ‘এআই অ্যালাইনমেন্ট’ বিভাগে। এই বিভাগের মূল দায়িত্ব ও কাজ হলো মানুষের নৈতিকতা, মূল্যবোধ এবং আদর্শকে প্রযুক্তির অ্যালগরিদমে এমনভাবে রূপান্তর করা, যাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনোভাবেই মানুষের ক্ষতি করতে না পারে।

 

কিন্তু এই খাতের অনেক শীর্ষ গবেষক চরম হতাশার সঙ্গে জানাচ্ছেন যে, এআইকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে রাখার এই আপ্রাণ চেষ্টাগুলো চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। হাবিংগার তার পোস্টে অত্যন্ত সততার সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে, সুপারইন্টেলিজেন্স বা অতি-বুদ্ধিমান এআইকে মানুষের নিয়ন্ত্রণে বা নৈতিক সীমানার মধ্যে আটকে রাখার মতো কোনো সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদ্ধতি এখনো মানুষের হাতে নেই এবং গবেষকরা সেই পথে খুব একটা এগোতেও পারছেন না।

 

চলতি বছরের গ্রীষ্মে ঘটে যাওয়া একাধিক সাইবার ঘটনাই এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ, যেখানে স্বায়ত্তশাসিত এআই এজেন্টগুলো নিজেরাই সাইবার হামলা পরিচালনা করেছে। ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক এবং মেটার মতো শীর্ষ প্রযুক্তি সংস্থাগুলোও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে, তাদের তৈরি করা এআই টুল ব্যবহার করেই বেশ কিছু সাইবার হামলার ঘটনা ঘটেছে।

 

বিশেষজ্ঞদের এই গুরুতর সতর্কবার্তা ও উদ্বেগের বিষয়ে শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য করা হয়নি। অ্যানথ্রোপিকও নিজেদের কর্মীদের এমন বক্তব্য বা এআই সংক্রান্ত কোনো জটিলতা নিয়ে মুখ খুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

 

তবে জাতিসংঘকে এআই বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া বিশিষ্ট কম্পিউটার বিজ্ঞানী ডেম ওয়েন্ডি হল বিবিসি রেডিও ফোর-এর এক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে হাবিংগার ও কক্সনের এমন বার্তা দেখে চরম বিস্ময় ও স্তম্ভিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন।

 

তিনি এই সতর্কবার্তার পেছনে অন্য একটি ব্যবসায়িক কারণ থাকতে পারে বলে সন্দেহ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অ্যানথ্রোপিক এবং ওপেনএআইয়ের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শিগগিরই শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

 

তাই তাদের এই ধরনের অস্তিত্ব বিলুপ্তির বক্তব্য নিছক প্রচার ও বিপণন কৌশলের অংশও হতে পারে, যাতে বিশ্ববাসীর মনোযোগ আকর্ষণ করা যায়। ওয়েন্ডি হল আরও বলেন, যদি এমন ভয়াবহ পরিণতিই তাদের কোম্পানির মূল লক্ষ্য বা মূল্যবোধ হয়, তাহলে বিনিয়োগকারীদের উচিত হবে না এ ধরনের বিপজ্জনক প্রতিষ্ঠানে কোনো পুঁজি বিনিয়োগ করা।

 

অন্যদিকে, ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, এআই ঝুঁকি মূল্যায়নে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ সংস্থা যুক্তরাজ্যের ‘এআই সেফটি ইনস্টিটিউট’-কে নিজেদের সর্বশেষ প্রযুক্তি মডেল পরীক্ষা করে দেখতে দেয়নি অ্যানথ্রোপিক, যা সন্দেহ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

 

গত আগস্ট মাসে প্রকাশিত অ্যানথ্রোপিকের নিজস্ব নিরাপত্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, তাদের তৈরি এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজস্ব সিস্টেমে হস্তক্ষেপ করবে বা অন্য কোনো শক্তির অনুগত হয়ে বড় ধরনের ক্ষতিসাধন করবে-এমন সম্ভাবনা আপাতত বেশ কম।

 

এআই নিজে নিজে গবেষণা চালিয়ে মানবজাতির বড় ধরনের ক্ষতি করবে, সে ধরনের আশঙ্কাও কম বলে তখন জানানো হয়েছিল। তবে প্রতিষ্ঠানটি এখন স্বীকার করছে যে, পূর্বের তুলনায় এই নিরাপত্তা মূল্যায়নে তারা কিছুটা কম আত্মবিশ্বাসী।

 

তারা দেখতে পাচ্ছে যে, এআইয়ের অনিয়ন্ত্রিত গতি ও অগ্রগতির বেশ কিছু প্রাথমিক ও বিপজ্জনক লক্ষণ ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। ২০২৩ সালে ওপেনএআই, গুগল ডিপমাইন্ড এবং অ্যানথ্রোপিকের প্রধানরা যৌথভাবে এই ধরনের বিপদের কথা জানিয়েছিলেন।

 

কিন্তু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনোভাবেই আর এআইয়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে না পারায় এই উদ্বেগ এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ওপেনএআইয়ের প্রধান বিজ্ঞানী জেকুব প্যাকোস্কি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই অদম্য ও অপ্রতিরোধ্য গতি নিয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বনের জোর তাগিদ দিয়েছেন।

 

ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ যেন কোনোভাবেই মানুষের হাতছাড়া হয়ে যন্ত্রের কাছে চলে না যায়, তা নিশ্চিত করতে তিনি এআই নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর বৈশ্বিক হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। অ্যানথ্রোপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই এবং জ্যারেড কাপলানসহ শীর্ষ কর্তারাও সম্প্রতি এআইয়ের এই অভাবনীয় অগ্রগতির গতি কিছুটা কমিয়ে দেওয়ার পক্ষে জোরালো মত দিয়েছেন।

 

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় এক হাজার তিনশ কর্মী স্বাক্ষরিত এক খোলা চিঠিতে মার্কিন সরকারের কাছে কঠোর দাবি জানানো হয়েছে, ওয়াশিংটন যেন অতি-উন্নত এআই প্রযুক্তির উন্মোচন ও বিকাশকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে দ্রুত আইনি কাঠামো প্রণয়ন করে।

 

- বিবিসি