শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:২০ পিএম

ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং
ছবি : Collected

উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাষ্ট্রীয় আতিথেয়তায় নয়াদিল্লিতে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্মেলনটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

 

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দুই প্রভাবশালী প্রতিবেশী দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরাজমান কূটনৈতিক শীতলতা, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও সীমান্ত উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে শি জিনপিংয়ের এই সফরকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সংবেদনশীল একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

 

শীর্ষ সম্মেলনের বহুমুখী আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির পাশাপাশি শনিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে চীনা প্রেসিডেন্টের একটি বহুল প্রতীক্ষিত আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গভীর নজর এখন নয়াদিল্লির এই শীর্ষ বৈঠকের দিকে নিবদ্ধ, যা উভয় দেশের ভবিষ্যৎ পারস্পরিক সম্পর্কের রূপরেখা ও গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করতে পারে।

 

দুই শীর্ষ নেতার এই আসন্ন আলোচনাকে ঘিরে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে নয়াদিল্লিস্থ চীনা দূতাবাস। ভারতে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত শু ফেইহং উভয় দেশের কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, রাষ্ট্রপ্রধানদের কৌশলগত দূরদর্শিতা ও দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে বেইজিং নতুন দিল্লির সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করতে সর্বাত্মকভাবে আগ্রহী।

 

তিনি সুস্পষ্টভাবে জানান যে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় পারস্পরিক বোঝাপড়া দৃঢ় করতে নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ বৃদ্ধি করা, বহুমাত্রিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং বিদ্যমান মতপার্থক্যগুলো অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও যথাযথ প্রক্রিয়ায় মোকাবিলা করার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে চীন।

 

আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক শান্তি ও টেকসই অর্থনৈতিক অগ্রগতির স্বার্থে দুই দেশের মধ্যে খোলামেলা কূটনৈতিক সংলাপের কোনো বিকল্প নেই বলেও কূটনীতিক মহলে মত প্রকাশ করা হচ্ছে।

 

চীনা রাষ্ট্রদূত শু ফেইহং তাঁর বক্তব্যে আরও স্মরণ করিয়ে দেন যে, এটি দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে কোনো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন যোগাযোগ নয়, বরং ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগেরই একটি উজ্জ্বল প্রতিফলন।

 

এর আগে কাজাখস্তানের কাজান এবং চীনের তিয়ানজিনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক কাঠামোর ফাঁকে এই দুই প্রভাবশালী নেতা ফলপ্রসূ সংলাপে মিলিত হয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ণ রেখে নয়াদিল্লির এই শীর্ষ বৈঠকের মধ্য দিয়ে টানা তৃতীয় বছরের মতো নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং একে অপরের মুখোমুখি আনুষ্ঠানিক আলোচনায় বসছেন।

 

বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক জোটের বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে এমন নিয়মিত সরাসরি মতবিনিময় পারস্পরিক নিরাপত্তা, আঞ্চলিক বাণিজ্যিক সহযোগিতা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নতুন আস্থার বাতাবরণ গড়ে তুলবে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকগণ মনে করছেন।

 

উল্লেখ্য, বিগত কয়েক বছর ধরে এশিয়ার এই দুই পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর সামগ্রিক সম্পর্ক একটি অভূতপূর্ব কঠিন, সংবেদনশীল ও জটিল অধ্যায় অতিক্রম করেছে। বিশেষ করে ২০২০ সালের মাঝামাঝি সময়ে লাদাখের বিতর্কিত গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনের সামরিক বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত রক্তক্ষয়ী সীমান্ত সংঘর্ষের পর উভয় দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যে এক নজিরবিহীন অচলাবস্থা এবং দীর্ঘস্থায়ী তীব্র টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছিল।

 

কয়েক দশক ধরে শান্তিচুক্তির ভিত্তিতে বজায় থাকা সীমান্ত স্থিতিশীলতার ওপর সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাটি এক মারাত্মক আঘাত হানে এবং পরবর্তীতে উভয় দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক মহলে গভীর অবিশ্বাসের দেয়াল তৈরি করে।

 

তবে সেই তিক্ত ইতিহাস ও দীর্ঘদিনের দূরত্ব পেছনে ফেলে সাম্প্রতিক সময়ে উভয় পক্ষের কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও কার্যকর মধ্যস্থতায় সম্পর্কের জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করেছে। দুই দেশের সামরিক ও বেসামরিক প্রতিনিধিদের ধারাবাহিক ফলপ্রসূ বৈঠকের পরিক্রমায় সীমান্ত উত্তেজনা হ্রাস পাওয়ার এবং সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের ইতিবাচক লক্ষণগুলো ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনটি এমন এক জটিল বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং সামগ্রিক ভূ-রাজনীতি বহুমুখী সংকটের ঘূর্ণাবর্তে আবর্তিত।

 

বিকাশমান অর্থনীতিগুলোর অর্থনৈতিক অধিকার সুরক্ষা এবং একটি ভারসাম্যপূর্ণ বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ব্রিকস জোটের ভূমিকা দিন দিন আরও বেশি সুসংহত ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

 

এই প্রেক্ষাপটে নয়াদিল্লিতে ভারতের বলিষ্ঠ স্বাগতিক নেতৃত্ব এবং শীর্ষ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রপ্রধানের ইতিবাচক অংশগ্রহণ কেবল ব্রিকসকে নতুন গতিশীলতাই দেবে না, বরং পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে এশিয়ার সবচেয়ে প্রভাবশালী দুই দেশের একত্রে এগিয়ে চলার একটি নতুন সুযোগও সৃষ্টি করবে।

 

তাই নয়াদিল্লির এই দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠকটি দীর্ঘদিনের বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে এক নতুন সৌহার্দ্যপূর্ণ কূটনৈতিক যুগের সূচনা করতে পারবে কি না, সেদিকেই এখন তাকিয়ে রয়েছে সচেতন বিশ্ব।

 

- এনডিটিভি