আগামী শনিবার, অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বর এই শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়েছে।
এশিয়ার দুই বৃহৎ পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীর শীর্ষ নেতৃত্বের এই মুখোমুখি আলোচনা আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা ব্যাপকভাবে মনে করছেন।
প্রায় দীর্ঘ সাত বছর পর প্রথমবারের মতো ভারত সফরে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। হিমালয় সংলগ্ন বিতর্কিত সীমান্ত অঞ্চলে সামরিক উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে পারমাণবিক শক্তিধর দুই প্রভাবশালী প্রতিবেশীর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা চরম কূটনৈতিক টানাপোড়েন ও বৈরিতার পর সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এক সচেতন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই সফরটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
দুই দেশের সম্পর্কের এই দীর্ঘকালীন বরফ গলে নতুন করে সমঝোতার পরিবেশ তৈরি হওয়ার প্রেক্ষাপটে শি জিনপিংয়ের নয়াদিল্লির মাটিতে পা রাখার ঘটনাটিকে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক একটি অগ্রগতি হিসেবে মূল্যায়ন করছেন।
উভয় পক্ষই এখন সীমান্ত সংঘাতের ছায়া পেরিয়ে পারস্পরিক আস্থা পুনর্বহাল এবং বাণিজ্যিক স্থায়িত্ব ফিরিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করছে। ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এই বহুদেশীয় সম্মেলনে শুধু চীনই নয়, বরং আরও কয়েকটি প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গেও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত থাকবেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
সম্মেলনের ফাঁকে চীনের প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও পৃথক পৃথক দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেবেন নরেন্দ্র মোদি।
বর্তমান জটিল ও সংঘাতপূর্ণ বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক সমীকরণে ব্রিকস জোটের এই সমাবেশ এবং সদস্য দেশগুলোর নেতাদের মধ্যকার এমন ব্যক্তিগত আনুষ্ঠানিক বৈঠক বিশ্ব কূটনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশেষ করে পশ্চিমের সঙ্গে জটিল সমীকরণের আবহে ভারত, চীন, রাশিয়া ও ইরানের এমন শীর্ষ সম্মেলন এক বহুমুখী কৌশলগত ভারসাম্য তুলে ধরছে। নরেন্দ্র মোদি এবং শি জিনপিংয়ের মধ্যকার এই আসন্ন বৈঠকটি মূলত বিগত কয়েক মাসের অব্যাহত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি সফল পরিণতি।
এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে রাশিয়ার কাজান শহরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ফাঁকে তাদের মধ্যে সর্বশেষ আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক বৈঠকের ঠিক আগেই দুই দেশ তাদের মধ্যকার বিরোধপূর্ণ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখায় দীর্ঘদিনের সামরিক অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট ও সমঝোতামূলক চুক্তিতে পৌঁছাতে সক্ষম হয়।
এরপর গত আগস্ট মাসে চীনের তিয়ানজিন শহরে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার বৈঠকের ফাঁকেও দুই নেতা একটি সংক্ষিপ্ত ফলপ্রসূ আলোচনায় মিলিত হয়েছিলেন। এমনকি কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে অনুষ্ঠিত একই আন্তর্জাতিক সংস্থার বার্ষিক সম্মেলনের পারিবারিক স্থিরচিত্র তোলার শুভমুহূর্তেও এই দুই রাষ্ট্রনায়ককে নিজেদের মধ্যে আন্তরিক আলাপচারিতায় মগ্ন থাকতে প্রত্যক্ষ করা গিয়েছিল।
চীনা প্রেসিডেন্টের এই সফরের একটি সুদূরপ্রসারী ঐতিহাসিক ও কৌশলগত তাৎপর্য বিদ্যমান। ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসের পর এই প্রথম ভারতের মাটিতে পা রাখতে চলেছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সেই বছর ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য তামিলনাড়ুর মামাল্লাপুরমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিতীয় অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
তবে সেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সাক্ষাতের মাত্র ছয় মাসের মাথায় লাদাখ সীমান্ত অঞ্চলে দুই দেশের সেনাবাহিনীর মধ্যকার প্রাণঘাতী রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের মারাত্মক অবনতি ঘটে। এর ফলে ভারত ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক গত প্রায় ছয় দশকের মধ্যে সবচেয়ে বিপজ্জনক ও তিক্ত তলানিতে গিয়ে ঠেকেছিল।
দীর্ঘদিন ধরে সেনা মোতায়েন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং কূটনৈতিক স্থবিরতার পর অবশেষে সেই অচলাবস্থার অবসান ঘটিয়ে দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের পুনরায় একত্র হওয়া এশীয় অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।