শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাত বছর পর শি জিনপিংয়ের ভারত সফর, দিল্লি-বেইজিং সম্পর্কের বরফ কি গলবে?

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:০৭ পিএম

সাত বছর পর শি জিনপিংয়ের ভারত সফর, দিল্লি-বেইজিং সম্পর্কের বরফ কি গলবে?
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ সাত বছরের বিরতির পর পুনরায় ভারত সফরে আসছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে তিনি অংশগ্রহণ করবেন।

 

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তার কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়।

 

এর আগে ২০১৯ সালে ভারতের চেন্নাইয়ের নিকটবর্তী মামাল্লাপুরমে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন শি জিনপিং। কিন্তু ২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চীনা সেনাদের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ দুই দেশের সম্পর্কে এক গভীর সংকটের জন্ম দেয়।

 

সেই বৈরী প্রেক্ষাপটের পর চীনের প্রেসিডেন্টের আসন্ন এই সফরকে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলানোর ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।

 

বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের এই সফর কেবল ভারত-চীন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের জন্যই নয়, বরং ব্রিকসের অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা এবং বৃহত্তর বৈশ্বিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

 

বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তায় তৈরি হওয়া গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যেই এই সফর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২০ সালের জুনে গালওয়ান উপত্যকায় সামরিক সংঘর্ষে ২০ জন ভারতীয় সেনা এবং চীনের চারজন সেনা নিহত হওয়ার পর থেকে উভয় দেশের সম্পর্কে চরম অবনতি ঘটে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগেও।

 

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাশিয়ার কাজানে এবং চীনের তিয়ানজিনে ব্রিকস ও সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের মতো বহুজাতিক সম্মেলনের ফাঁকে নরেন্দ্র মোদী ও শি জিনপিংয়ের মধ্যকার বৈঠকগুলো সেই ইঙ্গিতই দেয়।

 

এছাড়া প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (এলএসি) থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং সামরিক পর্যায়ের নিয়মিত ফ্ল্যাগ মিটিংগুলোর মাধ্যমে উভয় দেশ নতুন করে সংঘাত এড়িয়ে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে।

 

আন্তর্জাতিক রাজনীতির পটপরিবর্তন, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক কঠোর বাণিজ্যনীতি এবং উভয় দেশের ওপর মার্কিন শুল্ক আরোপের বিষয়টিও নয়াদিল্লি ও বেইজিংকে তাদের নিজেদের স্বার্থে কূটনৈতিক হিসাব-নিকাশ নতুন করে মূল্যায়নে বাধ্য করেছে।

 

রাজনৈতিক ও সীমান্ত সম্পর্কের উত্তেজনা কিছুটা প্রশমিত হলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারত ও চীনের মধ্যে এখনো বেশ কিছু জটিলতা বিদ্যমান। নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের (ওআরএফ) ভাইস প্রেসিডেন্ট হর্ষ ভি পন্থের মতে, আস্থার চরম সংকটের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যকার বাণিজ্য ঘাটতি সম্পর্ক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান অন্তরায়।

 

বর্তমানে এই বাণিজ্য ঘাটতি ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। ভারতের প্রধান উদ্বেগ হলো, চীনের বিশাল বাজারে ভারতীয় পণ্য, বিশেষ করে কৃষিপণ্য ও ভোগ্যপণ্য পর্যাপ্ত প্রবেশাধিকার পাচ্ছে না।

 

অন্যদিকে, শি জিনপিং এই সফরে প্রায় চার শতাধিক সদস্যের একটি বৃহৎ প্রতিনিধিদল নিয়ে আসছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার মূল লক্ষ্য দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ। গালওয়ান সংঘর্ষের পর ভারত সরকার ইলেকট্রনিকস, মূলধনী পণ্য ও সৌরশক্তির মতো খাতে চীনা বিনিয়োগের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল।

 

তবে সম্প্রতি স্মার্টফোন উৎপাদনের মতো কিছু নির্দিষ্ট খাতে যৌথ উদ্যোগের অনুমোদন দিয়ে ভারত তাদের অবস্থান কিছুটা শিথিল করেছে। তারপরও বিওয়াইডি বা গ্রেট ওয়াল মোটরের মতো বৃহৎ চীনা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো নানামুখী নীতিগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

 

বাণিজ্যিক সহযোগিতা বৃদ্ধির এই চেষ্টার মধ্যেই উভয় দেশের তরফ থেকে নেওয়া বেশ কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলেছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ভারতের তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে চীনা আর্থিক প্রতিষ্ঠান আলিপের সংযুক্তির প্রস্তাব সম্প্রতি বাতিল করেছে নয়াদিল্লি।

 

এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে চীনা মোবাইল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান শাওমির বিরুদ্ধেও তদন্ত চলমান রয়েছে। বিপরীত দিকে, চীনও তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি, সৌর প্যানেল ও সুড়ঙ্গ নির্মাণের যন্ত্রপাতি ভারতে রপ্তানির ক্ষেত্রে কাস্টমস বাধানিষেধ ও কড়াকড়ি আরোপ করে রেখেছে।

 

তা সত্ত্বেও, চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্যের পরিমাণ ১৫১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় চীন পুনরায় ভারতের শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদারে পরিণত হয়েছে।

 

সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ লিন মিনওয়াং মনে করেন, চীন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আন্তরিক হলেও তারা দিল্লির সদিচ্ছার দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখছে।

 

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, শি জিনপিংয়ের আসন্ন ভারত সফরকে কেন্দ্র করে রাতারাতি কোনো নাটকীয় পরিবর্তনের আশা করছেন না আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। বরং এটি দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস দূর করে ধীরে ধীরে একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক নির্মাণের পথে অগ্রসর হওয়ার একটি সূচনাবিন্দু হতে পারে।

 

ভারত যেমন চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে নিজেদের দেশীয় উৎপাদন খাতকে সমৃদ্ধ করে বৈশ্বিক ভ্যালু চেইনে এগিয়ে যেতে আগ্রহী, তেমনি চীনেরও তাদের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য ভারতের এই বিশাল বাজার অত্যন্ত প্রয়োজন।

 

দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত বিরোধ ও ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কঠিন বাস্তবতা মেনে নিয়ে, এই শীর্ষ সফরের মাধ্যমে দিল্লি ও বেইজিং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রে নতুন কোনো সমীকরণে পৌঁছাতে পারে কি না, সেটিই এখন বিশ্ব কূটনীতির অন্যতম প্রধান আগ্রহের বিষয়।

 

- বিবিসি