শনিবার, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২৬
২৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
নয়াদিল্লিতে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন

সব ধরনের আগ্রাসনের নিন্দায় সদস্য দেশগুলোর ঐতিহাসিক যৌথ ঘোষণা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম

সব ধরনের আগ্রাসনের নিন্দায় সদস্য দেশগুলোর ঐতিহাসিক যৌথ ঘোষণা
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শুরু হওয়া এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে একটি ঐতিহাসিক মতৈক্যে পৌঁছেছে জোটের সদস্য দেশগুলো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চলমান নানামুখী সংকট ও মেরুকরণের মধ্যেই এই জোটের নেতারা একটি সম্মিলিত যৌথ ঘোষণা প্রকাশ করতে সম্মত হয়েছেন।

 

শনিবার ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এই ঘোষণাপত্রে সুনির্দিষ্টভাবে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করেই বিশ্বে চলমান ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ কঠোর ও দ্ব্যর্থহীন নিন্দা জানানো হবে।

 

বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়ায় বিরাজমান তীব্র সংঘাত ও যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে ব্রিকস নেতাদের এই অভিন্ন অবস্থানকে বৈশ্বিক কূটনীতির মঞ্চে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা।

 

ভারতের সভাপতিত্বে আয়োজিত এইবারের সম্মেলনে ‘ব্রিকস নয়াদিল্লি ঘোষণা’ শীর্ষক এই যৌথ বিবৃতিটি শনিবার স্থানীয় সময় বিকেল চারটায় আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। বেলা আড়াইটায় শুরু হওয়া এই শীর্ষ সম্মেলনটি রোববার পর্যন্ত টানা চলবে।

 

এবারের এই যৌথ ঘোষণায় সদস্য দেশগুলোকে একমঞ্চে আনতে পারাকে স্বাগতিক ভারতের জন্য এক বিশাল কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর আগে চলতি বছরের মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকেও একটি যৌথ ঘোষণা প্রকাশের জোরালো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।

 

কিন্তু সে সময় পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে ভারতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ দুই মিত্র রাষ্ট্র-ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার মতপার্থক্যের কারণে ওই উদ্যোগ চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়।

 

তবে এবারের শীর্ষ সম্মেলনে পর্দার আড়ালে থাকা ব্রিকস শেরপা এবং ভারতীয় শীর্ষস্থানীয় কূটনীতিকদের নিরলস প্রচেষ্টায় সেই মতবিরোধ দূর করে সবাইকে একটি অভিন্ন ঘোষণাপত্রে রাজি করানো সম্ভব হয়েছে, যা ভারতের কূটনৈতিক সক্ষমতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

 

এবারের ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে বৈশ্বিক অর্থনীতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিম এশিয়া বা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট।

 

এই যৌথ ঘোষণায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হচ্ছে যে, যেকোনো ধরনের সংঘাত ও রক্তপাতের স্থায়ী অবসানে সামরিক শক্তি প্রয়োগ কখনোই সমাধান হতে পারে না; বরং নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ ও গঠনমূলক কূটনীতিকেই একমাত্র গ্রহণযোগ্য পথ হিসেবে বেছে নিতে হবে।

 

বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ভূমিকা অপরিহার্য। তাই সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, সেদিকেও এই ঘোষণায় বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে।

 

স্বাগতিক নয়াদিল্লি এই মঞ্চ থেকে বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের স্বার্থে সমুদ্রপথে সরবরাহবাহী বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি।

 

বৈশ্বিক অর্থনীতির এই প্রভাবশালী জোটের সম্মেলনে অংশ নিতে ইতিমধ্যেই নয়াদিল্লির জাঁকজমকপূর্ণ ‘ভারত মণ্ডপম’-এ জড়ো হয়েছেন বিশ্বনেতারা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ জোটের অন্যান্য শীর্ষ নেতারা।

 

শনিবার সকালেই কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে নয়াদিল্লিতে এসে পৌঁছান চীনের রাষ্ট্রপ্রধান শি জিনপিং। দীর্ঘ সাত বছর পর এটি তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক ভারত সফর, যা এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

 

শীর্ষ সম্মেলনের আনুষ্ঠানিকতার ফাঁকে শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। মূল সম্মেলন শুরুর আগেই বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ মেলাতে তৎপর ছিলেন স্বাগতিক দেশের প্রধানমন্ত্রী।

 

শুক্রবার শীর্ষ সম্মেলনের প্রাক্কালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে পৃথকভাবে গভীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠক সম্পন্ন করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মতে, মাত্র দুই সপ্তাহেরও কম সময়ের ব্যবধানে ইরানি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর এটি দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠক। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এই বৈঠকে ভারত ও ইরানের দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত সম্পর্কের পাশাপাশি পশ্চিম এশিয়ার সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।

 

ভারত বরাবরই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পক্ষে নিজেদের অবস্থান বিশ্বমঞ্চে স্পষ্ট করেছে। নয়াদিল্লি জোরালোভাবে মনে করে, এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের সমাধানে একতরফা সামরিক পদক্ষেপ কোনো সুফল বয়ে আনবে না, বরং সংলাপ ও কূটনীতিকেই সামনে এগোনোর একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

 

বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ব্রিকস জোট ধীরে ধীরে একটি বহুমুখী এবং শক্তিশালী প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোর একক আধিপত্যের বাইরে গিয়ে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় এই জোটকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করছে।

 

নয়াদিল্লির এই শীর্ষ সম্মেলন এবং সেখানে গৃহীত ‘সব ধরনের আগ্রাসনের’ বিরুদ্ধে যৌথ ঘোষণা এটাই প্রমাণ করে যে, অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বৈশ্বিক শান্তির প্রশ্নে জোটের সদস্য দেশগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকতে বদ্ধপরিকর।

 

- এনডিটিভি