ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় নিশ্চিত করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে শুধুমাত্র একটি নয়, বরং সম্পূর্ণ আলাদা দুটি সফরের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
এর মধ্যে একটি হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় সফর এবং অপরটি হলো বহুজাতিক অর্থনৈতিক জোট ব্রিকসের শীর্ষ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই আনুষ্ঠানিক ঘোষণার মাধ্যমে দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগের প্রকৃত চিত্রটি জনসমক্ষে সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত হলো।
এই কূটনৈতিক আলোচনার সূত্রপাত ঘটে গত ১০ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় বা কিসের ভিত্তিতে ভারতে রাষ্ট্রীয় সফরে যাবেন।
সে সময় তিনি প্রকাশ্যে দাবি করেছিলেন, বাংলাদেশ সরকারের কোনো শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিকে ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য কোনো পত্র বা আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মূলত আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনের একটি বিশেষ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
তাকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একক কোনো রাষ্ট্রীয় বা দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়নি বলে তিনি জোর দিয়েছিলেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই সুনির্দিষ্ট ও প্রকাশ্য দাবির পর দেশি-বিদেশি আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে বেশ ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এই বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ শুরু করেন। এর ঠিক পরপরই, পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে আজ ১৫ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত এক নিয়মিত ও আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালকে এই বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেন উপস্থিত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকরা।
সেই প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই শীর্ষ পদস্থ কর্মকর্তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও পেশাদার ভাষায় আগের সমস্ত দাবিগুলো খণ্ডন করেন। তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন যে, ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে প্রথমেই একটি পূর্ণাঙ্গ দ্বিপাক্ষিক সফরের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
পরবর্তীতে, বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আয়োজিত ব্রিকস সম্মেলনে বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে অংশগ্রহণের জন্য তাকে দ্বিতীয়বারের মতো আরেকটি পৃথক আমন্ত্রণপত্র পাঠানো হয়। মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের কাছ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি প্রেক্ষাপটে এবং ভিন্ন দুটি উদ্দেশ্যে পৃথক দুটি আমন্ত্রণ পেয়েছেন, যার একটি দ্বিপাক্ষিক সফর এবং অপরটি ব্রিকস সম্মেলন কেন্দ্রিক।
এই দ্বিপাক্ষিক ও বহুজাতিক আমন্ত্রণের পেছনের পটভূমি গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এর আগেও বেশ কয়েকবার গণমাধ্যমের সামনে এই দ্বিপাক্ষিক আমন্ত্রণের কথা উল্লেখ করেছিল।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন দেশের নতুন সরকারের প্রধান হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেন, তার ঠিক পরপরই তাকে এই সম্মানজনক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
শুধু তাকে একাই নয়, বরং তার স্ত্রী ও সন্তানসহ সপরিবারে ভারতে একটি দ্বিপাক্ষিক সফর সম্পন্ন করার জন্য নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলো আগেই নিশ্চিত করেছিল।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও নিবিড় ও জোরদার করার লক্ষ্যেই নতুন সরকার গঠনের পরপরই এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক সফরগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
অন্যদিকে, বর্তমান বিশ্বে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর বহুজাতিক জোট ব্রিকস নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটটিও বাংলাদেশের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও বাংলাদেশ সরাসরি ব্রিকস জোটের কোনো পূর্ণাঙ্গ বা সহযোগী সদস্য রাষ্ট্র নয়, তবুও এই জোটে বাংলাদেশের উপস্থিতি আঞ্চলিক স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ।
উল্লেখ্য, গত ১২ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে ব্রিকস দেশগুলোর যে শীর্ষ সম্মেলন সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি আরও বেশ কয়েকটি বন্ধুপ্রতিম দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও শীর্ষ প্রতিনিধিদের বিশেষ অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।
সেই বিশাল আন্তর্জাতিক সম্মেলনের একটি বিশেষ অংশ বা 'আউটরিচ সেশন'-এ দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্যই মূলত বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যানের পদে আসীন থাকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অত্যন্ত সম্মানজনক এই আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত সরকার।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ ধরনের উচ্চপর্যায়ের আমন্ত্রণ এবং তা নিয়ে নিজ দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের বিপরীতমুখী বক্তব্য অনেক সময়ই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনাকাঙ্ক্ষিত কূটনৈতিক বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে, যা একেবারেই কাম্য নয়।
তবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই সুস্পষ্ট ও দাপ্তরিক বিবৃতির পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের আমন্ত্রণ সংক্রান্ত গত কয়েক দিনের সকল জল্পনা-কল্পনার চূড়ান্ত অবসান ঘটেছে বলে জোরালোভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এখন বাংলাদেশ সরকার এই দ্বিপাক্ষিক এবং বহুজাতিক জোড়া আমন্ত্রণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক চ্যানেলে কী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার উচ্চ পর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগের চূড়ান্ত ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা।
এই সফরগুলো যদি সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তবে তা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে নিঃসন্দেহে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও ইতিবাচক মাত্রা যোগ করতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহল গভীরভাবে বিশ্বাস করেন।