তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং আধুনিক প্রযুক্তির এই তীব্র প্রতিযোগিতায় যদি মুসলিম সমাজ পিছিয়ে পড়ে, তবে তারা বহিরাগত শক্তির প্রভাব ও এক নতুন ধরনের প্রযুক্তিগত উপনিবেশবাদের ভয়াবহ ঝুঁকিতে পতিত হতে পারে।
সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রীর এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যটি নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে সম্প্রতি ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি সফর করেন আনোয়ার ইব্রাহিম।
শীর্ষ সম্মেলন শেষে তিনি ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য কেরালার ঐতিহাসিক শহর কোঝিকোড়ে গমন করেন। সেখানে এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করেন। কোঝিকোড়ে অবস্থিত স্বনামধন্য শেখ আবু বকর ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে প্রবর্তিত প্রথমবারের মতো 'এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড' বা শ্রেষ্ঠত্ব সম্মাননা গ্রহণ করার পর উপস্থিত সুধীসমাজের উদ্দেশে এক দিকনির্দেশনামূলক ভাষণ প্রদান করেন তিনি।
ভারতের প্রখ্যাত সুন্নি আলেম এবং গ্র্যান্ড মুফতি কান্থাপুরাম এ. পি. আবুবকর মুসলিয়ার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর হাতে এই সম্মাননা স্মারকটি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে দেন। সেখানেই আধুনিক বিশ্বের গতিপ্রকৃতি এবং মুসলিম সমাজের ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে তিনি তার গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।
সভ্যতার এই চরম উৎকর্ষের যুগে জ্ঞান ও প্রযুক্তির অপরিহার্যতাকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, জ্ঞান অর্জন ছাড়া আমাদের সামনে ব্যর্থতা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই।
যদি আমরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো আধুনিক বিষয়গুলো অনুধাবন করতে ব্যর্থ হই, তবে অত্যন্ত সুকৌশলে আমরা পুনরায় উপনিবেশে পরিণত হব। তার এই বক্তব্যের মূল নির্যাস হলো, অতীতে যেমন সামরিক শক্তি ও ভূখণ্ডের দখলের মাধ্যমে উপনিবেশবাদ কায়েম হয়েছিল, বর্তমান প্রযুক্তিগত যুগে পশ্চাৎপদতার সুযোগ নিয়ে সেই একই উপনিবেশবাদ নতুন রূপে চেপে বসতে পারে।
তাই প্রযুক্তিগত পরনির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণের কোনো বিকল্প নেই বলে তিনি মনে করেন। এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তিনি সমাজের নেতৃস্থানীয় অংশ, বিশেষ করে আলেম সমাজ এবং ইসলামী পণ্ডিতদের প্রতি এক বিশেষ আহ্বান জানান।
তিনি উল্লেখ করেন, ধর্মীয় পণ্ডিতদের চিরাচরিত গণ্ডির বাইরে এসে আধুনিক বিজ্ঞান, ডিজিটাল রূপান্তর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ বর্তমান সময়ের অভাবনীয় নতুন বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে।
সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য আলেমদের আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানে সমৃদ্ধ হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। ধর্ম ও বিজ্ঞানের যে কোনো বিরোধ নেই, বরং বিজ্ঞান মনস্কতা যে সময়ের দাবি, সেই বিষয়টিই তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
তবে প্রযুক্তির এই অন্ধ অনুকরণের ক্ষেত্রে একটি সূক্ষ্ম সীমারেখার কথাও তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। প্রযুক্তিগত এই বিপুল অগ্রগতি যেন কোনোভাবেই মানুষের ধর্মীয় ও চিরন্তন নৈতিক মূল্যবোধের মূল ভিত্তিকে আঘাত করতে না পারে, সে বিষয়ে তিনি সবাইকে অত্যন্ত সজাগ থাকার পরামর্শ দিয়েছেন।
আধুনিকতাকে স্বাগত জানালেও স্বকীয়তা বিসর্জন দেওয়া যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য অত্যাধুনিক জ্ঞান ও অপরিমেয় দক্ষতার অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে, তবে প্রযুক্তির এই অবাধ বিকাশ যেন আমাদের ইমান বা বিশ্বাস এবং সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধকে সুরক্ষিত রাখে, তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষস্থানীয় গবেষক ও বিজ্ঞানীদের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ঝুঁকি, নৈতিকতা এবং এর ভবিষ্যৎ প্রভাব নিয়ে যখন তুমুল ও তীব্র বিতর্ক চলছে, তখন মুসলিম আলেম সমাজ ও চিন্তাবিদদের এই চ্যালেঞ্জগুলোর দিকে পর্যাপ্ত মনোযোগ না দেওয়ার বিষয়টিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিশ্বের অন্যান্য জাতি যখন প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকগুলো নিয়ে গবেষণা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে ব্যস্ত, তখন মুসলিম সমাজ এই আলোচনা থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন।
পরিশেষে তিনি উদাত্ত আহ্বান জানান যে, যেকোনো প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যেন নিছক যন্ত্রনির্ভর না হয়ে জ্ঞান, মানবীয় নীতি এবং ধর্মীয় মহান আদর্শের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, তা সুনিশ্চিত করতে মুসলিম বিশ্বকে এখন থেকেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।