জোটভুক্ত দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের মোট আর্থিক পরিমাণ বর্তমানে এক দশমিক দুই ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে বলে ঘোষণা দিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের ‘ব্রিকস আউটরিচ’ কাঠামোর এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে তিনি এই তথ্য তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন, সদস্য দেশগুলোর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ইতিবাচক হার, অভ্যন্তরীণ বাজারসমূহের শক্তিশালী অবস্থান এবং বহুমুখী টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্রিকস রাষ্ট্রগুলোকে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছে।
নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ওই গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্যে রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, ব্রিকস জোটের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বিকাশ দিন দিন আরও বেশি সুসংহত ও শক্তিশালী হচ্ছে। প্রতি বছর সদস্য দেশগুলোতে জনসংখ্যার হার বৃদ্ধি অভ্যন্তরীণ ভোগ ও উৎপাদনকে ত্বরান্বিত করছে, যা প্রতিটি দেশের স্থানীয় বাজারকে আরও সম্প্রসারিত ও প্রাণবন্ত করে তুলছে।
একই সঙ্গে সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ভৌগোলিক সীমানায় সব ধরণের আধুনিক ও কার্যকর অবকাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ব্রিকসের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রগুলো বর্তমানে সমগ্র বিশ্বের মোট রপ্তানি বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এককভাবে পরিচালনা করছে।
শুধু তাই নয়, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক মোট দেশজ উৎপাদনের প্রধান প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে ব্রিকস জোটের অবদান দাঁড়িয়েছে প্রায় উনপঞ্চাশ শতাংশে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক মন্দার এই সময়ে এ ধরণের অর্জন জোটটির অনন্য সক্ষমতা ও অংশীদারিত্বের সুস্পষ্ট প্রতিফলন।
প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন তাঁর বক্তব্যে দৃঢ়তার সঙ্গে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, ব্রিকস জোটের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের সম্ভাবনা এখনও শেষ হওয়া থেকে বহু দূরে রয়েছে; বরং জোটটির অন্তর্নিহিত সম্ভাবনা এখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ব্রিকসভুক্ত দেশগুলোর অর্থনীতির মধ্যে যে পারস্পরিক পরিপূরকতা বিদ্যমান, তা যথাযথভাবে কাজে লাগানোই এখন জোটের সবচেয়ে বড় সুযোগ। সদস্য দেশগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামো এবং তাদের বাণিজ্যিক বিশেষায়নের মধ্যে যে বৈচিত্র্য রয়েছে, তা বাস্তবভিত্তিক বহুপাক্ষিক সহযোগিতার বিশাল দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
এই পারস্পরিক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে সদস্য দেশগুলো নতুন নতুন শিল্প উৎপাদন ব্যবস্থা, উন্নত প্রযুক্তি বিনিময়, আধুনিক পরিষেবা খাত এবং বৃহত্তর নতুন বাজার সৃষ্টির অবাধ সুযোগ লাভ করছে।
রুশ রাষ্ট্রপ্রধান আরও ব্যাখ্যা করেন যে, ব্রিকস মূলত এমন একটি অভিন্ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কাঠামো গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে, যা প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের নিজস্ব প্রতিযোগিতামূলক সুবিধাগুলোকে স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত উপায়ে একত্রিত করবে।
এর ফলে কোনো একক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস পাবে এবং নিজেদের মধ্যে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তৈরি হওয়া নানা সংকট মোকাবিলায় ব্রিকসের এই সমন্বিত উদ্যোগ সদস্য দেশগুলোর জন্য একটি নির্ভরযোগ্য বাণিজ্যিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
সম্মেলনে পুতিন জোর দিয়ে বলেন, বিশ্বজুড়ে ব্রিকসের বহুমুখী কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আগ্রহ ও সমর্থন ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির রাষ্ট্রগুলো এখন এই জোটের আদর্শের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হচ্ছে।
তিনি বলেন, ব্রিকসের মূল দর্শন ও মূল্যবোধের ভিত্তি হলো সমতা ও সার্বজনীন সুযোগের নিশ্চয়তা। এই জোট বিশ্বের প্রতিটি দেশের জন্য তাদের নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের ক্ষেত্রে কোনো প্রকার অন্যায্য বিধিনিষেধ ছাড়াই সমান ও উন্মুক্ত সুযোগ নিশ্চিত করার পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করে।
কোনো নির্দিষ্ট শক্তির অর্থনৈতিক আধিপত্যের বদলে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে সবার উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এই জোটের অন্যতম লক্ষ্য। বক্তব্যের সমাপ্তি টেনে ভ্লাদিমির পুতিন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, ব্রিকস বর্তমান আন্তর্জাতিক সম্পর্কের রূপরেখা পুনর্গঠনে অত্যন্ত সক্রিয় ও ইতিবাচক অবদান রেখে চলেছে।
বর্তমান একপেশে বৈশ্বিক ব্যবস্থার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই জোট একটি সত্যিকারের ভারসাম্যপূর্ণ, সার্বজনীন ও বহু মেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। যেখানে প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের কণ্ঠস্বর যথাযথ শ্রদ্ধার সঙ্গে গৃহীত হবে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার সুফল সকল জাতি সমভাবে ভোগ করার অধিকার লাভ করবে।