বুধবার, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬
১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মণিপুরে নতুন করে সশস্ত্র জাতিগত সংঘাতের দাবানল

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:২৬ পিএম

মণিপুরে নতুন করে সশস্ত্র জাতিগত সংঘাতের দাবানল
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরে পুনরায় জাতিগত সংঘাত ও চরম অস্থিতিশীলতার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিনের অশান্ত পরিবেশের পর রাজ্যটির তামেংলং জেলায় সন্দেহভাজন নাগা বিদ্রোহীদের অতর্কিত গুলিবর্ষণ এবং একাধিক বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় সমগ্র অঞ্চলটি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

 

এই আকস্মিক ও বর্বরোচিত হামলায় অন্তত দুজন নারীর প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিগত মাত্র আটচল্লিশ ঘণ্টার ব্যবধানে মণিপুরের দুটি ভিন্ন জেলায় সশস্ত্র সংঘাতের বলি হয়েছেন মোট ছয়জন নিরীহ মানুষ।

 

বুধবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস নাউ-এর একটি বিস্তারিত প্রতিবেদনে মণিপুরের এই সাম্প্রতিকতম সংঘাতের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, যা গোটা দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মহলেও গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

তামেংলং জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘটে যাওয়া এই সর্বশেষ হামলায় চরম নৃশংসতার শিকার হয়েছেন ষাট বছর বয়সী বৃদ্ধা চঙ্গা সিথলো এবং ত্রিশ বছর বয়সী যুবতী কিমবোই সিংন। সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলার মুখে প্রাণ বাঁচাতে তাঁরা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের শেষ রক্ষা হয়নি। ভয়াবহ এই হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় কৃষিখেত থেকে তাঁদের বুলেটবিদ্ধ ও নিথর মরদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই হত্যাকাণ্ডটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি ওই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলমান জাতিগত বিদ্বেষ ও আধিপত্য বিস্তারের এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ।

 

এই ঘটনার পর সমগ্র জেলাজুড়ে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং সাধারণ মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন সেখানে বাড়তি নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।

 

মণিপুরে গত দুই দিন ধরে চলা এই প্রাণঘাতী সহিংসতার শুরু হয় মূলত গত ১৩ই সেপ্টেম্বর। ওই দিন তামেংলং জেলারই টোলেন কুকি নামক একটি পাহাড়ি গ্রামে এক দম্পতিকে অত্যন্ত নির্মমভাবে হত্যা করে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র দুর্বৃত্তরা।

 

এই পৈশাচিক হামলায় তাঁদের শিশু সন্তানটিও গুরুতরভাবে আহত হয়, যে বর্তমানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ঠিক একই দিনে পার্শ্ববর্তী নোনি জেলার লংপি গ্রামেও সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা তাণ্ডব চালায়। সেখানেও এক নারী ও এক পুরুষকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটে।

 

একের পর এক এমন পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড মণিপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির কথাই প্রমাণ করে। তামেংলং এবং নোনি জেলার এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডগুলো স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে বিরাজমান পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাসকে আরও ঘনীভূত করেছে।

 

নিরপরাধ নাগরিকদের ওপর এমন বর্বরোচিত ও অমানবিক হামলার পর তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে মণিপুরের চূড়াচাঁদপুর জেলা ভিত্তিক প্রভাবশালী কুকি সংগঠন ‘কুকি ইনপি মণিপুর’। নিহতদের প্রতি গভীর শোক প্রকাশের পাশাপাশি সংগঠনটি ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নিহত দুই নারীর মরদেহ গ্রহণ না করার এক কঠোর ও অনড় ঘোষণা দিয়েছে।

 

একই সঙ্গে তারা নিরীহ কুকি-জো সম্প্রদায়ের বেসামরিক নাগরিকদের ওপর অব্যাহতভাবে ঘটে চলা প্রাণঘাতী হামলার বিষয়ে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং মণিপুরের রাজ্য সরকারের নীরবতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

 

প্রশাসনের চরম উদাসীনতার সমালোচনা করে সংগঠনটি তাদের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছে, "সুবিচার অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত স্বজন হারানো পরিবারের জন্য কষ্টকর হলেও মরদেহ গ্রহণ করা হবে না।"

 

তাদের সুস্পষ্ট অভিযোগ, প্রশাসন সাধারণ নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা প্রদানে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং এর ফলে রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ ও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এক খাদের কিনারার দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে।

 

মণিপুরের এই সাম্প্রতিক সহিংসতা মূলত রাজ্যটিতে চলমান দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী জাতিগত সংঘাতেরই একটি নতুন অধ্যায়। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের মে মাস থেকে রাজ্যের সমতলে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায় এবং পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী কুকি সম্প্রদায়ের মধ্যে যে ভয়াবহ জাতিগত দাঙ্গা শুরু হয়েছিল, তার রেশ আজও কাটেনি।

 

বিভিন্ন দাবি-দাওয়া এবং অধিকারের প্রশ্নে শুরু হওয়া সেই বিক্ষোভ খুব দ্রুতই এক ভয়ংকর সশস্ত্র গৃহযুদ্ধে রূপ নেয়। বিগত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই অমানবিক ও ধ্বংসাত্মক সহিংসতায় এখন পর্যন্ত অন্তত তিনশো ছয়জন মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে।

 

এছাড়া, এখনও নিখোঁজ রয়েছেন অন্তত ঊনপঞ্চাশ জন মানুষ, যাদের বেঁচে থাকার আশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। নিজেদের ভিটেমাটি হারিয়ে সহায়-সম্বলহীন অবস্থায় অভ্যন্তরীণভাবে উদ্বাস্তু হয়েছেন হাজার হাজার সাধারণ মানুষ, যারা বর্তমানে বিভিন্ন অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মণিপুরের এই পরিস্থিতিকে একটি চরম মানবিক বিপর্যয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। বারবার শান্তিরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, বাস্তবে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দৌরাত্ম্য এবং সাধারণ মানুষের ওপর আক্রমণ প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান কোনো সাফল্য এখনো পরিলক্ষিত হয়নি।

 

মণিপুরের পাহাড় ও উপত্যকায় বসবাসকারী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যে গভীর অবিশ্বাস ও বিভেদের প্রাচীর তৈরি হয়েছে, তা ভেঙে একটি স্থায়ী ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা করা এখন কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের জন্য এক বিশাল রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে এই সংঘাত সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের স্থিতিশীলতার জন্যই এক ভয়ংকর হুমকি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

- টাইমস নাউ