ভারত সরকার জানিয়েছে, ঢাকার এমন সিদ্ধান্তের বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে এবং এই প্রেক্ষাপটে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করবে তারা। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে এই মন্তব্য করেন।
দুই নিকটতম প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যকার ঐতিহাসিক ও বহুমুখী সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঢাকার নতুন এই পদক্ষেপ এবং দিল্লির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা।
নয়া দিল্লিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বার্তা সংস্থা এএনআই-এর পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় যে, বাংলাদেশে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া সরকার বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে হওয়া ১০১টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক পর্যালোচনা করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে।
এই বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক বা আনুষ্ঠানিক মাধ্যমে ভারতকে কিছু অবহিত করা হয়েছে কি না। এর জবাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সংবাদ ভারতের নজরে এসেছে।
তবে এই সংক্রান্ত কোনো আনুষ্ঠানিক চিঠি বা বার্তা এখনো বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দিল্লির কাছে পৌঁছায়নি। একই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় যোগ করেন, আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিয়মে প্রতিটি দেশই নিজ দেশের নিরাপত্তা ও স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়; ফলে এই প্রক্রিয়ার গতিপ্রকৃতির ওপর ভিত্তি করে ভারতও নিজের জাতীয় ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
এর আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি প্রথমবারের মতো এই পর্যালোচনার বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে ভারতের সঙ্গে যে ১০১টি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেগুলো বর্তমান সরকার অত্যন্ত গভীরভাবে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এসব চুক্তির কোনো শর্ত বা ধারা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ কিংবা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা হচ্ছে। দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও জাতীয় স্বার্থকে সমুন্নত রেখে একটি স্বাধীন পর্যালোচনার মাধ্যমেই এ বিষয়ে দ্রুত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে গত ১৩ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও একই অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, অতীতে স্বাক্ষরিত সকল দ্বিপক্ষীয় স্মারক ও চুক্তি জাতীয় সংসদীয় কাঠামোর আওতায় অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমতা এবং স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন আঙ্গিকে পুনর্গঠন করতে আগ্রহী। কোনো বিশেষ বা একপেশে সুবিধার পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির প্রধান লক্ষ্য।
সংবাদ সম্মেলনে চলতি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাওয়া ঐতিহাসিক গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির নবায়ন প্রসঙ্গেও ভারতের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়। ত্রিশ বছর মেয়াদি এই ঐতিহাসিক চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রণধীর জয়সওয়াল বলেন, অভিন্ন নদীর পানি বণ্টনসহ জলসম্পদ সংক্রান্ত যে কোনো দ্বিপক্ষীয় বিরোধ বা প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার জন্য দুই দেশের মধ্যে যৌথ নদী কমিশন বা জেআরসি-র স্থায়ী প্রাতিষ্ঠানিক পরিকাঠামো সক্রিয় রয়েছে।
তিনি জানান, বিশেষজ্ঞ ও কারিগরি পর্যায়ে উভয় দেশের নিয়মিত বৈঠক ও তথ্য আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে। ফলে কাঠামোগত নিয়মের মাধ্যমেই পানি ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো সমাধান করা সম্ভব হবে বলে দিল্লি আশা প্রকাশ করে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যকার অমীমাংসিত বিষয়গুলো নিয়ে নতুন করে দরকষাকষির একটি ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। চুক্তি পর্যালোচনার এই পদক্ষেপ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সাময়িক কিছুটা অস্বস্তি তৈরি করলেও দীর্ঘমেয়াদে স্বচ্ছ ও টেকসই অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠায় তা গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পুরো বিষয়টি নির্ভর করবে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে উভয় দেশ কীভাবে পরস্পরের স্পর্শকাতর স্বার্থগুলোকে মূল্যায়ন করে তার ওপর।