শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬
৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাকিস্তানের মসজিদে ভয়াবহ বোমা হামলা, নিহত অন্তত ১৬

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:৪২ পিএম

পাকিস্তানের মসজিদে ভয়াবহ বোমা হামলা, নিহত অন্তত ১৬
ছবি : Collected

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ খাইবার পাখতুনখাওয়ায় শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জুমার নামাজের সময় একটি মসজিদে এক ভয়াবহ ও বর্বরোচিত বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই নারকীয় ও প্রাণঘাতী হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬ জন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

 

নিহতদের মধ্যে ১১ জন সাধারণ বেসামরিক নাগরিক, যাঁরা কেবল নিজেদের সাপ্তাহিক প্রার্থনা সারতে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে, বাকি পাঁচজন হলেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য, যাঁরা জনগণের নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।

 

আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী কোহাত জেলায় অবস্থিত পুলিশ সদরদপ্তরের কাছের এই মসজিদে যখন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা সমবেত হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই রক্তক্ষয়ী হামলার ঘটনা ঘটে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো এই মর্মান্তিক ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম একটি বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।

 

পেশোয়ার পুলিশের প্রাথমিক বিবরণ এবং ঘটনাস্থল থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে। তারা বিপুল পরিমাণ বিস্ফোরক বোঝাই একটি গাড়ি নিয়ে তীব্র বেগে ধেয়ে এসে মসজিদের প্রধান ফটকে সজোরে ধাক্কা দেয়।

 

এর পরপরই গাড়িটিতে থাকা শক্তিশালী বিস্ফোরকের ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটে। এই প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে এবং চারপাশ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। প্রার্থনারত নিরীহ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে।

 

জুমার নামাজের মতো একটি পবিত্র ও জনবহুল সময়ে এমন আকস্মিক ও তীব্র আক্রমণ হওয়ার কারণেই মূলত হতাহতের সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে এত বেশি হয়েছে বলে মনে করছে পুলিশ প্রশাসন।

 

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি তাদের সর্বশেষ আপডেটে জানিয়েছে যে, শুধু গাড়ি বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়েই হামলাকারীরা তাদের বর্বরোচিত আক্রমণ শেষ করেনি; বিস্ফোরণের পরপরই সশস্ত্র হামলাকারী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে তীব্র গোলাগুলি শুরু হয়।

 

এই বন্দুকযুদ্ধ এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে। নিরাপত্তারক্ষীদের বীরত্বপূর্ণ ও তাৎক্ষণিক প্রতিরোধের মুখে এক হামলাকারী পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।

 

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে জানাচ্ছে যে, উদ্ধারকাজ সম্পূর্ণ হওয়ার আগে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা চূড়ান্তভাবে বলা কঠিন এবং এই সংখ্যা সামনের সময়গুলোতে আরও বাড়তে পারে।

 

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা তাদের বিস্তারিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কোহাত জেলার পুলিশ সদরদপ্তরের ওই মসজিদে মূলত সাধারণ মানুষের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও নিয়মিত নামাজ আদায় করে থাকেন।

 

হামলাকারীরা সেই কৌশলগত সুযোগটিকেই কাজে লাগিয়েছে। বিস্ফোরণের পরপরই সেখানে এক অবর্ণনীয় ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এখন পর্যন্ত এই হামলায় ১৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু নিশ্চিত করা হলেও, অন্তত ৫০ জন মানুষ গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আহতদের আর্তনাদে এলাকার পরিবেশ ভারী হয়ে উঠেছে।

 

জার্মান বার্তাসংস্থা ডিপিএ-এর বরাত দিয়ে জানা যায়, আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী ওই উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চলের মসজিদে হামলার পরপরই স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে এক জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। উদ্ধারকারী যান ও কর্মীদের তৎপরতায় পুরো কোহাত জেলার পরিবেশ থমথমে হয়ে ওঠে।

 

স্থানীয় একটি প্রধান হাসপাতালের দায়িত্বরত জ্যেষ্ঠ চিকিৎসক তাহির শাহ গণমাধ্যমকে জানান, বিস্ফোরণের পর পরই হাসপাতালে ১৫টি নিথর দেহ নিয়ে আসা হয়। একই সঙ্গে প্রায় ৫০ জন আহত মানুষকে সেখানে জরুরি বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে।

 

তিনি গভীর উদ্বেগের সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, আহত অবস্থায় যাঁদের নিয়ে আসা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। তাঁদের শরীরে বোমার আঘাত ও আগুনে পোড়ার মারাত্মক ক্ষত রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে জোরালো আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন চিকিৎসকরা।

 

এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠী এই বর্বরোচিত হামলার দায় আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে পাকিস্তানের ওই সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে, বিশেষ করে আফগান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়ায়, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি-এর ব্যাপক উপস্থিতি ও দীর্ঘদিনের সক্রিয়তা রয়েছে।

 

এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি এর আগেও পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ সদরদপ্তর এবং এমনকি সাধারণ মানুষের মসজিদেও একাধিকবার প্রাণঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ও আত্মঘাতী হামলা চালিয়েছে।

 

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, হামলার ধরন ও লক্ষ্যের সঙ্গে অতীতের টিটিপি পরিচালিত আক্রমণগুলোর যথেষ্ট মিল রয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনা সমগ্র পাকিস্তানে নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে এবং নিরীহ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

 

- বিবিবি, আলজাজিরা