আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলনটি যখন বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে, ঠিক তখনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নতুন ও অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের সূত্রপাত ঘটেছে।
বিভিন্ন মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে যে, নয়াদিল্লির এই সম্মেলন থেকে নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পরপরই একাধিক বিশ্বনেতা হঠাৎ করে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তবে আন্তর্জাতিক মহলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই চাঞ্চল্যকর খবরটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে জোরালোভাবে নাকচ করে দিয়েছে আয়োজক দেশ ভারত।
বিশ্বনেতাদের স্বাস্থ্য নিয়ে এ ধরনের স্পর্শকাতর গুজব আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমন আশঙ্কা থেকে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ও আনুষ্ঠানিকভাবে মুখ খুলেছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয়ের নিজস্ব তথ্য-যাচাইকারী বা ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট অত্যন্ত কড়া ভাষায় এই দাবির প্রতিবাদ জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিশেষ সতর্কবার্তায় তারা এই ধরনের খবরকে ‘ফেক অ্যালার্ট’ বা ‘ভুয়া খবর’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, সম্মেলনে আগত অতিথিদের সর্বোচ্চ স্বাস্থ্য নিরাপত্তা ও আতিথেয়তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। তাই সম্মেলন শেষে একাধিক নেতার একসঙ্গে অসুস্থ হয়ে পড়ার যে গল্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
একই সঙ্গে, সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমকর্মীদের এ ধরনের ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও ক্ষতিকর পোস্ট শেয়ার করা থেকে বিরত থাকার এবং অত্যন্ত সতর্ক থাকার জন্য আনুষ্ঠানিক আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি। এই গুঞ্জনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন মূলত দুজন প্রভাবশালী বিশ্বনেতা।
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া একটি গুরুতর দাবি। চায়না ডেমোক্রেসি পার্টির চেয়ারম্যান ওয়ানজুন শিয়ে সম্প্রতি প্রকাশ্যে দাবি করেন যে, ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ চলাকালেই চীনের প্রেসিডেন্ট মারাত্মকভাবে স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলেন।
তার দাবি অনুযায়ী, শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটায় এবং তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলায় তাকে জরুরি চিকিৎসার জন্য বিশেষ বিমানে করে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে চীনে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এ ধরনের দাবি অত্যন্ত গুরুতর হলেও, চীনের মতো অত্যন্ত সংরক্ষিত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত একটি দেশের সরকার বা সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্যই নিশ্চিত করা হয়নি।
ফলে ওয়ানজুন শিয়ের এই দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর পক্ষে কার্যত অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং এটি নিছকই একটি রাজনৈতিক গুজব হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্টের বিষয়টি গুঞ্জন পর্যায়ে থাকলেও, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামফোসার অসুস্থতার খবরটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ও বাস্তব। ব্রিকস সম্মেলন শেষে নয়াদিল্লি থেকে দেশে ফেরার পরপরই তার অসুস্থতার খবরটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
তবে এটিকে ভারতের পরিবেশ বা সম্মেলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করার কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পাওয়া যায়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে জারি করা এক সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, প্রেসিডেন্ট সিরিল রামফোসা বর্তমানে শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন এবং তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের নিবিড় পরামর্শ অনুযায়ী তিনি সম্পূর্ণ বিশ্রামে রয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় এই বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তিনি আপাতত কোনো ধরনের জনসংযোগমূলক বা রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করবেন না। তার এই আকস্মিক অনুপস্থিতিতে দেশ পরিচালনার দৈনন্দিন ও রুটিন কাজগুলোতে সরকারের মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্যরা তার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করবেন।
তবে একটি বিষয় এখনো ধোঁয়াশাচ্ছন্ন রয়ে গেছে, তা হলো-প্রেসিডেন্ট রামফোসা ঠিক কবে এবং কোথায় প্রথম অসুস্থতা বোধ করেন। তিনি কি ভারত সফরকালেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন, নাকি দীর্ঘ যাত্রার পর নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার পর এই শারীরিক জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন, সে বিষয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক কূটনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বনেতাদের শারীরিক অবস্থা সব সময়ই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের গভীর আগ্রহের বিষয়। তবে ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবাধ প্রবাহের কারণে অনেক সময় বিচ্ছিন্ন কিছু সত্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিশাল আকারের মিথ্যা আখ্যান বা প্রোপাগান্ডা তৈরি করা হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টের বাস্তব অসুস্থতার খবরের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্টকে ঘিরে তৈরি হওয়া অসমর্থিত রাজনৈতিক গুজবকে একীভূত করে ব্রিকস সম্মেলনের বিরুদ্ধে একটি নেতিবাচক আবহ তৈরির যে চেষ্টা করা হচ্ছে, ভারত সরকার অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে তার মোকাবিলা করেছে। নয়াদিল্লি এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বৈশ্বিক এই সম্মেলনের মূল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সাফল্যকে ম্লান করতেই এ ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।