শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬
৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালালে পাকিস্তানকে বিধ্বংসী জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি তালেবানের

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:২৬ পিএম

আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালালে পাকিস্তানকে বিধ্বংসী জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি তালেবানের
ছবি : Collected

আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে কোনো ধরনের সামরিক আগ্রাসন চালানো হলে তার পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ হবে বলে প্রতিবেশী রাষ্ট্র পাকিস্তানকে অত্যন্ত কড়া ভাষায় সতর্ক করে দিয়েছে দেশটির ক্ষমতাসীন তালেবান সরকার।

 

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল আরাবিয়াকে দেওয়া এক বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ সাক্ষাৎকারে তালেবান সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ এই কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

 

তিনি অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আফগান ভূখণ্ডের ভেতরে পাকিস্তানের যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত সামরিক পদক্ষেপ বা আগ্রাসন থেকে নিজেদের মাতৃভূমিকে রক্ষা করার এবং তার সমুচিত জবাব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার কাবুলের রয়েছে।

 

দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে চলমান সীমান্ত উত্তেজনা এবং পারস্পরিক দোষারোপের রাজনীতির প্রেক্ষাপটে তালেবানের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এই বিবৃতি আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে একটি নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

 

সাক্ষাৎকারে জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যদি কোনো অজুহাতে আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় সীমানার ভেতরে পাকিস্তান সামরিক অভিযান চালানোর দুঃসাহস দেখায়, তবে সেটিকে সরাসরি আফগানিস্তানের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ওপর চরম আঘাত ও নগ্ন লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

 

আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি করা হলে, কাবুল নীরব দর্শক হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। বরং আগ্রাসনের মাত্রা অনুযায়ী আফগান সামরিক বাহিনী ও সরকার অত্যন্ত শক্ত এবং ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পিছপা হবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে সতর্ক করে দেন।

 

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে নিজেদের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর বলে তিনি পুনরুল্লেখ করেন। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সূত্রপাত মূলত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ঊর্ধ্বতন মুখপাত্রের সাম্প্রতিক কিছু গুরুতর অভিযোগের পর থেকে।

 

এর আগে আল আরাবিয়া ইংলিশকে দেওয়া অপর একটি সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানি ওই সামরিক কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন যে, আফগানিস্তানের বর্তমান প্রশাসন তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে পাকিস্তানের ভেতরে নাশকতা চালানোর জন্য বিভিন্ন সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিয়োগ, নিবিড় প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ আশ্রয় প্রদান করছে।

 

পাকিস্তানের অভিযোগ, বিভিন্ন সশস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও সীমান্ত এলাকাগুলোকে তাদের মূল ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে। সেখান থেকে তারা নতুন যোদ্ধা সংগ্রহ, সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে প্রাণঘাতী হামলা পরিচালনা করছে।

 

এই আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের কারণে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা চরম হুমকির মুখে পড়েছে বলে ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মহলে অভিযোগ করে আসছে। তবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এসব গুরুতর অভিযোগ সরাসরি এবং অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে প্রত্যাখ্যান করেছেন তালেবান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ।

 

তিনি পাকিস্তানের এই দাবিকে বাস্তবতা বিবর্জিত আখ্যা দিয়ে বলেন, আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর হামলা চালানোর সুযোগ দেওয়া হয় না।

 

বিশেষ করে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) বা অন্য কোনো সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনকে আফগানিস্তানের ভূখণ্ড থেকে তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম, সামরিক প্রশিক্ষণ বা হামলার পরিকল্পনা পরিচালনার কোনো ধরনের আইনি বা কৌশলগত অনুমতি তালেবান সরকার কখনোই প্রদান করে না।

 

প্রতিবেশী দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রতি আফগানিস্তান অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল এবং অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে হামলা পরিচালনাকারী কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে তালেবান সরকার কখনোই সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা বা কৌশলগত সহায়তা করে না বলে তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করেন।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্যকার এই ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রকাশ্য বাক্যবিনিময় এই অঞ্চলের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ধরনের অশনিসংকেত।

 

২০২১ সালের আগস্ট মাসে আফগানিস্তানে তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মূলত দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা ইস্যু নিয়ে টানাপোড়েন বৃদ্ধি পেয়েছে। পাকিস্তান বারবার অভিযোগ করে আসছে যে, আফগান ভূখণ্ডে আশ্রয় নেওয়া টিটিপি জঙ্গিরা পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ নাগরিকদের ওপর নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে।

 

অন্যদিকে আফগানিস্তানের দাবি, পাকিস্তান তাদের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যর্থতা ঢাকতে অযথাই কাবুলের ওপর দোষ চাপাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের জটিল সম্পর্ক, ঐতিহাসিক সীমান্ত বিরোধ এবং আস্থার চরম সংকট পরিস্থিতিকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলছে।

 

আন্তর্জাতিক মহল গভীরভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, কারণ এই অঞ্চলে নতুন করে কোনো সামরিক সংঘাত বেধে গেলে তা কেবল কাবুল ও ইসলামাবাদের জন্যই নয়, বরং পুরো দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার স্থিতিশীলতার জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

 

উভয় পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অনড় অবস্থান স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, পারস্পরিক সংলাপ ও কার্যকর কূটনৈতিক সমাঝোতার মাধ্যমেই কেবল উদ্ভূত এই সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনার একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান সম্ভব।

 

- এএনআই