শনিবার, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২৬
১১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

পাকিস্তানে পুলিশ চেকপোস্টে আত্মঘাতী বোমা হামলা, শিশুসহ ১১ জন নিহত

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৮:৪৫ পিএম

পাকিস্তানে পুলিশ চেকপোস্টে আত্মঘাতী বোমা হামলা, শিশুসহ ১১ জন নিহত
ছবি : Collected

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সংঘাতসঙ্কুল খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি পুলিশ চেকপোস্টে ভয়াবহ আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই পৈশাচিক ও মর্মান্তিক হামলায় এক শিশু ও দুই নারীসহ অন্তত ১১ জন সাধারণ নাগরিক ও পুলিশ সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

 

এছাড়া এই ঘটনায় আরও অন্তত ২০ জন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে দেশটির সরকারি ও উদ্ধারকারী সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহ শেষের এই দিনে ঘটা এই নৃশংস হামলা পুরো এলাকায় তীব্র আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

 

নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলগুলোতে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, এই হামলা তারই এক ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী বহিঃপ্রকাশ।

 

স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে প্রাপ্ত বিস্তারিত বিবরণ অনুযায়ী, রক্তক্ষয়ী এই আত্মঘাতী বোমা হামলার ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের প্রত্যন্ত ও সংবেদনশীল ডেরা ইসমাইল খান জেলার দারাজিন্দা এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত ‘আমান মেলা’ নামক একটি পুলিশ চেকপোস্টে।

 

কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই চেকপোস্টটি ডেরা ইসমাইল খান ও কোয়েটা সড়কের মুঘল কোট এবং দারাজিন্দা এলাকার ঠিক মধ্যবর্তী একটি স্থানে অবস্থিত ছিল। প্রতিদিনের মতো যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিয়মিত চেকপোস্টের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন এবং সাধারণ যানবাহন ও পথচারীদের চলাচল তদারকি করছিলেন, ঠিক তখনই সুপরিকল্পিত এই আত্মঘাতী হামলাটি চালানো হয়।

 

বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে চেকপোস্টের আশেপাশের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ধোঁয়া ও ধুলায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। উদ্ধারকারী সংস্থা ‘রেসকিউ ১১২২’ এর পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছে যে, এই ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর পরই ঘটনাস্থলে একটি যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি হয়।

 

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া চেকপোস্টের আশপাশ থেকে হতাহতদের দ্রুত উদ্ধার করার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে একটি বৃহৎ উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। প্রাথমিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই মর্মান্তিক বোমা হামলায় ঘটনাস্থলেই বা চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারিয়েছেন মোট ১১ জন ব্যক্তি।

 

নিহতদের এই দুঃখজনক তালিকায় রয়েছে আটজন পুরুষ, দুজন নারী এবং একটি নিষ্পাপ শিশু। বিস্ফোরণের পরপরই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে উদ্ধারকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করেন। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি চালানো হয়।

 

এই আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক বিস্ফোরণের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে ছুটে যায় উদ্ধারকারী দলের একাধিক ইউনিট। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এই উদ্ধার অভিযানে ২৫ জনেরও বেশি প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী অংশ নেন।

 

আহতদের দ্রুত নিকটস্থ চিকিৎসাকেন্দ্রে স্থানান্তরের জন্য ঘটনাস্থলে পাঠানো হয় ছয়টি আধুনিক অ্যাম্বুলেন্স এবং একটি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি। রেসকিউ ১১২২ কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে যে, বিস্ফোরণে আহত হওয়া ২০ জন ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে।

 

তাদের মধ্যে অত্যন্ত সংকটাপন্ন অবস্থায় ১৮ জন আহত ব্যক্তিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য দারাজিন্দার বিভিন্ন স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে সরাসরি ডেরা ইসমাইল খানের সুপরিচিত মুফতি মাহমুদ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।

 

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আহতদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক, ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিস্ফোরণের পরপরই ঘটনার ধরন, তীব্রতা এবং হামলায় ব্যবহৃত বিস্ফোরকের সঠিক প্রকৃতি ও উৎস উদঘাটন করতে দেশটির গোয়েন্দা বাহিনী এবং পুলিশের বিশেষ বোমা নিষ্ক্রিয়কারী দলের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিবিড় তদন্ত শুরু করেন।

 

তারা আলামত সংগ্রহ করার পাশাপাশি চারপাশের নিরাপত্তা জোরদার করেন। খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে এই হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

 

প্রদেশের গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি এই জঘন্য সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের সুচিকিৎসা ও সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।

 

গভর্নর এই হামলাটিকে রাষ্ট্রের শান্তি বিনষ্ট করার একটি গভীর ও সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করে একে ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান খাওয়ারিজ’-এর কুৎসিত অপচেষ্টা বলে অভিহিত করেছেন।

 

উল্লেখ্য, পাকিস্তান সরকার ও দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী নিষিদ্ধ ঘোষিত উগ্রপন্থী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানকে বা টিটিপিকে সাধারণত ‘ফিতনা আল-খাওয়ারিজ’ নামে অভিহিত করে থাকে।

 

এদিকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা এবং স্থানীয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের এই পুলিশ চেকপোস্টে চালানো মর্মান্তিক আত্মঘাতী বোমা হামলার পূর্ণ দায় স্বীকার করেছে পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠন তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা সংক্ষেপে টিটিপি।

 

সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই হামলার দায় স্বীকার করা হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানের বিভিন্ন নিরাপত্তা চৌকি, পুলিশ স্টেশন এবং সামরিক বহরের ওপর জঙ্গি সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক হামলার যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, ডেরা ইসমাইল খানের এই হামলাটি তারই একটি ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত অংশ বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

 

দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরি করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ভেঙে দেওয়ার হীন উদ্দেশ্যেই এই ধরনের আত্মঘাতী হামলা চালানো হচ্ছে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।

 

পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের এই পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখাওয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে নিরাপত্তা বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার সদস্যদের লক্ষ্য করে প্রায়শই বোমা হামলা, রকেট নিক্ষেপ এবং অতর্কিত সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে থাকে।

 

আজকের এই রক্তক্ষয়ী ঘটনাটি আরও একবার স্মরণ করিয়ে দিল যে, এই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা কতটা দুরূহ ও চ্যালেঞ্জিং। সাধারণ নিরীহ মানুষের প্রাণহানি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার এই অবনতিশীল পরিস্থিতি গোটা অঞ্চলের শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

 

পুরো ঘটনাটি নিয়ে বর্তমানে দেশজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হামলাকারীদের মূল নেটওয়ার্ক ও পেছনের কুশীলবদের খুঁজে বের করতে তাদের চিরুনি অভিযান আরও জোরদার করেছে।

 

- ডন