এর মাত্র একদিন আগে তার অপর বোন আলিমা খানকেও একই মেয়াদে আটক করে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল। ফলে একে একে ইমরান খানের তিন বোনকেই প্রশাসনিক আদেশে বন্দি করা হলো।
আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পিটিআইয়ের ঘোষিত দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখে লংমার্চ বা পদযাত্রার প্রাক্কালে সরকারের এই কঠোর পদক্ষেপকে বিরোধী শিবিরের ওপর বড় ধরনের পূর্বপ্রস্তুতিমূলক দমন অভিযান হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক কর্মসূচির মুখে শীর্ষ নেতার পরিবারের নারী সদস্যদের এভাবে একযোগে আটক করার ঘটনা পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজমান অস্থিরতা ও সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।
পাঞ্জাব প্রাদেশিক প্রশাসনের জারি করা এক জরুরি আদেশের মাধ্যমে এই আটকের ঘটনা ঘটে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম দ্য ডনের নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন অনুযায়ী, লাহোরের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আলী ইজাজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে উত্থাপিত বিভিন্ন অভিযোগ ও প্রমাণ অনুমোদন করা হয়।
এরপরই পাঞ্জাবের জনশৃঙ্খলা রক্ষা অধ্যাদেশ বা মেইনটেন্যান্স অব পাবলিক অর্ডার (এমপিও) ১৯৬০-এর আওতায় উজমা খান এবং নোরিন নিয়াজিকে আগামী এক মাসের জন্য আটক রাখার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ জারি করা হয়।
জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে জারি করা ওই আদেশে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তাদের স্বাধীন চলাচল এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড জননিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জনশৃঙ্খলার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
এই আদেশের পরপরই তাদের দুজনকেই লাহোরের ঐতিহাসিক ও অত্যন্ত সুরক্ষিত কোট লাখপত কেন্দ্রীয় কারাগারের সুপারের তত্ত্বাবধানে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিজ্ঞপ্তিতে ইমরান খানের দুই বোনের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।
জেলা প্রশাসকের আদেশে দাবি করা হয়, উজমা এবং নোরিন ২০২৩ সালের ৯ মে পাকিস্তানে সংঘটিত নজিরবিহীন রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। ওই দিন পিটিআই সমর্থকদের দ্বারা সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা এবং সরকারি ও জনগণের মূল্যবান সম্পদ ধ্বংসের ঘটনায় কর্মীদের প্ররোচিত ও উৎসাহিত করার পেছনে তাদের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
একই সাথে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্রকাশ্য জনসভার মাধ্যমে দলীয় কর্মীদের আবারও নতুন করে সংগঠিত করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটানোর গোপন অপচেষ্টা চলছে বলেও গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে দাবি করেছে পুলিশ।
এই প্রেক্ষাপটে লাহোরের রেসকোর্স থানায় দায়েরকৃত ৯৬/২৩ নম্বর মামলাসহ তাদের বিরুদ্ধে অতীতে রুজু হওয়া একাধিক ফৌজদারি মামলার বিবরণ আদেশে তুলে ধরে তাদের তাৎক্ষণিক আটকাদেশকে আইনিভাবে সমর্থন দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।
এই ঘটনার মাত্র একদিন পূর্বে, অর্থাৎ রোববার একই অধ্যাদেশের অধীনে ইমরান খানের জ্যেষ্ঠ বোন আলিমা খান এবং মুহাম্মদ আমির নামের অপর এক ব্যক্তিকে আটক করার নির্দেশ দিয়েছিল লাহোর প্রশাসন।
আলিমা খানকে আটকের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করতে গিয়ে তার বোন নোরিন নিয়াজি নিজের গ্রেফতারের কয়েক ঘণ্টা আগে লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। তিনি গণমাধ্যমের সামনে অভিযোগ করে বলেছিলেন যে, শনিবার ব্যক্তিগত কাজে বাসা থেকে বের হওয়ার পর কোনো ধরনের পূর্ব নোটিশ বা আইনি পরোয়ানা ছাড়াই আলিমা খানকে তার ব্যক্তিগত গাড়ির চালকসহ অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তুলে নিয়ে যায়।
দীর্ঘ সময় ধরে পরিবারের সদস্যরা তার কোনো খোঁজ না পেয়ে চরম উদ্বেগে পড়েন এবং পরবর্তীতে একটি স্থানীয় থানা চত্বরে আলিমার ব্যবহৃত গাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখতে পান। পরে নির্ভরযোগ্য পুলিশ সূত্রের বরাতে জানা যায়, আটকাদেশ কার্যকর করার জন্য তাকে লাহোরের কোট লাখপত কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
কিন্তু এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নোরিন নিজেও প্রশাসনিক ব্যবস্থার শিকার হন। বিরোধী দল পিটিআই এই গণগ্রেফতারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। দলের কেন্দ্রীয় তথ্যসচিব শেখ ওয়াকাস আক্রম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক বার্তায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন যে, কোনো প্রকার বৈধ আইনি নোটিশ ছাড়াই ইমরান খানের দুই বোনকে তাদের সন্তানদের এবং কারাবন্দি আলিমা খানের ছেলেদের সঙ্গে অত্যন্ত অবমাননাকরভাবে আটক করা হয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, আটকের পরপরই একটি ভারী সাঁজোয়া গাড়িতে তুলে তাদের সম্পূর্ণ অজ্ঞাত এক স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়, যা স্পষ্টতই মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। দলের আইনজীবী আওয়াইস ইউনুস চৌধুরীও সংবাদমাধ্যমের কাছে নিশ্চিত করেন যে, ইমরান খানের পরিবারের ঘনিষ্ঠ নারী সদস্যদের প্রায় সবাইকে এখন কার্যকরভাবে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে রাখা হয়েছে।
পিটিআইয়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে পুরো ঘটনাটিকে সরকারের নগ্ন ক্ষমতার অপব্যবহার, সাংবিধানিক মৌলিক অধিকারের চরম অবমাননা এবং বিরোধী দল নির্মূলের একটি ঘৃণ্য রাজনৈতিক নিপীড়ন হিসেবে তীব্র নিন্দা জানানো হয়।
রাজনৈতিক অঙ্গনের বাইরে ইমরান খানের পারিবারিকভাবেও এই ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। ইমরান খানের ছেলে কাসিম খান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বিবৃতিতে অভিযোগ করেন যে, তার ফুপু এবং ফুপাতো ভাইদের আক্ষরিক অর্থেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জোরে ‘অপহরণ’ করা হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কোনো ধরনের পূর্ব অনুমতি বা আইনি ব্যাখ্যা ছাড়াই তাদের পারিবারিক বাসভবনে জোরপূর্বক প্রবেশ করে এবং কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সবাইকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।
অন্যদিকে পিটিআইয়ের বর্তমান চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গওহর আলী খান এক বিবৃতিতে এই গ্রেফতার অভিযানের তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তান বর্তমানে এক গভীর অর্থনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এই পরিস্থিতিতে দেশের প্রয়োজন রাজনৈতিক উত্তেজনার অবসান ও জাতীয় সমঝোতা, কোনো নতুন সংঘাত বা প্রতিশোধপরায়ণতা নয়।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্য এবং পরিবারের নিরীহ সদস্যদের বারবার গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপ করার এই প্রবণতা মাঠের পরিস্থিতিকে শান্ত করার পরিবর্তে আরও বেশি উত্তপ্ত ও বিস্ফোরক করে তুলবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর পিটিআইয়ের প্রস্তাবিত দেশব্যাপী বিক্ষোভ কর্মসূচি এবং ইসলামাবাদমুখী পদযাত্রাকে কেন্দ্র করেই এই কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকা সত্ত্বেও তার দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে যে ক্ষোভ ও উদ্দীপনা রয়েছে, তা দমাতেই আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবারকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আন্দোলনের মূল সমন্বয়কারীদের ওপর মানসিক ও কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করাই এই আটকের মূল উদ্দেশ্য। তবে পরিবারের সদস্যদের ওপর এই ধরনের প্রশাসনিক খড়্গ শেষ পর্যন্ত বিরোধী শিবিরের ক্ষোভ প্রশমিত করবে, নাকি গণবিক্ষোভের মাত্রাকে আরও অনিয়ন্ত্রিত করে তুলবে, তা নিয়ে পাকিস্তানের রাজনৈতিক মহলে গভীর সংশয় দেখা দিয়েছে।
দেশের বিচার বিভাগ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সব মিলিয়ে পাকিস্তানের রাজনীতি এখন এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড়ে এসে উপনীত হয়েছে।
একদিকে বিরোধী দল রাজপথে তাদের গণতান্ত্রিক শক্তি প্রদর্শনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন জোট ও প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ সম্ভাব্য যেকোনো বিশৃঙ্খলা রুখতে কঠোরতম আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ করে চলেছে।
ইমরান খানের তিন বোনের এই ধারাবাহিক আটক কেবল একটি পরিবারের আইনি সংকট নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে পাকিস্তানে রাজনৈতিক মতবিরোধ নিরসনে সমঝোতার পথ ক্রমশ রুদ্ধ হয়ে পড়ছে এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে বিরোধী শিবিরের মুখোমুখি অবস্থান একটি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
আগামী ২৭ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিকে ঘিরে রাজধানী ইসলামাবাদসহ সমগ্র পাকিস্তানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হচ্ছে, তবে এই দমননীতি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কতটা কার্যকর হবে, সেই উত্তর ভবিষ্যতের গর্ভেই নিহিত রয়েছে।