তাঁর এই দাবি কেবল রাজ্য রাজনীতিতেই নয়, বরং সমগ্র ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, এই রাজ্য বিভাজনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সম্মতির বিষয়টি যুক্ত করে তিনি যে বক্তব্য প্রদান করেছেন, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর গভীর মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
ভারতের শাসনব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তারকারী এই রাজ্যের সম্ভাব্য বিভক্তি দেশটির সামগ্রিক ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশাল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। রোববার উত্তর প্রদেশের আম্বেদকর নগর জেলায় আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ওম প্রকাশ রাজভর এই চমকপ্রদ দাবিটি উত্থাপন করেন।
জনসভায় তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর সাম্প্রতিক কথোপকথনের একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রসঙ্গের অবতারণা করেন। রাজভরের প্রকাশ্য দাবি অনুযায়ী, ভারতে বহুল আলোচিত ও প্রতীক্ষিত জাতিভিত্তিক শুমারি বা জনগণনার কাজ সম্পূর্ণ হওয়ার পরপরই উত্তর প্রদেশকে বিভাজনের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আশ্বস্ত করেছেন।
তাঁর এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দেশজুড়ে জাতিভিত্তিক শুমারির দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর ক্রমাগত চাপ সৃষ্টি করে আসছে এবং ক্ষমতাসীন জোটের ভেতরেও এ নিয়ে নানা ধরনের মেরুকরণ চলছে।
রাজ্যের মন্ত্রী রাজভর তাঁর বক্তব্যে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেন যে, জাতিভিত্তিক শুমারির সম্পূর্ণ পরিসংখ্যান একবার হাতে চলে এলে বিশাল আয়তনের এই রাজ্যটিকে প্রশাসনিক সুবিধার জন্য ভাগ করার ক্ষেত্রে আইনি বা রাজনৈতিক আর কোনো বড় বাধা অবশিষ্ট থাকবে না।
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, জনগণনার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের পরপরই উত্তর প্রদেশকে বিভক্ত করার দীর্ঘদিনের লালিত উদ্যোগটি আলোর মুখ দেখবে। তাঁর এই ঘোষণার পর থেকেই মূলত ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে যে, কেন্দ্রীয় সরকার কি সত্যিই ভারতের সবচেয়ে জনবহুল ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী রাজ্যটিকে ভেঙে ফেলার কোনো সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে কি না।
সুশাসন নিশ্চিত করার যুক্তিতে অতীতে ভারতের আরও কয়েকটি বড় রাজ্য ভেঙে ছোট রাজ্য গঠনের সফল নজির থাকায় এই দাবিটিকে একেবারেই উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। উত্তর প্রদেশকে ঠিক কীভাবে এবং কোন কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে বিভক্ত করা হতে পারে, তার একটি সম্ভাব্য ও প্রস্তাবিত রূপরেখাও জনসভায় তুলে ধরেন সুহেলদেব ভারতীয় সমাজ পার্টির এই শীর্ষ নেতা।
তাঁর প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান উত্তর প্রদেশ ভেঙে যে চারটি নতুন অঞ্চল বা রাজ্য গঠন করার কথা ভাবা হচ্ছে, সেগুলো হলো-পূর্বাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল বা মায়ান্যাঞ্চল (আওয়াধ অঞ্চল), বুন্দেলখণ্ড এবং হাড়িত প্রদেশ বা পশ্চিমাঞ্চল।
ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে এই অঞ্চলগুলোর মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই পৃথক রাজ্যের দাবি বিদ্যমান রয়েছে। রাজভর তাঁর রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার কথা বিন্দুমাত্র গোপন না করে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দাবি করেছেন যে, প্রস্তাবিত বিভাজনের পর যদি পূর্বাঞ্চল নামে নতুন রাজ্যটি গঠিত হয়, তবে সেই অঞ্চলের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হবেন রাজভর সম্প্রদায়েরই কোনো একজন যোগ্য প্রতিনিধি।
তাঁর মতে, পূর্বাঞ্চলে রাজভর সম্প্রদায়ের ভোটারদের যে বিশাল আধিপত্য ও সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তার ভিত্তিতেই এই সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক অধিকার সবচেয়ে বেশি সুসংহত হবে এবং স্থানীয় জনগণ প্রকৃত ক্ষমতার স্বাদ পাবে।
ভারতের নির্বাচন কমিশনের প্রথাগত তফসিল অনুযায়ী, আর কিছুকাল পরেই উত্তর প্রদেশের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে রাজ্য সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর মুখ থেকে রাজ্য বিভাজনের মতো এত বড় একটি স্পর্শকাতর বক্তব্য অত্যন্ত সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক কৌশল বলেই মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক।
রাজভরের এই বক্তব্যটি উত্তর প্রদেশ বিভাজনের পুরোনো ও থিতিয়ে পড়া বিতর্ককে যেন আবারো নতুন করে উসকে দিয়ে সামনের সারিতে নিয়ে এসেছে। উল্লেখ্য, ৪০৩টি বিধানসভা আসন নিয়ে গঠিত বর্তমান উত্তর প্রদেশ ভারতের যেকোনো রাজ্যের চেয়ে রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি শক্তিশালী।
এছাড়া ভারতের জাতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভায় এই রাজ্য থেকে সর্বোচ্চ ৮০ জন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসেন। তাই এখানকার নির্বাচনী ফলাফল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে।
আয়তন ও জনসংখ্যার বিশালত্বের কারণে রাজ্যটি ঐতিহাসিকভাবেই রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চিমাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল, বুন্দেলখণ্ড এবং পূর্বাঞ্চল-এই চারটি প্রধান ও বৃহৎ অঞ্চলে বিভক্ত হিসেবেই মানুষের কাছে পরিচিত।
বিশাল এই রাজ্যের রাজধানী লখনউ থেকে দূরবর্তী জেলাগুলোর ভৌগোলিক দূরত্ব, জটিল ও ধীরগতির প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং অঞ্চলভেদে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সমস্যাগুলোর চরম ভিন্নতার কথা তুলে ধরে অতীতেও বিভিন্ন সময় আঞ্চলিক রাজনৈতিক দলগুলো পৃথক রাজ্যের দাবি জানিয়ে এসেছে।
উদাহরণস্বরূপ, কৃষি ও শিল্পে সমৃদ্ধ পশ্চিমাঞ্চল বা হাড়িত প্রদেশের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বেশ শক্তিশালী। অন্যদিকে, খরাপ্রবণ ও রুক্ষ বুন্দেলখণ্ড অঞ্চল এবং ঘনবসতিপূর্ণ পূর্বাঞ্চল অর্থনৈতিকভাবে ভারতের অন্যতম চরম অনগ্রসর এলাকা হিসেবে বিবেচিত।
সুশাসন নিশ্চিত করা এবং এই সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের যুক্তি দেখিয়ে স্থানীয় নেতারা বরাবরই রাজ্যটিকে ছোট ছোট ভাগে বিভক্ত করার পক্ষে সোচ্চার থেকেছেন। ২০০০ সালে উত্তর প্রদেশের একাংশ কেটেই উত্তরাখণ্ড নামে একটি পৃথক রাজ্য গঠন করা হয়েছিল, যা ছোট রাজ্যের দাবির যৌক্তিকতাকে আরও মজবুত করেছিল।
উত্তর প্রদেশকে চার ভাগে বিভক্ত করার বিষয়ে অতীতে যে একেবারে কোনো আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, বিষয়টি এমন নয়। আজ থেকে এক দশকেরও বেশি সময় আগে, ২০১১ সালে উত্তর প্রদেশের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী এবং বহুজন সমাজ পার্টির (বিএসপি) সুপ্রিমো মায়াবতীর নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার উত্তর প্রদেশকে চারটি পৃথক রাজ্যে ভাগ করার একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব রাজ্য বিধানসভায় আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করে এবং তা সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাসও করিয়ে নেয়।
মায়াবতীর সেই প্রস্তাবেও রাজ্যটিকে ঠিক একইভাবে পূর্বাঞ্চল, বুন্দেলখণ্ড, আওয়াধ প্রদেশ (মধ্যাঞ্চল) এবং পশ্চিম প্রদেশ (হাড়িত প্রদেশ) নামে চার ভাগ করার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ভারতের সংবিধানের ৩ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নতুন রাজ্য গঠনের বা সীমানা পরিবর্তনের চূড়ান্ত আইনি ও সাংবিধানিক ক্ষমতা কেবল কেন্দ্রীয় সরকার তথা সংসদের হাতে ন্যস্ত থাকায় এবং তৎকালীন কেন্দ্রীয় সরকারের রাজনৈতিক অনুমোদন বা সম্মতি না পাওয়ায় রাজ্য বিধানসভায় পাস হওয়া সেই যুগান্তকারী উদ্যোগটি আর কখনোই বাস্তবে রূপ লাভ করতে পারেনি।
দীর্ঘদিন পর সেই একই ইস্যু যখন বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং খোদ প্রধানমন্ত্রীর সম্মতির দাবির মোড়কে নতুন করে সামনে আনা হলো, তখন তা স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের মতো প্রথম সারির সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এখন ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ওম প্রকাশ রাজভরের এই চাঞ্চল্যকর দাবিটি কেবলই আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ভোট ব্যাংকের সমর্থন আদায়ের কোনো তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক চমক, নাকি সত্যিই ভারতের মানচিত্রে নতুন কোনো কাঠামোগত পরিবর্তনের পূর্বাভাস।
আগামী দিনগুলোতে কেন্দ্রীয় সরকারের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া এবং জাতিভিত্তিক শুমারির অগ্রগতির ওপরই নির্ভর করবে উত্তর প্রদেশের এই সম্ভাব্য চার টুকরো হওয়ার ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপ নেবে কি না।