বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিচার্জ এবং কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করতে বাধ্য হয়। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ভারতের খ্যাতনামা সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় যখন উজ্জয়িনী পৌর কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষ আগামী ২০২৮ সালের পবিত্র সিংহস্থ মেলার তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য মোট ২৭২টি স্থাপনা উচ্ছেদের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করে।
এই উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় প্রায় চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে, অর্থাৎ ১৩৯০ সালের দিকে নির্মিত অত্যন্ত সুরক্ষিত ও ঐতিহ্যবাহী ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে পরিচিত ঐতিহাসিক শাহী মসজিদের মূল প্রার্থনাকক্ষ, একটি সুউচ্চ মিনার এবং সংলগ্ন বেশ কিছু অংশ ভাঙার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
প্রাচীন এই ধর্মীয় স্থাপনাটি গুঁড়িয়ে দেওয়ার প্রশাসনিক এই সিদ্ধান্তের খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়সহ সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। উচ্ছেদের এই পদক্ষেপে বাধা দিতে এলাকাবাসী ও ধর্মপ্রাণ বিক্ষোভকারীরা যখন রাজপথে নেমে আসেন, তখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা ও পুলিশের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয় এবং কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন বলে অভিযোগ করেছে প্রশাসন। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ঘটনাস্থলে তাৎক্ষণিকভাবে অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী এবং বিশেষায়িত র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (র্যাফ) মোতায়েন করা হয়।
উত্তপ্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বেপরোয়া লাঠিচার্জ শুরু করেন এবং অসংখ্য কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ করে পুরো এলাকা ফাঁকা করার চেষ্টা চালান। এর আগে এই উচ্ছেদ অভিযানের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আইনি লড়াইয়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল।
ইন্দোরের মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টে জনস্বার্থ রক্ষা এবং শহরের তীব্র যানজট নিরসনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে উজ্জয়িনী পৌর কর্পোরেশনের দেওয়া উচ্ছেদ নোটিশের বিরুদ্ধে একটি রিট আবেদন করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে আদালত খারিজ করে দেয়।
এই আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে পুরো মামলার বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট শুনানির দিন নির্ধারিত ছিল সোমবারই। কিন্তু আদালত কিংবা আইনি সুরাহার চূড়ান্ত রায় আসার আগেই তড়িঘড়ি করে প্রশাসন কর্তৃক মসজিদ প্রাঙ্গণে পদক্ষেপ নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে।
এই ধ্বংসাত্মক ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভারতের বিরোধীদলীয় কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ইমরান প্রতাপগড়ি। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন যে, প্রায় ছয়শো বছরের পুরোনো একটি ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক স্থান বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
প্রশাসনের উদ্দেশ্যে তিনি জোরালো দাবি জানিয়ে বলেন যে, রাস্তা প্রশস্ত করার একান্ত প্রয়োজন থাকলে মসজিদের ঐতিহাসিক স্থাপনা অক্ষুণ্ণ রেখে সড়কের বিপরীত পাশের খালি জমি অধিগ্রহণ করা উচিত ছিল।
তিনি আরও গুরুতর অভিযোগ করেন যে, জনস্বার্থ ও আইনি সুরক্ষার বিষয়টি যখন খোদ দেশের উচ্চ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে, তখন স্থানীয় প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে বারবার মসজিদ চত্বর ঘিরে রেখে সাধারণ মানুষের মনে উসকানিমূলক বার্তা ও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।
অন্যদিকে, পুরো ঘটনার সাফাই গেয়ে উজ্জয়িনী পৌর কর্পোরেশনের চেয়ারপারসন কলাবতী যাদব সংবাদমাধ্যমকে জানান যে, পবিত্র শিপ্রা নদীর তীরে প্রতি ১২ বছর পর পর অনুষ্ঠিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম আধ্যাত্মিক সমাবেশ ও মেলা হলো এই সিংহস্থ মেলা।
এই মেলায় দেশ-বিদেশ থেকে কোটি কোটি পুণ্যার্থীর সমাগম ঘটে থাকে, যাদের নিরাপদ যাতায়াত ও উপস্থিতি নিশ্চিত করতে শহরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ২৯ কিলোমিটার দীর্ঘ নতুন ঘাট নির্মাণ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
তিনি দাবি করেন যে, পুণ্যার্থীদের বিপুল যাতায়াত সম্পূর্ণ নির্বিঘ্ন ও সুগম করতে আশপাশের রাস্তা প্রশস্ত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে, যার কারণে এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা ছাড়া বিকল্প কোনো পথ খোলা ছিল না।
ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষা বনাম রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত উন্নয়নের এই দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে বর্তমানে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীজুড়ে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।