সোমবার, সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬
১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম

ইসলামের নামে ঘৃণা ও অপবাদ ছড়ানো কোনো রাজনৈতিক আদর্শ হতে পারে না

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০২:১৯ পিএম

ইসলামের নামে ঘৃণা ও অপবাদ ছড়ানো কোনো রাজনৈতিক আদর্শ হতে পারে না
ছবি : Collected

ইসলামের পবিত্র নাম ব্যবহার করে ঘৃণা, অপবাদ এবং গালমন্দকে কোনোভাবেই রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

 

তার মতে, কোনো ইসলামি রাজনৈতিক দল কিংবা সামাজিক আন্দোলনের গ্রহণযোগ্যতা ও পরিচয় কেবল ফাঁকা স্লোগান বা অন্ধ আবেগ দিয়ে কখনো প্রমাণিত হতে পারে না; বরং সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর প্রকৃত আচরণ, সুদৃঢ় নৈতিকতা এবং বাস্তবমুখী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমেই তা ফুফুটে উঠতে হবে।

 

সম্প্রতি মালয়েশিয়ার বানগিতে আয়োজিত একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই সুদূরপ্রসারী ও সময়োপযোগী মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে।

 

বানগির সমাপনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য প্রদানকালে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত জোরালো ভাষায় বলেন যে, কোনো ইসলামি আন্দোলন যদি পবিত্র নৈতিকতার মৌলিক নীতিগুলো বিসর্জন দিয়ে কেবল অন্ধ ঘৃণা এবং বিদ্বেষে ভরপুর থাকে এবং প্রতিদিনের রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে অপবাদ ও গালমন্দকে বেছে নেয়, তবে সেই ধরনের আন্দোলনের প্রকৃত তাৎপর্য বা সার্থকতা কোথায় থাকে?

 

ইসলামি চেতনার নামে পরিচালিত যেকোনো আন্দোলন যদি যুক্তি ও প্রজ্ঞার বদলে নিছক রাগ, অন্ধ আবেগ এবং উসকানির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে তা কাঠামোগতভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়তে বাধ্য।

 

উল্লেখ্য, বানগির ‘থ্রি জেনারেশনস অ্যাপ্রিসিয়েশন ডিনার’ শীর্ষক এই বিশেষ অনুষ্ঠানের যৌথভাবে আয়োজক ছিল ওয়াদাহ পেমবেরদাসান উমাত মালয়েশিয়া, অ্যাংকাতান বেলিয়া ইসলাম মালয়েশিয়া এবং মালয়েশিয়ান ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব ইসলামিক স্টুডেন্টস।

 

ওই অনুষ্ঠানে আনোয়ার ইব্রাহিম যেকোনো সফল ইসলামি আন্দোলনের মূল শক্তির ভিত্তি হিসেবে প্রথাগত জ্ঞানচর্চা এবং সমৃদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের ওপর বিশেষ জোর দেন। আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে যেকোনো জাতীয় সংগ্রাম বা রাজনৈতিক আন্দোলন কেবল ক্ষণিকের আবেগ এবং উত্তেজনার ওপর ভর করে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না বলে মনে করেন মালয়েশিয়ার সরকারপ্রধান।

 

তার মতে, প্রকৃত জ্ঞান মানুষের মনে গভীর সচেতনতা এবং নিখাদ দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে সহায়তা করে। একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী ‘মাদানি’ রাষ্ট্র বিনির্মাণের সুমহান লক্ষ্য অর্জন করতে হলে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি ঐতিহ্যগত জ্ঞানকে শক্ত ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করতে হবে।

 

ইসলামি আন্দোলনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডার বা ‘তুরাথ’ এবং ‘উসরা’র গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমান আধুনিক যুগে সাধারণ মানুষের মাঝে ইসলামের প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেলেও, অনেক ক্ষেত্রে সমসাময়িক ইসলামি দল ও সংগঠনগুলোর সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তারা ঐতিহ্যবাহী ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যের সঙ্গে নিজেদের যথাযথ ও গভীর সম্পর্ক রক্ষা করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

 

এর আগে গত ১৯ সেপ্টেম্বর কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত জাতীয় তুরাথ আলেম সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণেও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী একই ধরনের গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। ওই সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন যে, সমাজে ইসলামি সচেতনতা এবং দ্বীনি জ্ঞানচর্চার পরিধি প্রসারিত হলেও অনেক ইসলামি আন্দোলন ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে প্রকৃত ঐতিহ্যগত ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারের সেতুবন্ধন যথেষ্ট দুর্বল রয়ে গেছে।

 

এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে মতপার্থক্য ও সংঘাত অনেক সময় অত্যন্ত কঠোর ও নিষ্ঠুর রূপ ধারণ করে, যেখানে প্রজ্ঞা, ধৈর্য, সহনশীলতা এবং গবেষণালব্ধ চিন্তার মারাত্মক ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়।

 

ইসলামী ঐতিহ্যের প্রখ্যাত ও বরেণ্য আলেমদের মহামূল্যবান জ্ঞানকে কেবল নিজেদের রাজনৈতিক বক্তব্যের পক্ষে ব্যবহারের কৌশল থেকে বেরিয়ে এসে, সেই জ্ঞানকে প্রকৃত যুক্তি ও মুক্তচিন্তার মূল ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান তিনি।

 

তার মতে, যেকোনো ইসলামি আন্দোলনের প্রকৃত নেতৃত্বকে অবশ্যই জ্ঞান, উন্নত নৈতিকতা এবং সুমহান আদর্শের এক অপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। আনোয়ার ইব্রাহিম তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে ইসলামি আন্দোলনের বহুমুখী দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

 

তার মতে, দায়িত্বশীল আন্দোলনের প্রধান দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে সর্বস্তরে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন ও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করা, উগ্র ও সংকীর্ণ ‘তাকফিরি’ চিন্তাধারার জোরালো বিরোধিতা করা, সমাজের চরম দারিদ্র্য বিমোচনে সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো এবং একই সঙ্গে সামাজিক শিষ্টাচার, নৈতিক মূল্যবোধ ও নিজস্ব জাতীয় পরিচয়ের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান বজায় রাখা।

 

বিশেষ করে ‘তাকফিরি’ মানসিকতা বা ভিন্নমতাবলম্বী ও বিরোধী পক্ষকে খুব সহজে এবং অবলীলায় ধর্মের গণ্ডি থেকে বাইরে বা কাফের হিসেবে ফতোয়া দেওয়ার বিপজ্জনক প্রবণতার তীব্র সমালোচনা করেন তিনি।

 

তার মতে, এ ধরনের গোঁড়ামি সমাজে বিভাজন ও বিশৃঙ্খলা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর বিপরীতে তিনি জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা, নৈতিক আচরণ এবং সর্বোচ্চ দায়িত্বশীলতা প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

 

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের অগ্রগতির এই যুগে ইসলামি দাওয়াহ ও জ্ঞানচর্চার বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।

 

তবে একই সঙ্গে তিনি কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন যে, যথাযথ নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও আদর্শের শক্তিশালী কাঠামো ছাড়া প্রযুক্তির নির্বিচার ব্যবহার মানবজাতির জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

সার্বিকভাবে বিবেচনা করলে, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর এই দীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্যে মূলত জ্ঞান, নৈতিকতা এবং দায়িত্বশীল সংগ্রামের ত্রিমুখী রূপরেখা ফুটে উঠেছে। তার সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইসলামের পবিত্র নাম ব্যবহার করে পরিচালিত যেকোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক আন্দোলন যদি কেবল আবেগঘন স্লোগান, কৃত্রিম উত্তেজনা কিংবা ক্ষোভের ওপর ভর করে টিকে থাকতে চায়, তবে তা কখনোই টেকসই হতে পারে না।

 

বরং ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্য, গভীর যুক্তিবোধ, পারস্পরিক শিষ্টাচার এবং সর্বসাধারণের সার্বিক কল্যাণকে যেকোনো আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মালয়েশিয়ার বর্তমান জটিল রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে ইসলাম এবং মালয় পরিচিতিকে কেন্দ্র করে চলমান নানা বিতর্কের মাঝে আনোয়ার ইব্রাহিমের এই ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদর্শী বক্তব্য বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

 

তার এই বার্তার মূল সারসংক্ষেপ হলো-ইসলামের নামে কোনোভাবেই ঘৃণা, অপবাদ ও গালমন্দকে আদর্শিক সংগ্রামের বিকল্প হিসেবে মেনে নেওয়া যায় না, এবং যেকোনো ইসলামি আন্দোলনের প্রকৃত সাফল্য বা গ্রহণযোগ্যতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে তার উন্নত জ্ঞানচর্চা, অনুকরণীয় নৈতিক আচরণ এবং সমাজের প্রতি তাদের বাস্তবভিত্তিক ও ইতিবাচক অবদানের ওপর।

 

-