তবে এই পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করে বিগত দুই সপ্তাহ ধরে দিনরাত মসজিদের ভেতরে ও বাইরে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন শত শত ধর্মপ্রাণ মানুষ। গত রোববার রাতে পৌর কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে মসজিদ ভাঙার উদ্দেশ্যে বুলডোজার এবং অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করা হলে পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করে এবং তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, রোববার গভীর রাতে মসজিদের চারপাশের নিরাপত্তা বলয় জোরদার করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স বা র্যাফ মোতায়েন করা হয়। ঠিক একই সময়ে ঘটনাস্থলে ভারী বুলডোজার নিয়ে আসা হলে মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয় মুসলিমদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
মুহূর্তের মধ্যে মসজিদের ভেতর ও বাইরে হাজারো মানুষ এসে জড়ো হন এবং সরব প্রতিবাদ জানান। জনগণের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও দৃঢ় প্রতিরোধ এবং বিপুল জনসমাগমের মুখে শেষ পর্যন্ত পুলিশ প্রশাসন ওই রাতে কোনো ধরনের ভাঙার অভিযান পরিচালনা না করেই পিছু হটতে বাধ্য হয়।
সোমবারেও এই অবস্থান কর্মসূচি পূর্ণ উদ্যমে অব্যাহত রয়েছে। দুপুরের নামাজের পরও মসজিদের ভেতর ও প্রাঙ্গণে অন্তত এক হাজার মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। যদিও অংশগ্রহণকারীরা পালাক্রমে মসজিদে অবস্থান করছেন, তবে কৌশলগত কারণে সব সময়ই সেখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে।
এ ছাড়া মসজিদের ঐতিহ্যগত পবিত্রতা বজায় রেখে প্রতিদিনের পাঁচ ওয়াক্ত নিয়মিত নামাজও যথাযথভাবে আদায় করা হচ্ছে। দীর্ঘ দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত স্থানীয় বাসিন্দা তৌকির খান গণমাধ্যমকে জানান যে, ঐতিহাসিক এই মসজিদটিকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করার জন্য এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে পালাক্রমে ভেতরে অবস্থানের কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রশাসনের যেকোনো অনৈতিক ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ প্রতিহত করতে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ রয়েছেন। মসজিদের সার্বিক কার্যক্রম ও আইনগত বিষয়গুলো দেখভালের জন্য স্থানীয় দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সম্মতিতে ইতিমধ্যেই এগারো সদস্যের একটি বিশেষ নুমাইন্দা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটির সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানেই মসজিদ রক্ষার এই কর্মসূচি সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। ঐতিহাসিক এই শাহী মসজিদটি উজ্জয়িনীর বিখ্যাত মহাকালেশ্বর মন্দিরের ঠিক বিপরীতে এবং পবিত্র ক্ষিপ্রা নদীর অত্যন্ত নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত।
আসন্ন ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভমেলাকে কেন্দ্র করে পর্যটক ও পুণ্যার্থীদের বিপুল সমাগম সামাল দিতে উজ্জয়িনী পৌর করপোরেশন ওই এলাকার সড়ক নেটওয়ার্ক ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
প্রস্তাবিত মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী সড়কটি পনেরো মিটার পর্যন্ত প্রশস্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যার ফলে শাহী মসজিদের একটি অংশ ভেঙে ফেলার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলে দাবি করছে পৌর কর্তৃপক্ষ।
প্রশাসনের এই প্রস্তাবিত ভাঙার তালিকায় রয়েছে মসজিদের মূল জামাতখানার একটি অংশ, প্রায় এক শ বিশ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি সুউচ্চ মিনার এবং স্থানীয়ভাবে 'মাজহার চৌক শাহী' নামে পরিচিত ঐতিহাসিক অংশটি।
মসজিদ পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই পবিত্র স্থাপনাটি একশ বছরেরও অধিক পুরোনো এবং এর ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ও বৈধতার পক্ষে ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পরবর্তী বিভিন্ন সময়ের বহু পুরনো সরকারি নথি ও দলিলপত্র সংরক্ষিত রয়েছে।
মসজিদ কমিটির উদ্ধৃত ঐতিহাসিক নথিপত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে ১৯২৫ সালের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চিঠি। তৎকালীন সিন্ধিয়া রাজবংশের শাসনাধীন গ্বালিয়র সরকারের টাউন ইমপ্রুভমেন্ট ট্রাস্টের সেই চিঠিতে স্পষ্টভাবে জমি অধিগ্রহণের প্রসঙ্গ উল্লেখ করার পাশাপাশি মসজিদের অবশিষ্ট ঐতিহাসিক অংশ পুরোপুরি অক্ষত রাখার সুনির্দিষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল বলে কমিটির পক্ষ থেকে জোরালো দাবি করা হচ্ছে।
এ ছাড়াও ১৯৮৫ সালের মধ্যপ্রদেশ সরকারের একটি সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তিতেও এই ঐতিহাসিক মসজিদটির সুনির্দিষ্ট নাম, অবস্থান ও পরিমাপের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। তবে এই আইনি ও ঐতিহাসিক লড়াইয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও পৌরসভার পক্ষ থেকে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ায় মসজিদ পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান আইনি অবস্থান কিছুটা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট উজ্জয়িনী পৌর করপোরেশনের পক্ষ থেকে জারি করা মসজিদ ভাঙার নোটিশকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের করা দুটি পৃথক রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছে। বিচারপতি সন্দীপ এন ভাটের একক বেঞ্চের রায়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে যে, পৌর কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত এই পদক্ষেপ প্রচলিত আইনি বিধিবিধান ও প্রক্রিয়া পুরোপুরি অনুসরণ করেই নেওয়া হয়েছে এবং মসজিদ পরিচালনাকারীদেরও তাদের বক্তব্য যথাযথভাবে উপস্থাপনের পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
আদালত ভারতীয় সংবিধানের চৌদ্দ, পঁচিশ, ছাব্বিশ এবং তিন শ' 'এ' অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের যে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তাও আমলে নেয়নি। আদালতের প্রধান পর্যবেক্ষণে ২০২৮ সালের সিংহস্থ কুম্ভমেলা উপলক্ষ্যে বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ তীর্থযাত্রীর নিরাপদ আগমন, শহরের তীব্র যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ জনগণের সার্বিক জনসুবিধার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
মহাকালেশ্বর মন্দির ও ক্ষিপ্রা নদীর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই সুনির্দিষ্ট এলাকার সড়ক সম্প্রসারণ অপরিহার্য বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। মসজিদ পরিচালনাকারী কমিটির আইনজীবীরা এই রায়ের বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, এই সিদ্ধান্তের ফলে কেবল একটি আধুনিক ভবনের অংশবিশেষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, বরং শতবর্ষী মসজিদের পবিত্র জামাতখানা, ঐতিহ্যবাহী মিনার এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের গভীর ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে জড়িত অমূল্য স্থাপত্য কাঠামোগুলি ধ্বংস হয়ে যাবে।
অন্যদিকে ইন্দোরের বিশিষ্ট আলেম মুফতি জুনাইদ প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি মুসলিমদের সঙ্গে অতীতে করা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের গুরুতর অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর দাবি, এর আগে উজ্জয়িনীর পুরনো তাখিয়া মসজিদ ভেঙে ফেলার প্রাক্কালে প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মুফতিদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে সেই ঐতিহাসিক মসজিদটি স্পর্শ করা হবে না, কিন্তু পরবর্তীতে ঠিকই তা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তাখিয়া মসজিদের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি এবার শাহী মসজিদের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে আশঙ্কা করে মুসলিম সমাজ আর প্রশাসনের কোনো মৌখিক আশ্বাসের ওপর ভরসা রাখতে রাজি নয়।
মুফতি জুনাইদের মতে, শাহী মসজিদ অপসারণ করা হলে পরবর্তীতে উজ্জয়িনীর আরও অন্তত আটাশটি পুরোনো মসজিদ একই ধরনের তীব্র ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে, যা মূলত শহর পুনর্গঠন ও আধুনিকায়নের আড়ালে ধর্মীয় ঐতিহ্য মুছে ফেলার একটি সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র।
এই পুরো পরিস্থিতিতে মসজিদ কমিটির নিযুক্ত আইনজীবী জায়েদ পাঠান জানিয়েছেন যে, হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। উচ্চ আদালতের রায়ের আইনি ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
তবে আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ না আসা পর্যন্ত এবং মসজিদ রক্ষায় স্থানীয় মুসলিমরা তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি যেকোনো মূল্যে চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অবিচল রয়েছে। এদিকে মুফতি জুনাইদ অত্যন্ত কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে জানিয়েছেন যে, সাধারণ মানুষ কিংবা ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা কখনোই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে বা প্রশাসনের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাতে জড়াতে চান না, তবে যেকোনো মূল্যে নিজেদের পবিত্র ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষা করতে তাঁরা পিছপা হবেন না।
প্রয়োজনে অন্যায়ভাবে বুলডোজার চালানোর আগে সেই বুলডোজার তাদের গায়ের ওপর দিয়ে চালাতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন। যদিও এসবের মধ্য দিয়ে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের গভীর ক্ষোভ ও চরম উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে, তবুও দিনশেষে আইনি লড়াই এবং রাজপথের শান্তিপূর্ণ অবস্থানের মধ্য দিয়েই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একটি স্থায়ী সুরাহা খোঁজার চেষ্টা চলছে।
একটি জনকল্যাণমূলক নগর উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই সাধারণ বিরোধটি এখন দেশের ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা, ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারের সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের আইনি ব্যাখ্যা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ের এক বিস্তৃত ও সংবেদনশীল দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে।