গত সোমবার বেইজিংয়ে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই অভাবনীয় প্রস্তাবের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন, যা একই সঙ্গে বিস্ময় এবং বৈশ্বিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর বরাতে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
তিন দিনব্যাপী এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফর শেষে চীনের রাষ্ট্রপ্রধান শি জিনপিং যখন নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তার পরপরই গত রোববার মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ গণমাধ্যমের সামনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্যটি ফাঁস করেন।
পারডিউ তার সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে জানান যে, সারা বিশ্বজুড়ে মার্কিন সমরাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির যে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত ধারাবাহিক নীতি ডোনাল্ড ট্রাম্প অনুসরণ করে আসছেন, তারই অংশ হিসেবে তিনি চীনা প্রেসিডেন্টকেও মার্কিন অস্ত্র কেনার সরাসরি প্রস্তাব দেন।
তবে বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনেতা শি জিনপিং এই অপ্রত্যাশিত প্রস্তাবের জবাবে ঠিক কী ধরনের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, সে বিষয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত পারডিউ কোনো সুস্পষ্ট তথ্য প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে এই শীর্ষ বৈঠকের রুদ্ধদ্বার কক্ষে আসলে কী ঘটেছিল, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নানামুখী জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে।
এই অপ্রত্যাশিত ও নজিরবিহীন প্রস্তাবের খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পরই চীনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফর পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বিষয়টি নিয়ে বেইজিংয়ের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, চীন সর্বদা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা এবং ভৌগোলিক প্রয়োজন অনুযায়ী একটি অত্যন্ত শক্তিশালী, স্বয়ংসম্পূর্ণ ও আধুনিক সামরিক বাহিনী গড়ে তুলেছে। সামরিক সক্ষমতা অর্জনের ক্ষেত্রে বেইজিং সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
একই সঙ্গে তিনি পুনরুল্লেখ করেন যে, বিশ্বশান্তি, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা রক্ষায় চীন সবসময় দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মূলত এই বক্তব্যের মাধ্যমে বেইজিং পরোক্ষভাবে মার্কিন সমরাস্ত্রের ওপর তাদের অনাগ্রহ এবং নিজস্ব সামরিক শক্তির ওপর অবিচল আস্থার বিষয়টিকেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূতের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন খোদ মার্কিন প্রশাসনের ভেতরেই চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রির নীতিগত ও আইনগত অবস্থান নিয়ে স্পষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। ডেভিড পারডিউ মূলত তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত সমরাস্ত্র বিক্রির দীর্ঘমেয়াদি নীতির যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়েই সংবাদমাধ্যমে এই মন্তব্যটি করেছিলেন।
কিন্তু তার এই বক্তব্যের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর শোনা যায়। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হংকংভিত্তিক প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে, বর্তমান মার্কিন আইনে চীনের কাছে যেকোনো ধরনের সামরিক সরঞ্জাম বা সমরাস্ত্র বিক্রি সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ।
ওই কর্মকর্তা আরও পরিষ্কার করে জানান যে, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে বেইজিংয়ের কাছে অস্ত্র বিক্রির কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তাদের কাছে নেই। রাষ্ট্রদূতের প্রকাশ্য বিবৃতি এবং পররাষ্ট্র দপ্তরের এই আনুষ্ঠানিক অস্বীকারের মধ্যে যে স্পষ্ট স্ববিরোধিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতাকেই যেন বিশ্ববাসীর সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে।
এই সমগ্র বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বশাসিত দ্বীপরাষ্ট্র তাইওয়ান, যাকে কেন্দ্র করে ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের মধ্যে দশকের পর দশক ধরে এক ভূরাজনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধ চলমান রয়েছে। ডেভিড পারডিউ ফক্স নিউজের ওই সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ান নীতির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।
তিনি উল্লেখ করেন যে, তাইওয়ানের সুরক্ষায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে দীর্ঘদিনের কৌশলগত নীতি রয়েছে, তা এখনো সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রয়েছে। পারডিউ তথ্য দিয়ে জানান যে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি তাইওয়ানের জন্য প্রায় এগারো বিলিয়ন বা এক হাজার একশ কোটি মার্কিন ডলারের একটি বিশাল সামরিক অস্ত্র সহায়তা প্যাকেজ চূড়ান্ত অনুমোদন করেছেন।
পরিসংখ্যানগত দিক থেকে বিচার করলে, ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও তাইওয়ানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের মেয়াদে তাইওয়ানকে দেওয়া এটিই সবচেয়ে বড় সামরিক প্যাকেজ, যা পূর্ববর্তী যেকোনো সহায়তার তুলনায় অন্তত পঞ্চাশ শতাংশ বেশি।
তাইওয়ানের সামরিক সক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধির এই মার্কিন পদক্ষেপ স্বভাবতই বেইজিংয়ের তীব্র ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাইওয়ান ইস্যুটি চীনের কাছে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং জাতীয় অখণ্ডতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বিষয়, কারণ বেইজিং স্বশাসিত এই দ্বীপটিকে নিজেদের মূল ভূখণ্ডের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে থাকে।
এমনকি প্রয়োজনে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে হলেও তাইওয়ানকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণাও বেইজিং একাধিকবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে দিয়েছে। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো ধরনের সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির তীব্র ও কঠোর বিরোধিতা করে আসছে চীন।
বেইজিংয়ের জোরালো দাবি, ওয়াশিংটনের এই অস্ত্র বিক্রি নীতি এক চীন নীতি বা 'ওয়ান চায়না পলিসি'র সরাসরি লঙ্ঘন এবং এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করছে।
পারডিউয়ের মন্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে যেমন তাইওয়ানকে সামরিকভাবে শক্তিশালী করে চীনের প্রভাব বলয় রুখতে চাইছে, অন্যদিকে ট্রাম্পের অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাবকে সামনে এনে একটি মনস্তাত্ত্বিক কূটনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল অবলম্বন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম লেনদেনের একটি সুদীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে, যা বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করলে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়। গত শতাব্দীর আশির দশকে, যখন বিশ্বজুড়ে স্নায়ুযুদ্ধের চরম পর্যায় চলছিল, তখন তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য মোকাবিলায় ওয়াশিংটন এবং বেইজিং সামরিক সহযোগিতার এক অনন্য সমীকরণ গড়ে তুলেছিল।
ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে চীনের কাছে বেশ কিছু আধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি বিক্রি করেছিল, যা ছিল তৎকালীন বিশ্বরাজনীতির এক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু এই উষ্ণ সম্পর্কের আকস্মিক অবনতি ঘটে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে।
১৯৯০ সালের পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংঘাত ও মানবাধিকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চীনের কাছে সব ধরনের সামরিক প্রযুক্তি ও সমরাস্ত্র বিক্রির ওপর অত্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তিন দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার পটভূমিতে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কর্তৃক পুনরায় শি জিনপিংকে মার্কিন সমরাস্ত্র ক্রয়ের প্রস্তাব দেওয়ার ঘটনাটি তাই আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অভূতপূর্ব বিস্ময় ও কৌতূহল তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই প্রস্তাব নিছক কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক প্রস্তাব নয়, বরং এর নেপথ্যে এক গভীর ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ লুকিয়ে রয়েছে। একদিকে তাইওয়ানকে ইতিহাস সৃষ্টিকারী রেকর্ড পরিমাণ সামরিক সহায়তার মাধ্যমে বেইজিংকে একটি কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে, আর অন্যদিকে খোদ চীনা রাষ্ট্রপ্রধানকে অস্ত্র বিক্রির প্রস্তাব দিয়ে এক ধরনের সুকৌশলী কূটনৈতিক ধোঁয়াশা তৈরি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুসারে, এই পুরো ঘটনাটি বিশ্বরাজনীতিতে দুই পরাশক্তির মধ্যে চলমান শক্তি প্রদর্শনের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই ধরনের প্রকাশ্য এবং অপ্রচলিত কূটনৈতিক চাল অদূর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন কোনো মোড় নিয়ে আসতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত এই সমরাস্ত্র বিক্রির বিতর্কিত প্রস্তাব ও তাইওয়ান ইস্যুকে কেন্দ্র করে বেইজিং এবং ওয়াশিংটনের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমিত হবে নাকি তা বিশ্বকে নতুন কোনো সংঘাতের দিকে ঠেলে দেবে, তা কেবল সময়ই বলে দেবে।
বর্তমানে এই ঘটনাটি বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে এবং সারা বিশ্বের নজর এখন প্রশান্ত মহাসাগরীয় এই দুই পরাশক্তির পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে।