বুধবার, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬
১৫ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভারতে মুসলিমদের জমি ও গাড়ির ধর্মভিত্তিক তথ্য চেয়েছে ডেমোগ্রাফি কমিশন

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম

ভারতে মুসলিমদের জমি ও গাড়ির ধর্মভিত্তিক তথ্য চেয়েছে ডেমোগ্রাফি কমিশন
ছবি : Collected

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত ‘উচ্চপর্যায়ের জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বিষয়ক কমিটি’ বা ডেমোগ্রাফি কমিশনের কার্যপরিধি ও তথ্য চাওয়ার ধরন নিয়ে মারাত্মক অভিযোগ তুলেছেন নিখিল ভারত মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) সভাপতি ও বিশিষ্ট সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি।

 

তিনি দাবি করেছেন, দেশের বিভিন্ন রাজ্য সরকারের কাছ থেকে গাড়ি নম্বর বা নিবন্ধন এবং স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচা সংক্রান্ত ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে মূলত সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়কে নির্দিষ্টভাবে লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে।

 

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের অধীন গঠিত এই বিশেষ কমিশনটির উদ্দেশ্য কোনো কল্যাণকামী নীতি প্রণয়ন নয়, বরং ধর্মীয় ভিত্তিতে তথ্য বিকৃত করে মুসলিমদের অবশিষ্ট সাংবিধানিক ও নাগরিক অধিকার হরণ করার একটি সূক্ষ্ম প্রক্রিয়ার অংশ বলে তিনি সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ প্রকাশ করেছেন।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর ধারা বজায় রেখে ভারতের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত বিতর্ককে কেন্দ্র করে নতুন করে চরম আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া একটি বিশদ পোস্টে গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সূত্র উল্লেখ করে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ভারতের কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

 

তিনি মনে করিয়ে দেন যে, এর আগে যখনই বিরোধী দল ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা মোদী সরকারের কাছে ভারতে বসবাসকারী মুসলিমদের প্রকৃত শিক্ষাগত অবস্থা, সামাজিক পিছিয়ে পড়া অবস্থা এবং অর্থনৈতিক সামর্থ্যের সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য একটি সমন্বিত সমীক্ষা বা শুমারি চালানোর জোরালো দাবি জানিয়েছিলেন, তখন সরকার তাৎক্ষণিকভাবে তা প্রত্যাখ্যান করে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।

 

অথচ এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ডেমোগ্রাফি কমিশন দেশের প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে জানতে চাইছে যে-কোন ধর্মের মানুষ কতগুলো গাড়ি বা যানবাহন ক্রয় করেছে, কার কতখানি জমি বা বাণিজ্যিক স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে এবং কোন অঞ্চলে সম্পত্তি হাতবদল কীভাবে হচ্ছে।

 

এই ধরনের ধর্মীয় পরিচয়যুক্ত তথ্যের অনুসন্ধান গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। হায়দরাবাদের এই প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা আরও অভিযোগ করেছেন যে, সরকারি কাজের সুবিধার্থে বা সাধারণ জনগণের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা প্রণয়ন করা এই ডেমোগ্রাফি কমিশনের মূল লক্ষ্য নয়।

 

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন যে, সংগৃহীত তথ্যগুলোকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহার করা হতে পারে এবং সেগুলোকে এমন বিভ্রান্তিকরভাবে জনসমক্ষে উপস্থাপন বা রূপান্তর করা হতে পারে, যাতে সামগ্রিকভাবে মুসলিম সমাজকে অপরাধী বা অবৈধ সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ তৈরি হয়।

 

ওয়াইসির মতে, এই প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত পরিণতিতে ভারতের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক নাগরিক অধিকারসমূহ সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে, যা দেশের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুমকি স্বরূপ।

 

বিভিন্ন প্রকাশিত বিশ্বস্ত সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে সংঘটিত বিভিন্ন খাতের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান চেয়েছে উচ্চপর্যায়ের এই ডেমোগ্রাফি কমিটি। তারা রাজ্যগুলোর কাছে গত দেড় দশকের ধর্মভিত্তিক জন্মনিবন্ধন তথ্য, যানবাহন কেনাবেচার নিবন্ধন তালিকা, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষার্থীদের ভর্তির হার এবং স্থাবর সম্পত্তি কেনাবেচা বা হস্তান্তরের সম্পূর্ণ ধর্মীয় তথ্য বিশদভাবে তলব করেছে।

 

এর পাশাপাশি প্রতিটি জেলার প্রশাসনিক সীমানার মধ্যে নির্মিত ও বিদ্যমান বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয় বা প্রতিষ্ঠানের সঠিক সংখ্যা, ভৌগোলিক অবস্থান এবং ওইসব অঞ্চলে বায়োমেট্রিক পরিচয়পত্র আধার, ভোটার পরিচয়পত্র ও রেশন কার্ড নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত বৃদ্ধি ঘটেছে কি না, সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান চেয়েছে কমিশন।

 

সরকারি নথিতে এই ধরনের বিস্তারিত অনুসন্ধানকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন ও বিরোধী রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ডেমোগ্রাফি কমিশনের এই বিশাল তথ্য অনুসন্ধানের ব্যাপ্তি কেবল জনসংখ্যা বা নথিপত্রেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক কাঠামোর অন্যান্য সংবেদনশীল খাতেও প্রবেশ করেছে।

 

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কমিটি থেকে ভারতের প্রান্তিক তফসিলি উপজাতি জনগোষ্ঠীর মধ্যে ধর্মীয় রূপান্তর বা ধর্মান্তরের সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়নে রাজ্য ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তৈরি করা বিশেষ পর্যালোচনা প্রতিবেদন, পূর্ববর্তী বিভিন্ন সরকারি কমিশন বা তদন্ত কমিটির সুপারিশমালা এবং বর্তমানে দেশে কার্যকর থাকা আটককেন্দ্র বা ডিটেনশন সেন্টারগুলোর বর্তমান অবস্থা ও ধারণক্ষমতা সংক্রান্ত সমস্ত গোপনীয় ও প্রশাসনিক তথ্য চাওয়া হয়েছে।

 

এই ধরনের বিশদ সামরিক ও গোয়েন্দা পর্যালোচনার সংমিশ্রণ প্রশাসনিক পরিমণ্ডলে এক অভাবনীয় ও নজিরবিহীন পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। উল্লেখযোগ্য যে, চলতি বছরের ২৬ মে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে অবৈধ অনুপ্রবেশ সহ অন্যান্য সামাজিক ও ঐতিহাসিক কারণে সৃষ্ট অস্বাভাবিক জনসংখ্যাগত পরিবর্তন বা ডেমোগ্রাফিক শিফট গভীরভাবে পর্যালোচনা করার লক্ষ্যে এই উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে।

 

এই কমিটি গঠনের মূল লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছিল, জনসংখ্যার এই ধরনের হঠাৎ পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় আইনগত ও প্রশাসনিক সুপারিশ সরকারের কাছে উপস্থাপন করা। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রখ্যাত বিচারপতি প্রকাশ প্রভাকর নাওলেকরকে এই বিশেষ কমিটির শীর্ষ প্রধান বা চেয়ারপার্সন হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

 

কিন্তু শুরু থেকেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই কমিটির প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এর আইনি বৈধতা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন ও সংশয় প্রকাশ করে আসছে। এর আগে গত ২৭ সেপ্টেম্বর গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় আসাদউদ্দিন ওয়াইসি এই ডেমোগ্রাফি কমিশনের ভবিষ্যত কার্যক্রম ও কৌশল নিয়ে একাধিক বিস্ফোরক দাবি করেছিলেন।

 

তিনি বলেন, যেখানে যেখানে জনসংখ্যাগত কাঠামোর পরিবর্তন ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেখানে সেখানে এই কমিটির প্রতিনিধিরা সরাসরি মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে যাবেন। বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়া স্পর্শকাতর অঞ্চলগুলোতে সরেজমিনে পরিদর্শন চালিয়ে তারা চূড়ান্তভাবে প্রস্তুতকৃত ভোটার তালিকা গভীরভাবে পুনঃপরীক্ষা ও পর্যালোচনা করবেন।

 

ওয়াইসির সুনির্দিষ্ট দাবি, এই পুরো প্রক্রিয়ার আড়ালে প্রকৃতপক্ষে তথাকথিত অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করার একটি সুদূরপ্রসারী নকশা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যা সীমান্তঘেঁষা রাজ্যগুলোর সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিচ্ছে।

 

ওয়াইসি তার বক্তব্যে ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পূর্বের একাধিক জনসভার বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সমগ্র দেশে বিতর্কিত জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি বাস্তবায়নের ব্যাপারে বারবার নিজেদের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছিলেন।

 

এআইএমআইএম প্রধান তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করে জানান, বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যে নতুন ও পরিমার্জিত ভোটার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে, মূলত সেই তালিকাকেই ভিত্তি ধরে পরবর্তীতে সারাদেশে নতুন মোড়কে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি চাপিয়ে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে।

 

তিনি দাবি করেন, সরাসরি এনআরসি চালু করতে গেলে যে আইনি ও সামাজিক বাধার সম্মুখীন হতে হতো, এই ধরনের পরোক্ষ ডেমোগ্রাফি কমিশনের মাধ্যমে তা বাস্তবায়নের পথ সুগম করা হচ্ছে।

 

ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, কোনো একটি সুনির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্থাবর সম্পত্তি, ব্যক্তিগত যানবাহন ক্রয়, এমনকি সন্তানদের স্কুলে ভর্তির মতো মৌলিক ও ব্যক্তিগত বিষয়গুলোকে ধর্মীয় মানদণ্ডে পরিমাপ করার এই সরকারি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের পরিপন্থী।

 

ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং নাগরিক স্বাধীনতার ওপর এই ধরনের প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ সংবিধানের সমতার নীতিকে ক্ষুণ্ন করতে পারে বলে দেশটির আইনি বিশেষজ্ঞরা অভিমত প্রকাশ করেছেন।

 

অন্যদিকে, ক্ষমতাসীন পক্ষের সমর্থকদের দাবি, দেশের নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক ভারসাম্য রক্ষায় অবৈধ অনুপ্রবেশ চিহ্নিতকরণ এবং সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ।

 

সামগ্রিকভাবে, ডেমোগ্রাফি কমিশনের এই বিতর্কিত পদক্ষেপ ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। একদিকে সরকারপক্ষ একে দেশের জনসংখ্যাগত ভারসাম্য ও নিরাপত্তার স্বার্থে নেওয়া সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করছে, অন্যদিকে ওয়াইসিসহ দেশের বহু বিরোধী দল ও নাগরিক সমাজ এটিকে ধর্মীয় বিভাজন তৈরি এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক ও আর্থ-সামাজিক কোনঠাসা করার একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত করছে।

 

আগামী দিনগুলোতে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বাধীন এই কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশ ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, বিচারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে দেশী-বিদেশী পর্যবেক্ষণ মহল।

 

- মুসলিম মিরর