মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬
১৪ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

দেড় হাজার মিয়ানমার নাগরিককে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৫:১৫ পিএম

দেড় হাজার মিয়ানমার নাগরিককে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া
ছবি : Collected

আন্তর্জাতিক মহলের প্রবল আপত্তি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র উদ্বেগকে সম্পূর্ণ পাশ কাটিয়ে মিয়ানমারের দেড় হাজারেরও বেশি নাগরিককে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর একটি বড় ধরনের সামরিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে মালয়েশিয়া সরকার।

 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে মঙ্গলবার সকাল থেকেই কড়া নিরাপত্তায় অভিবাসীদের উপকূলীয় অঞ্চলে সরিয়ে নেওয়ার কাজ প্রত্যক্ষ করা গেছে।

 

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাগুলোর পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা আটক কেন্দ্রগুলো থেকে কথিত 'স্বেচ্ছায়' নিজ জন্মভূমিতে ফিরে যেতে সম্মত হওয়া প্রায় পাঁচ হাজার মিয়ানমার নাগরিকের মধ্য থেকে প্রথম পর্যায়ে এই দেড় হাজার জনকে একটি বিশেষ সামুদ্রিক জাহাজে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

 

মিয়ানমারে চলমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সামরিক শাসনের অমানবিক পরিস্থিতির মুখে এই বিপুল সংখ্যক মানুষকে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার আলোকে এক বড় ধরনের প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

ঘটনাপ্রবাহের প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলোর অনুসৃত অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপে মিয়ানমারের নাগরিকদের বহনকারী বেশ কয়েকটি সুসজ্জিত বাস অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সশস্ত্র পুলিশি পাহারায় মালয়েশিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য পেরাকের লুমুত নৌঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থিত মজলিস পারবান্দারান মানজুং স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে গিয়ে পৌঁছায়।

 

তবে এই প্রক্রিয়ার অত্যন্ত সংবেদনশীল প্রকৃতির কারণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এতটাই কড়া রাখা হয়েছিল যে স্টেডিয়াম চত্বরে উপস্থিত স্বাধীন সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের ভেতরে প্রবেশের কোনো অনুমতি দেওয়া হয়নি।

 

প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কৌশলগত পর্যবেক্ষকদের ধারণা, স্টেডিয়ামটিকে একটি অস্থায়ী প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করে অভিবাসীদের যাবতীয় ব্যক্তিগত নথিপত্র, বায়োমেট্রিক তথ্য এবং আনুষঙ্গিক আইনি আনুষ্ঠানিকতা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

 

প্রাথমিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর অত্যন্ত গোপনে তাদেরকে সংলগ্ন লুমুত কৌশলগত নৌঘাঁটিতে স্থানান্তর করা হবে এবং সেখান থেকে নির্ধারিত বিশেষ সামরিক ও পণ্যবাহী জাহাজে তুলে মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে রওনা করিয়ে দেওয়া হবে।

 

যদিও মালয়েশিয়া সরকার এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে একটি স্বাভাবিক আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছে, তবে এই দেড় হাজার জনের সামরিক দলের মধ্যে ঠিক কতজন নিপীড়িত রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্য রয়েছেন, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কিংবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

 

এই অস্পষ্টতা বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে সন্দেহ ও আশঙ্কার মাত্রা বহু গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা তথ্য প্রদান করে জানিয়েছে যে, বর্তমানে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত আনুমানিক এক লাখ ৯০ হাজার মিয়ানমারের নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মূলত জন্মভূমিতে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হওয়া মুসলিম সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষ।

 

ফলে কোনো প্রকার নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা গ্যারান্টি ছাড়া তাদেরকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হলে তারা নতুন করে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের মুখোমুখি হতে পারেন বলে আন্তর্জাতিক মহল আশঙ্কা প্রকাশ করছে।

 

চলতি বছরের জুলাই মাসে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এক উচ্চপর্যায়ের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন যে, তার দেশের সাথে দীর্ঘ কূটনৈতিক আলোচনার পর মিয়ানমার সরকার পর্যায়ক্রমে অন্তত পাঁচ হাজার রোহিঙ্গাকে নিজেদের দেশে ফেরত নিতে সম্মত হয়েছে।

 

শতাব্দীর অন্যতম বিরল ও স্পর্শকাতর এই প্রত্যাবাসন উদ্যোগ প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই বিশ্বজুড়ে সক্রিয় বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও শরণার্থী অধিকার রক্ষাকারীরা তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন।

 

মূলতঃ রাজধানী কুয়ালালামপুরে অবস্থিত জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেওয়া শতাধিক রোহিঙ্গাকে মালয়েশিয়ার নিরাপত্তা বাহিনী হঠাৎ গ্রেপ্তার ও আটক করার পরেই এই বিশাল গোপন প্রত্যাবাসন পরিকল্পনার মূল বিষয়টি সর্বসমক্ষে উন্মোচিত হয়।

 

ওই শরণার্থীরা মালয়েশিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্য পেনাংয়ের একটি অস্থায়ী বসতি থেকে উচ্ছেদের আশঙ্কায় পড়ে মানবিক সহায়তার আকুল আবেদন নিয়ে জাতিসংঘের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন।

 

পরবর্তীতে অবশ্য গ্রেপ্তারকৃতদের কাছে জাতিসংঘের ইস্যুকৃত বৈধ শরণার্থী পরিচয়পত্র থাকার বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে পুলিশ সবাইকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়, তবে সেই ঘটনাটিই মালয়েশিয়ার চরম শরণার্থী সংকটের চিত্র ফুটিয়ে তোলে।

 

জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের ক্রমাগত সমালোচনা ও পর্যালোচনার মুখে চলতি মাসের শুরুতেই মিয়ানমারের বর্তমান ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ একটি বিবৃতি প্রদান করেছিল। সেই বার্তায় তারা আশ্বাস দেয় যে, বিদেশে বাস্তুচ্যুত বা সাময়িকভাবে আশ্রয় নেওয়া নিজেদের নাগরিকদের একটি সুনির্দিষ্ট, নিরাপদ এবং সম্মানজনক পরিবেশের মধ্য দিয়ে নিজ ভূখণ্ডে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা হবে।

 

এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও দ্রুততর ও কার্যকর করার উদ্দেশ্যে মিয়ানমারে সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার শীর্ষে আসা ও রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়া মিন অং হ্লেইংকে খুব শীঘ্রই একটি আনুষ্ঠানিক ও সরকারি সফরের আমন্ত্রণ জানাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।

 

আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একজন বিতর্কিত সামরিক জান্তা প্রধানকে আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ জানানোর এই নজির রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে বেশ অস্বাভাবিক এবং তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

 

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতি ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে মালয়েশিয়া বহু বছর ধরে ওই অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত হলেও, দেশটির আইনি কাঠামো শরণার্থীদের জন্য একেবারেই বন্ধুত্বপূর্ণ নয়।

 

মালয়েশিয়া সরকার আজ পর্যন্ত ১৯৫১ সালে গৃহীত জাতিসংঘের ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক শরণার্থী সনদে বা তার পরবর্তী কোনো সম্পূরক প্রোটোকলে স্বাক্ষর করেনি। ফলে দেশটির বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ আইনের অধীনে কোনো বিদেশিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ' শরণার্থী' হিসেবে রাষ্ট্রীয় বা আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

 

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও এদেরকে কেবল 'অবৈধ অভিবাসী' হিসেবে গণ্য করা হয় এবং তাদের সার্বিক সুরক্ষার অধিকার সীমিত থেকে যায়। এই আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে আটক কেন্দ্রগুলোতে বসবাসকারী মিয়ানমারের অধিবাসীরা প্রায়শই অনিশ্চয়তা ও কঠোর প্রশাসনিক আচরণের মুখোমুখি হন।

 

আইনি জটিলতার পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে মালয়েশিয়ার অভ্যন্তরীণ সামাজিক পরিবেশেও বিদেশিভীতি ও বর্ণবাদের এক বিষাক্ত আবহ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন তথ্য-যাচাইকারী আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ দলের দীর্ঘ অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোতে মালয়েশিয়ায় বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত পরিকল্পিত অপপ্রচার ও ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে।

 

মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এই ধরনের মিথ্যা তথ্য ও উসকানিমূলক প্রচারণার ফলে মালয়েশিয়ার স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশের মানসিকতায় রোহিঙ্গা ও মিয়ানমারের অন্যান্য শরণার্থীদের প্রতি চরম অনাস্থা, ঘৃণা ও বিরূপ মনোভাব তৈরি হচ্ছে, যা দেশটির সরকারকে দ্রুত প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করছে।

 

উল্লেখ্য, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে শতাব্দীর অন্যতম নৃশংসতম সামরিক অভিযান ও গণসংঘাতের পর ২০১৭ সালে লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিজেদের প্রাণ বাঁচাতে বাধ্য হয়ে ভিটেমাটি ছেড়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যান।

 

মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ থেকে বাঁচতে মূলত কক্সবাজারের আন্তর্জাতিক শরণার্থী শিবিরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেন এই অসহায় মানুষগুলো।

 

বিপজ্জনক সমুদ্রপথ পাড়ি দিয়ে কাঠের নৌকায় জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে অনেকেই মালয়েশিয়া পৌঁছানোর পথ বেছে নিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, অর্থনৈতিক পতন এবং সামরিক শাসনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে এই সমস্ত বাস্তুচ্যুত মানুষকে পুনরায় কোনো নিশ্চিত সুরক্ষা ছাড়া ফেরত পাঠানো কতটুকু যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে চরম বিতর্ক বজায় রয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর প্রতি দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় নিরাপত্তার বাধ্যবাধকতার মধ্যবর্তী এই দ্বন্দ্বে মিয়ানমারের এসব অভিবাসীদের ভবিষ্যৎ এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

- এএফপি