দেশটির বর্তমান নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করে তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান নেতৃত্বের অধীনে দেশটিতে কোনোভাবেই অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়।
এমনকি আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক নীতিমালার বিপরীতে গিয়ে বর্তমান নির্বাচনী কাঠামোর মধ্যে ভোটের আনুষ্ঠানিক ফল আগেই নির্ধারিত হয়ে থাকতে পারে বলেও তিনি গুরুতর আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ভারতের প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রান্তে চলমান রাজনৈতিক বাহাস ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যেই এই কড়া রাজনৈতিক বক্তব্য নতুন এক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
মহারাষ্ট্রের পুণে শহরে স্থানীয় সরকারি চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের এক দীর্ঘমেয়াদি ও জোরালো প্রতিবাদের মঞ্চে উপস্থিত হয়ে সংহতি জানানোর সময় সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে অভিজিৎ দীপকে এই বিস্ফোরক মন্তব্য করেন।
রাজ্য পর্যায়ের অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত মহারাষ্ট্র লোকসেবা কমিশনের বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় ধারাবাহিক প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নানাবিধ কাঠামোগত অনিয়মের অভিযোগে পুণের রাজপথে কয়েক দিন ধরে হাজার হাজার চাকরিপ্রার্থী অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন।
তরুণ সমাজের এই ক্ষোভ ও অসন্তোষকে সমর্থন জানাতে গিয়ে দীপকে কেবল আঞ্চলিক প্রশাসনিক দুর্নীতির মধ্যেই নিজের বক্তব্যকে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং বিষয়টিকে তিনি ভারতের সার্বিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা ও নির্বাচনী গ্রহণযোগ্যতার বৃহত্তর সংকটের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনে ভারতের সার্বিক নির্বাচনী পরিবেশের তীব্র সমালোচনা করে অভিজিৎ দীপকে বলেন, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত এবং সমগ্র রাষ্ট্রে প্রকৃতপক্ষে সর্বজনীন, অবাধ ও ভয়হীন নির্বাচনী পরিবেশ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত গণতান্ত্রিক দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নিরর্থক।
তাঁর দাবি অনুযায়ী, বর্তমান শাসনব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে ভোটগ্রহণ শুরুর পূর্বেই নির্বাচনী ফলাফলের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণের এক ধরনের অলিখিত প্রক্রিয়া গড়ে উঠেছে, যার কারণে কে বা কারা বিজয়ী হবেন, তা হয়তো আগে থেকেই স্থির হয়ে থাকে।
ভারতীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির অভাবনীয় সাফল্যের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে দেশটির এমন কয়েকটি রাজ্যেও সাম্প্রতিক সময়ে বিজেপি বিজয় ছিনিয়ে এনেছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা যখন চূড়ান্ত শীর্ষে অবস্থান করছিল, তখনও দলটি জয়লাভে ব্যর্থ হয়েছিল।
এই ধরনের অসংগতিপূর্ণ ও অপ্রত্যাশিত নির্বাচনী ফলাফল জনমনে স্বাভাবিকভাবেই নানামুখী মৌলিক প্রশ্ন ও গভীর সন্দেহের উদ্রেক করছে বলে তিনি স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেন। পুণে শহরে চলমান শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের পেছনের কারণগুলো তুলে ধরে দীপকে রাজ্য সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন।
মহারাষ্ট্র লোকসেবা কমিশনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল নিয়োগ পরীক্ষায় বারবার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটায় লাখ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নেওয়ার পর যখন পরীক্ষার চূড়ান্ত মুহূর্তে দুর্নীতির কারণে মেধার অবমূল্যায়ন ঘটে, তখন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হওয়া অনিবার্য। এই ভয়াবহ প্রশাসনিক ব্যর্থতার হাত থেকে মেধাভিত্তিক নিয়োগ ব্যবস্থা রক্ষা করার স্বার্থে আন্দোলনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে মহারাষ্ট্রের রাজ্য সরকারের সরাসরি ও কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করে আসছেন।
তরুণদের এই জীবনসংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে দীপকে জোর দিয়ে বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যুবসমাজের ন্যায়সংগত দাবির প্রতি উদাসীন থাকা চরম দায়িত্বহীনতার শামিল। শিক্ষার্থীদের এই অধিকার আদায়ের আন্দোলনে সম্মুখভাগে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস দলের প্রভাবশালী তরুণ নেতা রোহিত পাওয়ার।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এক বিশেষ বার্তায় অভিজিৎ দীপকে তরুণ রাজনীতিবিদ রোহিত পাওয়ারের এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং তাঁর পরিচালিত আন্দোলনের প্রতি নিঃশর্ত সংহতি জানান।
তিনি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, মহারাষ্ট্র লোকসেবা কমিশনের সব ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থী এবং তাঁদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যারা এই আন্দোলনের কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের প্রতিটি দাবির পাশে রয়েছেন।
তাঁর দেওয়া তথ্যমতে, ধারাবাহিক প্রশ্নপত্র ফাঁসের এই নজিরবিহীন কেলেঙ্কারির কারণে রাজ্যজুড়ে প্রায় বিশ লাখেরও বেশি তরুণ পরীক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের স্বপ্ন চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই বিশালসংখ্যক ক্ষতিগ্রস্ত তরুণের জীবনের দায়ভার রাষ্ট্রকে অবশ্যই বহন করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক ও প্রধান দাবিগুলোর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে দীপকে জানান, পুণের রাজপথে সমবেত তরুণরা অবিলম্বে মহারাষ্ট্র লোকসেবা কমিশনের বর্তমান চেয়ারম্যানের পদত্যাগ দাবি করেছেন।
একই সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের পেছনে সক্রিয় থাকা প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ চক্রকে শনাক্ত করার জন্য একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করার দাবিও তাদের আন্দোলনের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে উঠে এসেছে।
শুধু তাই নয়, যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে জড়িত রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তির আওতায় আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে পরীক্ষা ব্যবস্থার শতভাগ গোপনীয়তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নেরও দাবি জানানো হয়েছে।
চাকরিপ্রার্থীদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা না গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের অবশিষ্ট আস্থাও পুরোপুরি ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ভারতে নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক অবশ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কার্যভার গ্রহণের পর থেকেই তাঁর নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এবং বিভিন্ন নাগরিক অধিকার সংগঠনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ধারাবাহিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
বিশেষ করে জাতীয় ও আঞ্চলিক নির্বাচনের প্রাক্কালে ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও সংশোধনের স্বচ্ছতা, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের বিশ্বাসযোগ্যতা, নির্বাচনী আচরণবিধির প্রয়োগে দ্বিমুখী নীতি এবং সামগ্রিক ভোট পরিচালনার পদ্ধতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বাদানুবাদ চলছে।
বিভিন্ন বিরোধী জোট একাধিকবার কমিশনের নিরপেক্ষতা বজায় রাখার দাবি জানিয়ে এলেও কমিশনের শীর্ষ পদাধিকারীর সরাসরি পদত্যাগের এমন সুস্পষ্ট দাবি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আলোচনাকে এক নতুন ও অত্যন্ত সংবেদনশীল মাত্রায় নিয়ে গেছে।
অভিজিৎ দীপকের মতো একজন রাজনৈতিক উদ্যোক্তা পুণের যুব সমাবেশের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে জাতীয় পর্যায়ের নির্বাচন পরিচালনার মূল স্তম্ভকে এমন সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ায় দেশটির গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে এক নতুন বিতর্কের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা যখন প্রশ্নের মুখে পড়ে, তখন তা রাষ্ট্রের সামগ্রিক রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে অভিজিৎ দীপকের তোলা এই মারাত্মক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের সরাসরি দাবির বিষয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রধান দল বিজেপি কিংবা খোদ নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, আসন্ন নির্বাচনী সময়গুলোতে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার এই বিরোধ এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি দেশটির গণমাধ্যমে আরও বড় পরিসরে গুরুত্ব পেতে চলেছে।