রবিবার, অক্টোবর ৪, ২০২৬
১৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাজ্যসভার উপনির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রার্থী হলেন কোয়েল মল্লিক

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:৩৬ পিএম

রাজ্যসভার উপনির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টির প্রার্থী হলেন কোয়েল মল্লিক
ছবি : Collected

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সংসদীয় রাজনীতিতে এক নাটকীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ মোড় নিয়ে রাজ্যসভার আসন্ন উপনির্বাচনে প্রধান বিরোধী দল ভারতীয় জনতা পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয়েছে প্রখ্যাত চলচ্চিত্র অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের।

 

রাজ্য রাজনীতিতে বেশ কিছুদিন ধরে চলা নানা গুঞ্জন ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দলটির কেন্দ্রীয় ও রাজ্য নেতৃত্ব এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। রুপালি পর্দার অতি পরিচিত মুখ এবং দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে সফলতার সঙ্গে কাজ করা এই অভিনেত্রীর নতুন রাজনৈতিক পরিচিতি ঘিরে পশ্চিমবঙ্গ তথা গোটা ভারতের রাজনৈতিক মহলে গভীর আগ্রহ ও কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে।

 

মাত্র কয়েক মাস আগেই পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে উচ্চকক্ষের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ না নিয়ে পদত্যাগ করা এবং এর অল্প সময়ের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের প্রার্থী হিসেবে তাঁর পুনরায় আবির্ভূত হওয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতির অঙ্গন এখন প্রবলভাবে আলোড়িত।

 

ঘটনার ধারাবাহিকতা ও প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই তৃণমূল কংগ্রেসের মনোনয়ন পেয়ে ভারতের সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন কোয়েল মল্লিক।

 

তৎকালীন সময়ে তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিশেষ আস্থাভাজন হিসেবে তাঁকে দিল্লির আইনসভায় পাঠানো হলেও তাঁর এই সংসদীয় যাত্রাপথটি ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও অপ্রত্যাশিত ঘটনাবহুল। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করলেও তিনি সংসদের কোনো আনুষ্ঠানিক অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেননি।

 

আইনসভার কোনো কার্যদিবসে একবারের জন্যও উপস্থিত না হয়ে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে, অর্থাৎ গত জুলাই মাসে তিনি ব্যক্তিগত কারণের কথা উল্লেখ করে আকস্মিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দেন।

 

কোনো প্রকাশ্য বিরোধ বা অসন্তোষের বার্তা না দিয়ে তাঁর এভাবে হঠাৎ আইনসভা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত তখন রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতিতে তীব্র বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছিল। তাঁর পদত্যাগের ফলে উচ্চকক্ষের ওই আসনটি শূন্য হয়ে পড়ে এবং নির্বাচন কমিশন বিধি অনুযায়ী নতুন করে উপনির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।

 

ভারতের নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৬ অক্টোবর এই শূন্য আসনের জন্য উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় এই তারিখটি বাঙালিদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ওই নির্দিষ্ট দিনটিতেই সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে উদযাপিত হবে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার মহাসপ্তমী।

 

উৎসবের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে এবং সাধারণ মানুষের বিপুল আনন্দ-উচ্ছ্বাসের আমেজের মধ্যে এমন একটি সাংবিধানিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কারণে নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং এর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও নানা মহলে গভীর আলোচনা চলছে।

 

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করছেন, উৎসবমুখর পরিবেশে আইনসভার সদস্যদের ভোটদানের এই প্রক্রিয়া প্রধান দলগুলোর জন্য এক ভিন্নমাত্রার সাংগঠনিক ব্যস্ততা ও রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহ তৈরি করেছে, যা দুর্গাপূজার আবহেই রাজ্য রাজনীতির পারদকে শীর্ষে নিয়ে যাবে।

 

অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিকের পারিবারিক ও সামাজিক পরিচিতি পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অত্যন্ত সুপ্রতিষ্ঠিত ও শ্রদ্ধেয় হিসেবে বিবেচিত হয়। তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের একসময়ের খ্যাতনামা ও প্রবীণ অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিকের কন্যা।

 

শৈশব থেকেই শিল্প ও সংস্কৃতির একটি গভীর সৃজনশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠা কোয়েল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি মনস্তত্ত্ব বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে বাংলা বিনোদন জগতে আত্মপ্রকাশ করে অত্যন্ত দ্রুত দর্শকহৃদয়ে এক স্থায়ী আসন গড়ে তোলেন।

 

২০১৩ সালে চলচ্চিত্র প্রযোজক নিষপাল সিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক জীবন শুরু হয়। পারিবারিক ঐতিহ্য, বিতর্কহীন ব্যক্তিগত জীবন এবং দীর্ঘদিনের সফল অভিনয়জীবনের কারণে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে তাঁর একটি মার্জিত, রুচিশীল ও গ্রহণযোগ্য ভাবমূর্তি বিদ্যমান।

 

তাঁর এই ইতিবাচক পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়াই বিরোধী শিবিরের মূল লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী সংস্কৃতিতে রূপালি পর্দার তারকাদের সক্রিয় রাজনীতিতে নিয়ে আসার ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের।

 

বিগত কয়েক দশক ধরেই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো জনমানসে বিপুল জনপ্রিয়তা রয়েছে এমন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়শিল্পীদের প্রার্থী করে নিজেদের অনুকূলে জনসমর্থন তৈরির কৌশল নিয়মিত প্রয়োগ করে আসছে।

 

শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস যেমন একের পর এক তারকাকে লোকসভা ও রাজ্যসভায় পাঠিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছে, তেমনি ভারতীয় জনতা পার্টিও একাধিক প্রখ্যাত মুখকে দলে টেনে নিজেদের অবস্থান সংহত করার নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছে।

 

তবে একই বছরের মধ্যে একটি ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়ে কোনো দায়িত্ব পালন না করেই পদত্যাগ করা এবং সেই একই শূন্য আসনে সম্পূর্ণ বিপরীত রাজনৈতিক আদর্শের দলের প্রার্থী হয়ে ফিরে আসার এই ঘটনাটি ভারতীয় সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে একটি অত্যন্ত বিরল ও কৌতূহলোদ্দীপক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, কোয়েল মল্লিকের মতো একজন জনপ্রিয় ও সুশীল সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বকে রাজ্যসভার উপনির্বাচনে প্রার্থী করার পেছনে ভারতীয় জনতা পার্টির একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত পরিকল্পনা কাজ করছে।

 

রাজ্য বিধানসভায় বিদ্যমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাস্তবতায় আসনটি নিয়ে যে সমীকরণই থাকুক না কেন, এই মনোনয়নের মাধ্যমে দলীয় নেতৃত্ব সাধারণ ভোটার ও নাগরিক সমাজের কাছে একটি মনস্তাত্ত্বিক বার্তা পৌঁছাতে চায়।

 

বিশেষ করে এমন এক সময়ে এই ঘটনাটি ঘটল, যখন রাজ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণ অত্যন্ত তীব্র এবং উভয় দলই একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ এনে মাঠ গরম করে রেখেছে।

 

ফলে এই মনোনয়ন একদিকে যেমন তৃণমূল কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর এক ধরনের কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে বিজেপি একে তাদের রাজনৈতিক বিস্তৃতির একটি বড় সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে।

 

এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাল্টাপাল্টি মন্তব্য ও নানামুখী প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত হয়েও সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ না নেওয়া এবং পরবর্তীতে মতাদর্শগত অবস্থান পরিবর্তন করে বিরোধী শিবিরে যোগদানের এই ঘটনা জনমানসে কেমন প্রভাব ফেলে, তা দেখার জন্য রাজনৈতিক মহলকে কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।

 

দলীয় আনুগত্য এবং আইনসভার জটিল সংখ্যাতাত্ত্বিক বাস্তবতায় এই উপনির্বাচনের ফল যা-ই হোক না কেন, দুর্গাপূজার শুভলগ্নে বিনোদন জগতের একজন শীর্ষ তারকার এমন আকস্মিক দলবদল নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গের সমসাময়িক নির্বাচনী রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা ও বহুমাত্রিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

 

- হিন্দুস্তান টাইমস