সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬
২০ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় ককরোচ পার্টি, যন্তর মন্তর অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ অক্টোবর, ২০২৬, ০৬:২০ পিএম

গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় ককরোচ পার্টি, যন্তর মন্তর অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা
ছবি: সংগৃহীত

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) শীর্ষস্থানীয় নেতারা বর্তমানে চরম গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় দিন পার করছেন। আসন্ন 'যন্তর মন্তর ২.০' নামক বৃহত্তর প্রতিবাদী অভিযান শুরু হওয়ার আগেই কেন্দ্রীয় সরকার তাঁদের আটক করতে পারে বলে দলের অভ্যন্তরে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

 

তবে এই সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে দলের পক্ষ থেকে দৃঢ়তার সঙ্গে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে যে, তাঁদের পূর্বনির্ধারিত গণতান্ত্রিক আন্দোলন কোনোভাবেই স্তব্ধ হবে না। কেন্দ্রীয় ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন সরকারকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে সিজেপি নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বিরোধী কণ্ঠস্বর রোধ করতে এ ধরনের দমনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সরকার এক ঐতিহাসিক ও মারাত্মক ভুল করবে, কারণ দেশের যুবসমাজ এখন নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন ও জাগ্রত।

 

ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ এবং বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া অবিলম্বে বাতিলের দাবিতে আগামী ১০ অক্টোবর রাজধানী দিল্লির যন্তর মন্তরে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিয়েছে ককরোচ জনতা পার্টি।

 

বাণিজ্যনগরী মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কে আয়োজিত পূর্ববর্তী সমাবেশের অভূতপূর্ব সাফল্যের ঠিক পরদিনই দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এই নতুন ও বৃহত্তর কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে এই ঘোষণার পরপরই রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ বাড়তে শুরু করে।

 

গত রোববার গভীর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সিজেপির অন্যতম শীর্ষ নেতা সৌরভ দাস একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পোস্ট করেন, যেখানে তিনি এবং তাঁর সহযোদ্ধাদের সম্ভাব্য গ্রেপ্তারের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেন।

 

সৌরভ দাস তাঁর ওই বার্তায় অভিযোগ করেন যে, কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকেসহ দলের অন্যান্য প্রভাবশালী নেতা-যেমন অভিজিৎ দীপকে, আশুতোষ রাঙ্কা এবং রত্না সিংকে যেকোনো মূল্যে গ্রেপ্তার করার জন্য একটি সুপরিকল্পিত ছক কষছে।

 

সরকারের এই সম্ভাব্য পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, শাসকগোষ্ঠী যদি মনে করে থাকে যে এ ধরনের স্বৈরাচারী ও নিবর্তনমূলক আচরণ দিয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে চিরতরে দাবিয়ে রাখা সম্ভব, তবে তারা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণার মধ্যে রয়েছে।

 

তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন, দেশের তরুণ ও যুবসমাজ এখন নিজেদের অধিকারের প্রশ্নে জেগে উঠেছে এবং তারা কোনোভাবেই সরকারের এই ধরনের স্বৈরতান্ত্রিক ভুল বা অন্যায় পদক্ষেপ বরদাশত করবে না।

 

দেশবাসীর প্রতি এক আবেগঘন আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিত নিজেদের ন্যায্য অধিকার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার স্বার্থে এই লড়াই অবিরাম চালিয়ে যাওয়া। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে, এই আন্দোলন কেবল নেতাদের উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল নয়; নেতারা কারাগারে থাকলেও সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।

 

যেকোনো ধরনের দমন-পীড়ন, এমনকি দীর্ঘস্থায়ী কারাবাস বা এর চেয়েও ভয়াবহ কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ার জন্য দলের নেতারা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন বলে তিনি ঘোষণা করেন। পোস্টের উপসংহারে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানান, কোনো বাধাই এই জনরোষ ও বিক্ষোভকে থামাতে পারবে না এবং আগামী ১০ অক্টোবর দেশবাসী নিশ্চিত করবে যেন যন্তর মন্তরে এক ঐতিহাসিক ও বিপুল জনসমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

 

সৌরভ দাসের এই বার্তার রেশ কাটতে না কাটতেই সিজেপির আরেক কেন্দ্রীয় নেতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও একটি কড়া পোস্ট করেন। সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন যে, সরকার আসলে কতজনকে গ্রেপ্তার করে এই গণতান্ত্রিক আন্দোলন প্রতিহত করতে সক্ষম হবে?

 

আগামী ১০ অক্টোবর ভারতের প্রতিটি প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ে দিল্লির যন্তর মন্তরে এসে জড়ো হবেন বলে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে মহাত্মা গান্ধীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সফল গণজমায়েতের পর সিজেপি নেতারা যখন 'যন্তর মন্তর ২.০' কর্মসূচির ঘোষণা দেন, তখন তাঁরা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, পুলিশি বাধা তাঁদের সংকল্পকে টলাতে পারবে না।

 

আগামী ১০ অক্টোবর পুলিশ দেশের যেকোনো স্থানে আন্দোলনকারীদের আটকাবে, ঠিক সেই স্থানটিকেই তাঁরা দ্বিতীয় যন্তর মন্তরে পরিণত করবেন এবং সেখানেই তাঁদের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হবে।

 

এর আগে ভারতের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত 'ইন্ডিয়া' জোট গত ২ অক্টোবর থেকে লাগাতার যন্তর মন্তর অভিযানের ডাক দেয়। বিরোধীদের এই কর্মসূচির পর থেকেই দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তর ও এর আশপাশের সমগ্র এলাকা কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী বা ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে রেখেছে।

 

দেশের রাজধানীর কোনো প্রান্ত থেকেই যেন কোনো সাধারণ মানুষ বা রাজনৈতিক কর্মী যন্তর মন্তরে পৌঁছাতে না পারেন, প্রশাসন তা নিশ্চিত করতে নজিরবিহীন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তা সত্ত্বেও দিল্লিতে প্রতিদিন বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক অধিকার সংগঠন, বিশিষ্ট ব্যক্তি এবং সাধারণ নাগরিকেরা বিচ্ছিন্নভাবে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে যাচ্ছেন, যার ফলে বহু প্রতিবাদকারীকে প্রতিনিয়ত পুলিশি আটকের শিকার হতে হচ্ছে।

 

এই উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির মাঝেই ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলে পুনরায় ভোট বর্জনের ডাক দিয়েছেন সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকে। সোমবার মহারাষ্ট্রের পুনে শহরে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ভারতের বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেন।

 

তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানান, জ্ঞানেশ কুমার যতদিন পর্যন্ত ভারতের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদে বহাল থাকবেন এবং তাঁর একক কর্তৃত্বে তৈরি করা বিতর্কিত ভোটার তালিকা অনুসরণ করে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, ততদিন কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই সেই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করার কোনো যৌক্তিক অর্থ হয় না।

 

তাঁর মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় কারা জয়লাভ করবে, তা ভোটের আগেই সুনির্ধারিত হয়ে থাকে, যা গণতন্ত্রের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ। তিনি তাঁর দাবির সপক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা যখন দেশজুড়ে চূড়ান্ত শিখরে অবস্থান করছিল, সেই সময়েও যেসব রাজ্যে বিজেপি জয়লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছিল, বর্তমানে সেসব রাজ্যে দলটি অত্যন্ত সহজেই জয় ছিনিয়ে আনছে।

 

অভিজিৎ দীপকের দাবি, এই ধরনের অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন কেবল জ্ঞানেশ কুমারের পক্ষপাতমূলক প্রশাসনিক ভূমিকার কারণেই সম্ভব হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে এবং বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত করা হলেই কেবল দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার আসল ও স্বচ্ছ চিত্রটি জনগণের সামনে উন্মোচিত হবে।

 

এদিকে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের আইনি সুরাহা খুঁজতে সোমবার সুপ্রিম কোর্টে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানির দিন ধার্য রয়েছে। এই মামলার মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই কমিশনারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে জ্ঞানেশ কুমার তাঁর পদের অপব্যবহার করে এককভাবে কোনো প্রশাসনিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন কি না।

 

ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার সমন্বয়ে গঠিত এক বৃহত্তর বেঞ্চে এই স্পর্শকাতর মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। জানা গেছে, গত ২৯ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের প্রবীণ আইনজীবী বিকাশ সিং এই জনস্বার্থমূলক মামলাটি দায়ের করেন।

 

আবেদনকারীর আইনি যুক্তিতে বলা হয়েছে, ভারতীয় সংবিধানে নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যবিশিষ্ট একটি সাংবিধানিক পর্ষদ। সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, নির্বাচন পরিচালনার সার্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সমগ্র কমিশনের ওপর বর্তায় এবং যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে অন্তত সংখ্যাগরিষ্ঠের অথবা তিনজনের সহমতের প্রয়োজন হয়।

 

কিন্তু আবেদনকারীর অভিযোগ, গত দশ মাসের কার্যকালে অন্তত চৌদ্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের বাকি দুই সদস্যের লিখিত বা মৌখিক আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মুখ্য নির্বাচন কমিশনার একতরফাভাবে নিজের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিয়েছেন।

 

শুধু তাই নয়, এভাবে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে সমগ্র দেশের ভোটার তালিকার ডেটাবেজ অত্যন্ত সুকৌশলে কেন্দ্রীভূত করেছেন এবং নির্বাচন কমিশনের ফর্ম-৬ ব্যবহার করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে ভোটার তালিকায় নতুন ও যাচাই না করা তথ্য সংযোজন করেছেন বলেও গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়েছে।

 

এর পাশাপাশি, দিল্লির অপর এক বিশিষ্ট আইনজীবী শৈলেন্দ্র মণি ত্রিপাঠী সুপ্রিম কোর্টে আরও একটি পৃথক মামলা দায়ের করেছেন। তাঁর আবেদনে স্পষ্টভাবে দাবি করা হয়েছে যে, জ্ঞানেশ কুমার নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে যেসব ব্যাপক অনিয়ম করেছেন, তা সরাসরি সংবিধানবিরোধী এবং এর ফলে তিনি একজন সাংবিধানিক পদাধিকারী হিসেবে প্রাপ্ত আইনি রক্ষাকবচের অধিকার সম্পূর্ণভাবে হারিয়েছেন।

 

তাই তাঁর বিরুদ্ধে অবিলম্বে ফৌজদারি মামলা দায়ের করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে, নির্বাচন কমিশনে সংঘটিত এই কাঠামোগত অনিয়মের মূল হোতাদের খুঁজে বের করতে এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে সুপ্রিম কোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিশেষ তদন্তকারী দল গঠনেরও জোরালো অনুরোধ জানানো হয়েছে।

 

সুপ্রিম কোর্টে এই মামলাগুলোর আনুষ্ঠানিক শুনানির আগেই নির্বাচন কমিশনের সার্বিক কাজকর্ম এবং বিশেষ করে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের রহস্যজনক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেছেন ভারতের বিচার ব্যবস্থার দুই দিকপাল-সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া এবং সাবেক বিচারপতি রোহিনটন ফলি নরিম্যান।

 

গতকাল আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেকোনো নাগরিককে তাঁর সাংবিধানিক অধিকার তথা ভোটদানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা মূলত একটি মানুষের শরীর থেকে তাঁর প্রাণ কেড়ে নেওয়ারই সমতুল্য অপরাধ।

 

তিনি আরও বলেন, কোনো বৈধ কারণ ছাড়া লাখ লাখ মানুষকে এভাবে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত করার অপচেষ্টা সরাসরি সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী।

 

বিচারপতির মতে, কোনো নাগরিক যদি মৃত্যুবরণ না করেন, তবে তাঁকে কোনো প্রকার আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে বা পূর্ব নোটিশ প্রদান ছাড়া খেয়ালখুশিমতো ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া সম্পূর্ণ বেআইনি এবং অসাংবিধানিক।

 

অন্যদিকে, সাবেক বিচারপতি রোহিনটন ফলি নরিম্যান এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে মন্তব্য করেছেন যে, সম্পূর্ণ অবৈধ প্রক্রিয়ায় কোটি কোটি বৈধ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেশের সমগ্র গণতান্ত্রিক কাঠামোকে আজ চরম বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

 

তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তিই হলো প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের অবাধে ভোটদানের অধিকার নিশ্চিত করা। এই মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হলে গণতন্ত্র তার অস্তিত্ব হারায়। তিনি নির্বাচন কমিশনারদের বর্তমান নিয়োগপদ্ধতিরও তীব্র সমালোচনা করেন এবং গভীর আশা প্রকাশ করেন যে, ভারতের সর্বোচ্চ আদালত এই কাঠামোগত ভুল অতিসত্বর শুধরে নেবে।

 

তাঁর সুচিন্তিত মতে, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নিরপেক্ষ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্তাদের নিয়োগপদ্ধতি আরও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি বা তাঁর মনোনীত কোনো প্রতিনিধির সমন্বয়ে গঠিত একটি স্বাধীন প্যানেলের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ চূড়ান্ত করা অত্যন্ত জরুরি।

 

এই আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্কের মাঝেই সিজেপি নেতা সৌরভ দাস দেশের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক ভূমিকা নিয়েও গভীর সন্দেহ ও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন যে, পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়া অবাধে চলতে দেওয়ার ক্ষেত্রে আদালতের নীরব ভূমিকা জনমনে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

 

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর নাম সরাসরি উল্লেখ করে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁদের বেঞ্চ বাংলা ও বিহারে এই প্রক্রিয়াকে কোনো ধরনের আইনি বাধা ছাড়াই চলতে দিয়েছে, যা সাধারণ ভোটারদের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করছে।

 

তাঁর মতে, উপযুক্ত সময়ে ভোটাধিকার সংক্রান্ত এই অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর শুনানি না হওয়ার ফলে দেশের কোটি কোটি মানুষের সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোর কোনো সুষ্ঠু মীমাংসা হয়নি।

 

এর ফলশ্রুতিতে, সাধারণ মানুষের চোখে বিচারের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত সুপ্রিম কোর্টের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। পরিশেষে তিনি আরও অভিযোগ করেন, কেবল এসআইআর প্রক্রিয়াই নয়, অতীতে মহারাষ্ট্রের নির্বাচিত রাজ্য সরকারের পতন, দিল্লির প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক সংকট এবং বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ ভাঙন নিয়ে দায়ের করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলোর শুনানিও সুপ্রিম কোর্টে যথাসময়ে শুরু হয়নি।

 

এই দীর্ঘমেয়াদি আইনি বিলম্বের কারণে পরোক্ষভাবে কেবল শাসকদল বিজেপিই রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে এক অশনিসংকেত বলে তিনি সতর্ক করেন।