মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০২৬
২১ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইমরান খানের প্রতি পাকিস্তান সরকারের অমানবিক আচরণ কাম্য নয়: রবি শাস্ত্রী

আর এন এস আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৬ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:০৪ পিএম

ইমরান খানের প্রতি পাকিস্তান সরকারের অমানবিক আচরণ কাম্য নয়: রবি শাস্ত্রী
ছবি : Collected

রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা রাষ্ট্রীয় সীমানার অদৃশ্য প্রাচীর পেরিয়ে মানবিকতার এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন ভারতের সাবেক তারকা ক্রিকেটার ও জাতীয় দলের সফল কোচ রবি শাস্ত্রী।

 

পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিংবদন্তি ইমরান খানের বর্তমান কারাজীবন ও তার প্রতি দেশটির সরকারের রূঢ় আচরণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ, ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তিনি।

 

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক বিশেষ ও বিস্তৃত সাক্ষাৎকারে রবি শাস্ত্রী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, রাজনৈতিক বিরোধিতার বিষয়টি সম্পূর্ণ দূরে সরিয়ে রাখলেও, নিছক মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে একজন প্রবীণ ও আন্তর্জাতিকভাবে সম্মানিত মানুষের সঙ্গে এমন নির্মম আচরণ মোটেও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

 

তার এই সুচিন্তিত মন্তব্য আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গন এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা একাধারে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য বহন করে। ইমরান খান কেবল পাকিস্তানের একজন সাবেক সরকারপ্রধান কিংবা সাধারণ কোনো গতানুগতিক রাজনৈতিক নেতা নন, তিনি বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনের এক অবিসংবাদিত মহাতারকা এবং কোটি তরুণের অনুপ্রেরণার প্রধান উৎস।

 

এই অসামান্য প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ তার দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য খেলোয়াড়ি জীবনে যে অসামান্য অবদান রেখেছেন, তা তাকে সারা বিশ্বের অগণিত মানুষের কাছে এক অনন্য আদর্শে পরিণত করেছে।

 

রবি শাস্ত্রীর মতে, ইমরান খান তার নিজের দেশের জন্য এবং বিশ্ব ক্রিকেটের সার্বিক উন্নয়নের জন্য যা করেছেন, সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তার সঙ্গে বর্তমান পাকিস্তান সরকারের এই বৈরী আচরণ কোনোভাবেই তার প্রাপ্য নয়।

 

শাস্ত্রী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, একজন সত্যিকারের জাতীয় বীর, যিনি তার জন্মভূমিকে বিশ্বমঞ্চে সর্বোচ্চ সম্মান এনে দিয়েছেন এবং যিনি তার সমগ্র জীবন দেশের কল্যাণে উৎসর্গ করেছেন, তার শেষ জীবনটা এমন অন্ধকার ও নিঃসঙ্গ কারাগারে কাটতে পারে না।

 

এটি কেবল সেই ব্যক্তির জন্যই অবমাননাকর নয়, বরং সমগ্র জাতির জন্য এক বড় ধরনের কলঙ্ক। খেলাধুলার ইতিহাসে ইমরান খানের নাম অনন্তকাল ধরে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। বিশেষ করে ১৯৯২ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপে তার জাদুকরী ও সম্মোহনী নেতৃত্বের কথা আজও সারা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমীদের হৃদয়ে অমলীন হয়ে আছে।

 

রবি শাস্ত্রী সেই গৌরবময় ইতিহাসের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, ইমরান খান তার দেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ, সাহসী এবং অনুপ্রেরণাদায়ী একজন নেতা। তৎকালীন পাকিস্তান দলে তরুণ এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ব্যাপক আধিক্য থাকা সত্ত্বেও, ইমরান খানের অসামান্য দূরদর্শিতা, অদম্য লড়াকু মানসিকতা এবং সবাইকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ঐক্যবদ্ধ করার অসাধারণ ক্ষমতার কারণেই পাকিস্তান সেই বছর বিশ্বকাপের অধরা শিরোপা নিজেদের ঘরে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।

 

তরুণদের মানসিকভাবে উজ্জীবিত করা এবং চরম সংকটের মুহূর্তে খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তুলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা ছিল সত্যিই অভাবনীয় ও অনুকরণীয়। বিশ্ব ক্রিকেটে তার এই অনবদ্য অবদানের কথা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে শাস্ত্রী তার সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু এবং সম্মানজনক জীবনের একান্ত কামনা করেছেন।

 

ক্রিকেট মাঠের এই অপ্রতিদ্বন্দ্বী নায়ক খেলোয়াড়ি জীবনের বর্ণিল অধ্যায়ের ইতি টানার পর সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আদর্শ নিয়ে তার দেশের সাধারণ মানুষের আর্থসামাজিক কল্যাণে রাজনীতিতে পদার্পণ করেন।

 

দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, অবিচল আত্মবিশ্বাস এবং ব্যাপক জনসমর্থনের ওপর ভর করে ২০১৮ সালে তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনার মহান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কিন্তু পাকিস্তানের চিরচেনা রাজনৈতিক পালাবদল, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং নানামুখী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জেরে ২০২২ সালে তাকে অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়।

 

পরবর্তীতে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে দুর্নীতির বিভিন্ন বিতর্কিত অভিযোগে তাকে আকস্মিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তখন থেকেই তিনি রাওয়ালপিন্ডির অত্যন্ত কড়া নিরাপত্তাবেষ্টিত ও ঐতিহাসিক আদিয়ালা কারাগারে একাকী বন্দিজীবন যাপন করছেন।

 

তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎসহ একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং বিচারিক আদালতে কয়েকটিতে তাকে দীর্ঘ মেয়াদে কারাদণ্ডও প্রদান করা হয়েছে। তবে ইমরান খান এবং তার প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল শুরু থেকেই এই সকল অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে।

 

তাদের দাবি, রাজনৈতিক ময়দান থেকে তাকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই এই পরিকল্পিত নীলকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কারাবন্দি থাকার কারণে চুয়াত্তর বছর বয়সী এই বর্ষীয়ান ও প্রবীণ নেতার বর্তমান শারীরিক ও মানসিক অবস্থা নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

 

বিশেষ করে আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের তারকারা তাদের একসময়ের প্রবল প্রতিপক্ষ এবং সাবেক সহকর্মীর এই করুণ ও মর্মান্তিক পরিণতিতে মোটেও নিশ্চুপ বসে নেই। কারাগারে ইমরান খানের উপযুক্ত চিকিৎসা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও ন্যূনতম মানবিক অধিকার নিশ্চিত করার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে গত আগস্ট মাসে পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের কাছে একটি বিশেষ চিঠি প্রেরণ করেন বিশ্বের ২১ জন খ্যাতিমান সাবেক অধিনায়ক।

 

এর আগে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসেও ১৪ জন সাবেক অধিনায়ক একই ধরনের মানবিক আবেদন জানিয়ে পাকিস্তান সরকারের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়েছিলেন। এই নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলো অত্যন্ত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরেও ইমরান খানের একটি বিশাল আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ও সর্বজনীন সম্মান রয়েছে, যা তাকে বিশ্বের অন্যতম শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। ক্রীড়াবিশ্ব তাকে কখনোই একজন অপরাধী হিসেবে দেখতে প্রস্তুত নয়।

 

রবি শাস্ত্রী তার সুচিন্তিত বক্তব্যে এই বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন যে, একজন মানুষের সারা জীবনের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত সম্মান ও আন্তর্জাতিক মর্যাদাকে এভাবে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কালিমালিপ্ত করা কোনোভাবেই সমীচীন নয়।

 

তিনি অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে এই আশা প্রকাশ করেছেন যে, সমস্ত আইনি জটিলতা ও বাধা পেরিয়ে ইমরান খান খুব দ্রুতই কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে আইনিভাবে মুক্তি পেয়ে পুনরায় মুক্ত বাতাসে ফিরে আসবেন।

 

একইসঙ্গে মুক্তির পর কিংবা কারাবন্দি থাকা অবস্থাতেও তার সঙ্গে যেন রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও অনেক বেশি সম্মানজনক এবং মানবিক আচরণ করা হয়, সেই ঐকান্তিক প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেছেন ভারতের এই সাবেক তারকা ক্রিকেটার।

 

শাস্ত্রী মনে করেন, মতাদর্শগত পার্থক্য বা চরম রাজনৈতিক বৈরিতা যতই থাকুক না কেন, পাকিস্তানের মতো একটি দেশে ইমরান খানের মতো বিশ্বপরিচিত ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত একজন ব্যক্তির প্রতি রাষ্ট্রের আরও বেশি দায়িত্বশীল, পরিপক্ব ও সংবেদনশীল হওয়া একান্ত উচিত। প্রতিহিংসার রাজনীতি কখনোই একটি রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।

 

অন্যদিকে, পাকিস্তান সরকার ইমরান খানের প্রতি কোনো ধরনের অমানবিক আচরণ, দুর্ব্যবহার বা কারাবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ধারাবাহিকভাবে ও অত্যন্ত কঠোর ভাষায় অস্বীকার করে আসছে।

 

সরকারি কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক দাবি, আদিয়ালা কারাগারে ইমরান খানকে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিশেষ বন্দি হিসেবে তার প্রাপ্য সকল সুযোগ-সুবিধা, উন্নত খাবার এবং নিয়মিত চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে।

 

পাশাপাশি তাকে তার পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীদের সঙ্গে কারাবিধি অনুযায়ী নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার যে গুরুতর অভিযোগ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠেছে, পাকিস্তান সরকার সেটিও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সরাসরি উড়িয়ে দিয়েছে।

 

তবে সরকারের এই আনুষ্ঠানিক আশ্বাসের পরও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রীড়াপ্রেমী এবং মানবাধিকার কর্মীদের উদ্বেগ কোনোভাবেই প্রশমিত হচ্ছে না। তারা মনে করেন, একজন সাবেক রাষ্ট্রনেতাকে যেভাবে জনবিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে, তা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

 

পরিশেষে বলা যায়, পাকিস্তানের দীর্ঘ ক্রিকেট ইতিহাসে ইমরান খানের অসামান্য অবদান কোনো একক মাপকাঠিতে পরিমাপ করা একেবারেই অসম্ভব। তিনি তার প্রিয় মাতৃভূমির হয়ে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে মোট ৮৮টি টেস্ট ম্যাচ এবং ১৭৫টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন, যেখানে তার ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান আজও ঈর্ষণীয়।

 

দীর্ঘ খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি কেবল একজন দুর্দান্ত ও ভয়ংকর ফাস্ট বোলারই ছিলেন না, বরং চরম বিপদের মুহূর্তে একজন দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য ব্যাটসম্যান হিসেবেও নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছিলেন।

 

ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অলরাউন্ডার এবং সবচেয়ে সফল ও দূরদর্শী অধিনায়ক হিসেবে তার নাম আজও ক্রিকেট বিশ্বে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। খেলার মাঠের এই অকুতোভয় যোদ্ধা আজ জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে রাজনীতির অত্যন্ত জটিল, কণ্টকাকীর্ণ এবং নির্মম পিচে এক সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ও অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

 

সারা বিশ্বের অগণিত ভক্ত, অনুরাগী এবং রবি শাস্ত্রীর মতো সাবেক সতীর্থরা এখন কেবল এই কিংবদন্তি মহাতারকার দ্রুত কারামুক্তি এবং একটি বাধাহীন, সম্মানজনক জীবনের প্রত্যাশায় গভীর উৎকণ্ঠার সঙ্গে প্রহর গুনছেন। রাজনীতি এবং ক্রীড়াঙ্গনের এই যুগপৎ ইতিহাসের শেষ পরিণতি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, তা দেখার জন্য এখন সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।