বৃহস্পতিবার, পঁচিশে জুন চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ এক জাঁকজমকপূর্ণ ও রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো সম্পাদিত হয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, এশিয়ার এই দুই গুরুত্বপূর্ণ ও বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি ও গণমাধ্যমকেন্দ্রিক এই নবতর অংশীদারিত্ব ভবিষ্যৎ ডিজিটাল কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক, তাৎপর্যপূর্ণ এবং সময়োপযোগী পদক্ষেপ।
উচ্চপর্যায়ের এই রাষ্ট্রীয় চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সরকারপ্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং সশরীরে উপস্থিত থেকে দুই দেশের মধ্যকার এই ঐতিহাসিক ও আনন্দঘন মুহূর্তের সাক্ষী হন।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে এই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও কৌশলগত সমঝোতা স্মারকগুলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর করেন বর্তমান তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। অন্যদিকে, গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত চীনের প্রধান রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া নিউজ এজেন্সি এবং বহুল প্রচারিত ও প্রভাবশালী সম্প্রচার মাধ্যম চায়না মিডিয়া গ্রুপের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এই যুগান্তকারী উদ্যোগ দুই দেশের মিডিয়া কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর পেশাদার ও কূটনৈতিক মানদণ্ড অনুযায়ী গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সদ্য স্বাক্ষরিত এই চারটি সমঝোতা স্মারকের মূল লক্ষ্য, পরিধি এবং উদ্দেশ্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী ও ব্যাপক।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক ও সরকারি উচ্চপদস্থ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, এই যুগান্তকারী চুক্তিগুলোর আওতায় এখন থেকে বাংলাদেশ এবং চীনের মধ্যে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের বাধাহীন, স্বচ্ছ এবং দ্রুত বিনিময় অত্যন্ত সুনিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
এর পাশাপাশি, দুই দেশের রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি গণমাধ্যম খাতগুলোর মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই এবং অত্যন্ত কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারিত্ব গড়ে উঠবে বলে গভীরভাবে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
শুধু গতানুগতিক সংবাদ আদান-প্রদানই নয়, বরং এই চুক্তির ফলে গ্লোবাল সাউথ বা বৈশ্বিক দক্ষিণের উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর গণমাধ্যমের বর্তমান অবস্থা, নানাবিধ চ্যালেঞ্জ, উত্তরণের উপায় এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা বিষয়ে উভয় দেশ যৌথভাবে ব্যাপকভিত্তিক, উচ্চতর ও যুগান্তকারী গবেষণামূলক কার্যক্রম পরিচালনার অবারিত সুযোগ পাবে।
এছাড়া, আধুনিক ডিজিটাল সম্প্রচার ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনায় তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোত্তম ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও এই চুক্তিগুলো একটি শক্তিশালী ও কার্যকর নিয়ামক হিসেবে সরাসরি কাজ করবে।
সম্প্রচার খাতে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োগ, স্যাটেলাইট প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নির্ভুল সংবাদ পরিবেশন এবং দুই দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে পেশাগত প্রশিক্ষণ ও বাস্তব অভিজ্ঞতা বিনিময়ের যে বিশাল সুযোগ এই চুক্তির মাধ্যমে সম্প্রসারিত হলো, তা বাংলাদেশের গণমাধ্যম শিল্পকে আন্তর্জাতিক ও বিশ্বমানে উন্নীত করতে একটি ঐতিহাসিক ও অভাবনীয় ভূমিকা পালন করবে।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে উভয় দেশের সাংবাদিক ও মিডিয়া পেশাজীবীরা একে অপরের সংস্কৃতির সাথে আরও নিবিড়ভাবে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাবেন। দুই দেশের সরকারের শীর্ষ নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে এই মর্মে বিশ্বাস করেন যে, এই যুগান্তকারী সমঝোতা স্মারকগুলো বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত, ঐতিহাসিক এবং অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আগামী দিনে আরও সুদৃঢ় ও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে।
একই সঙ্গে এটি তথ্যপ্রযুক্তি, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও গণমাধ্যম খাতে পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতা ও নিবিড় সহযোগিতার এক সম্পূর্ণ নতুন, সম্ভাবনাময় ও সমৃদ্ধশালী দিগন্ত উন্মোচন করবে। একটি বিশ্বায়নের যুগে অবাধ তথ্য প্রবাহের এই সহজলভ্যতা দুই দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেও একটি সুদৃঢ় মনস্তাত্ত্বিক সেতুবন্ধন রচনা করতে সক্ষম হবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কৌশলগত এবং বহুল আলোচিত রাষ্ট্রীয় চীন সফরে সরাসরি যুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে এবং এই চুক্তি স্বাক্ষরের প্রাসঙ্গিক কূটনৈতিক প্রস্তুতি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন গত মঙ্গলবার, তেইশে জুন একটি বিশেষ ফ্লাইটে ঢাকা থেকে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করেন।
বেইজিংয়ে দুই দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় নেতাদের মধ্যে অত্যন্ত ফলপ্রসূ, সৌহার্দ্যপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা এবং একাধিক উন্নয়নমূলক ও কৌশলগত চুক্তি স্বাক্ষরের অত্যন্ত সফল সমাপ্তির পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার উচ্চপর্যায়ের সরকারি প্রতিনিধিদলসহ আগামী শুক্রবার, ছাব্বিশে জুন রাতে একটি বিশেষ ফ্লাইটে করে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রাষ্ট্রীয় ও সরকারি বিশ্বস্ত সূত্রগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছে। এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এক নতুন যুগে প্রবেশ করল বলে আন্তর্জাতিক মহল মনে করছে।