এই অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনে নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে দায়ের করা অভিযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে আটক হওয়া আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ নামের এক যুবকের চাঞ্চল্যকর জবানবন্দি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে বলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই।
নিজেকে নিহতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং ছোট ভাই হিসেবে পরিচয় দেওয়া এই দীপের ডাকে সাড়া দিয়েই নিখোঁজ হওয়ার ঠিক আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজের নিরাপদ আবাসস্থল থেকে বের হয়েছিলেন তাহসিফ।
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সন্দেহভাজন দীপকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নেওয়ার পর থেকে রাতভর রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এবং অপরাধ সংঘটনের সম্ভাব্য এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে পিবিআইয়ের ঢাকা মেট্রো উত্তর বিভাগের একটি চৌকস দল।
তদন্ত প্রক্রিয়ার সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত থাকা পিবিআইয়ের একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ সুপার গণমাধ্যমের কাছে জানিয়েছেন যে, ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে আটককৃত দীপ ঘটনার রাতের এক রোমহর্ষক বর্ণনা তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরেছেন।
পুলিশের কাছে দেওয়া দীপের দাবি অনুযায়ী, ঘটনার দিন গভীর রাতে তারা দুজন তুরাগ নদের তীরের ওই নির্দিষ্ট ও নির্জন স্থানে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিগত কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবে চারপাশের অন্ধকার ভেদ করে অজ্ঞাতপরিচয় কিছু লোক আকস্মিকভাবে তাদের দিকে মারমুখী ভঙ্গিতে তেড়ে আসে এবং ধাওয়া করে।
দীপের ভাষ্যমতে, আত্মরক্ষার্থে এবং ধাওয়াকারীদের নির্মম আক্রমণ থেকে নিজেকে বাঁচাতে দিশেহারা হয়ে তাহসিফ সরাসরি তুরাগ নদের অন্ধকার ও শীতল পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অন্যদিকে, পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও বেগতিক দেখে দীপ সেখান থেকে কোনোক্রমে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন বলে তদন্তকারীদের কাছে দাবি করেছেন।
তবে তার এই চাঞ্চল্যকর দাবির সত্যতা আদতে কতটুকু, তা এখন পুলিশের কঠোর নজরদারি, প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল। এই দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী চাঞ্চল্যকর ঘটনা প্রসঙ্গে পিবিআই মেট্রো উত্তরের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ এনায়েত হোসেন মান্নান অত্যন্ত সতর্কতার সাথে জানান যে, তারা আটককৃত প্রধান সন্দেহভাজন দীপকে সাথে নিয়ে ইতোমধ্যে ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
সেখানে দীপের দেওয়া প্রতিটি তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ এবং সংগৃহীত অন্যান্য বস্তুগত প্রমাণের সাথে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ অত্যন্ত গুরুত্ব ও গোপনীয়তার সাথে চলমান রয়েছে। তিনি আরও জোরালোভাবে উল্লেখ করেন যে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বর্তমান ও প্রধান লক্ষ্য হলো এই মর্মান্তিক ঘটনার পেছনের প্রকৃত সত্য যেকোনো মূল্যে উদ্ঘাটন করা।
এত গভীর রাতে তারা ঠিক কী কারণে ওই নির্জন ও অন্ধকার স্থানে গিয়েছিলেন, তাহসিফকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে কেউ হত্যা করে নদীতে ফেলে দিয়েছে কি না, নাকি এটি নিছকই একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা, অথবা এর পেছনে আত্মহত্যার মতো কোনো গভীর মানসিক প্ররোচনা লুকিয়ে আছে কি না-তদন্তকারী কর্মকর্তারা এখন এই সমস্ত অত্যন্ত জটিল ও অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর অত্যন্ত নিবিড়ভাবে খুঁজছেন।
তিনি জানান, এখন পর্যন্ত তদন্তের যে প্রাথমিক ফলাফল ও তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, তা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আরও গভীরভাবে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে যাচাই করা একান্ত প্রয়োজন।
তদন্তের বর্তমান ও স্পর্শকাতর পর্যায়ে কোনো ধরনের চূড়ান্ত মন্তব্য না করে এই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আশ্বস্ত করেন যে, সম্পূর্ণ রহস্য নির্ভুলভাবে উদ্ঘাটিত হওয়ার পরই আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে সব তথ্য বিস্তারিতভাবে অবহিত করা হবে।
এই অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মামলাটির সামগ্রিক অগ্রগতি নিয়ে বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান যে, প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে দীপকে হেফাজতে নেওয়ার পর থেকে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তে বেশ কিছু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল তথ্য বেরিয়ে এসেছে যা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
তবে একটি চলমান আইনি তদন্তের বৃহত্তর স্বার্থে এবং অপরাধের সাথে জড়িত প্রকৃত দোষীদের সতর্ক হওয়ার সুযোগ না দেওয়ার লক্ষ্যে এখনই সেই সমস্ত গোপনীয় তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা থেকে সম্পূর্ণভাবে বিরত থাকছে তদন্তকারী সংস্থা।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এই ধরনের সতর্কতামূলক অবস্থান থেকে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ঘটনাটি অত্যন্ত জটিল এবং এর পেছনের কারণগুলো অনেক গভীরে প্রোথিত থাকতে পারে। এদিকে, তাহসিফের মৃত্যুর তদন্তে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও দৃশ্যমান আলামত হিসেবে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, তুরাগ নদের যে নির্দিষ্ট স্থান থেকে তাহসিফের নিথর এবং ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, ঠিক সেখান থেকে আনুমানিক সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে টঙ্গী পশ্চিম থানার অন্তর্গত মাজার বস্তি এলাকা থেকে সম্পূর্ণ নিবন্ধনবিহীন একটি রহস্যজনক মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে।
পিবিআই সদর দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত জ্যেষ্ঠ পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ একটি আনুষ্ঠানিক বার্তার মাধ্যমে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করে জানিয়েছেন যে, তুরাগ নদের পাড় থেকে আনুমানিক মাত্র পঞ্চাশ গজ দূরত্বের মধ্যে সম্পূর্ণ পরিত্যক্ত অবস্থায় এই দুই চাকার যানটির সন্ধান পাওয়া যায়।
বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যাচাই করে দেখছে যে উদ্ধারকৃত এই নিবন্ধনবিহীন মোটরসাইকেলটি আসলেই নিহত সাবেক সামরিক কর্মকর্তা তাহসিফের ব্যবহৃত যান কি না।
পিবিআইয়ের চৌকস তদন্ত দলের সাথে যুক্ত অন্য একজন দায়িত্বশীল পুলিশ সুপার জানিয়েছেন যে, হেফাজতে থাকা দীপের দেওয়া সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ ওই পরিত্যক্ত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
যেহেতু যানটিতে কোনো নিবন্ধিত পরিচিতি ফলক সংযুক্ত নেই, তাই এর প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের সংরক্ষিত ইঞ্জিন ও কাঠামো নম্বর সংক্রান্ত তথ্যাদির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।
তবে এই তদন্ত প্রক্রিয়ার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, নিহতের বাসভবন এবং আশপাশের এলাকার নিরাপত্তা ক্যামেরার দৃশ্য অত্যন্ত গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা দেখতে পেয়েছেন যে, নিখোঁজ হওয়ার রাতে তাহসিফ ঠিক এমনই একটি নিবন্ধনবিহীন মোটরসাইকেল চালিয়ে নিজের ঘর থেকে বের হয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।
এই ভিডিও দৃশ্য এবং দীপের দেখানো স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেলের মধ্যে একটি সুস্পষ্ট ও অভ্রান্ত যোগসূত্র থাকতে পারে বলে প্রবলভাবে ধারণা করা হচ্ছে, যা তদন্তের জট খুলতে সাহায্য করবে।
সন্তান হারানো এক হতভাগ্য পিতা হিসেবে তাহসিফের বাবা এনায়েতুল করিম চরম শোক, হতাশা ও বিষাদের মাঝেও ঘটনার রাতের একটি সুস্পষ্ট কালানুক্রমিক বিবরণ তদন্তকারীদের কাছে তুলে ধরেছেন।
তার হৃদয়বিদারক বর্ণনা মতে, গত মঙ্গলবার, অর্থাৎ সাতাশে অক্টোবর সন্ধ্যার দিকে অভিযুক্ত দীপের কাছ থেকে একটি জরুরি কল পাওয়ার পরপরই তাহসিফ তড়িঘড়ি করে বাসা থেকে বের হয়ে যান। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি আর নিজের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসেননি।
পরিবারের সদস্যদের চরম উৎকণ্ঠার মধ্যেই রাত এক বেজে পঁয়ত্রিশ মিনিটের দিকে তাহসিফ তার মায়ের মুঠোফোনে একটি লিখিত বার্তা পাঠিয়ে নিশ্চিত করেন যে তিনি খুব শিগগিরই বাড়ির দিকে রওনা হচ্ছেন এবং ফিরে আসছেন।
মায়ের কাছে পাঠানো সন্তানের সেই শেষ সান্ত্বনার বার্তার পর থেকেই তার সাথে পরিবারের আর কোনো ধরনের যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তার মুঠোফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যায় এবং সম্ভাব্য সব জায়গায় হন্যে হয়ে খোঁজ করেও তার কোনো সন্ধান মেলাতে পারেনি পরিবার।
পরিবারের সদস্যদের এই অন্তহীন ও যন্ত্রণাদায়ক অপেক্ষার এক চরম মর্মান্তিক সমাপ্তি ঘটে ঠিক তার পরদিন, অর্থাৎ বুধবার বিকেলে। স্থানীয় অধিবাসীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ তুরাগ নদের বুক থেকে ভাসমান অবস্থায় তাহসিফের নিথর দেহ উদ্ধার করে।
এক সময়ের অত্যন্ত চৌকস একজন সামরিক কর্মকর্তার এমন রহস্যজনক এবং করুণ মৃত্যুতে তার পরিবার, পরিচিতজন এবং সাধারণ মানুষের মাঝে চরম শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সাথে এই মৃত্যুকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে এক বিশাল প্রশ্নবোধক চিহ্নের, যার উত্তর খোঁজা এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মানদণ্ড অনুযায়ী, যেকোনো অস্বাভাবিক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
তাহসিফের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ-তা ধাওয়া খেয়ে নদীতে ডুবে শ্বাসরোধ হয়ে মৃত্যু, নাকি পানিতে পড়ার আগেই তার ওপর কোনো ধরনের পাশবিক শারীরিক আঘাত বা নির্যাতন করা হয়েছিল-তা কেবল ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকে ময়নাতদন্তের পর নিশ্চিত করে বলতে পারবেন।
পিবিআইয়ের সুদক্ষ তদন্তকারী দল এখন মূলত দুটি প্রধান বিষয়কে সামনে রেখে নিজেদের কার্যক্রম অগ্রসর করছে। প্রথমত, দীপের দাবি অনুযায়ী রাতের অন্ধকারে ধাওয়া করা সেই অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা কারা ছিল এবং তাদের মূল উদ্দেশ্যই বা কী ছিল তা প্রযুক্তিগত প্রমাণের মাধ্যমে শনাক্ত করা।
দ্বিতীয়ত, নিহতের মুঠোফোনের কললিস্ট, আদান-প্রদান করা বার্তা এবং প্রযুক্তিগত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঘটনার পেছনের সম্ভাব্য কোনো আর্থিক, ব্যক্তিগত বা পেশাগত শত্রুতার দিকটি নিখুঁতভাবে উন্মোচন করা।
সমগ্র দেশবাসীর নজর এখন পিবিআইয়ের এই চলমান তদন্তের দিকে নিবদ্ধ রয়েছে, যাতে এই সাবেক সামরিক কর্মকর্তার মৃত্যুর প্রকৃত রহস্য অতি দ্রুত দিনের আলোর মতো উন্মোচিত হয় এবং দোষীরা আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি লাভ করে।