বুধবার সকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক অবরোধ করে এই বিক্ষোভ প্রদর্শন করা হয়, যা পরবর্তীতে চরম সহিংসতায় রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) যৌথ হস্তক্ষেপের এক পর্যায়ে আন্দোলনকারীরা পুলিশের একটি টহল গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করে।
এই নজিরবিহীন সংঘাত, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও হামলার ঘটনায় পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সংবাদকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যসহ অন্তত দশজন গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন। প্রায় দুই ঘণ্টা মহাসড়ক অবরুদ্ধ থাকার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপে যান চলাচল স্বাভাবিক হলেও পুরো শিল্পাঞ্চল জুড়ে এখন এক থমথমে, আতঙ্কজনক ও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক বাংলাদেশের অন্যতম ব্যস্ত এবং অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি যোগাযোগ মাধ্যম, যা রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে। একইসঙ্গে এটি পোশাকশিল্পের সরবরাহ ব্যবস্থার একটি অন্যতম প্রধান রুট।
বুধবার সকাল নয়টার দিকে সাভারের হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন মহাসড়কে কয়েকটি পোশাক কারখানার হাজার হাজার শ্রমিক হঠাৎ করেই অবস্থান নিয়ে তাদের বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল-জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ন্যূনতম মজুরি একটি যৌক্তিক ও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করা এবং বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিকদের অন্যায়ভাবে কালো তালিকাভুক্ত করার যে বিতর্কিত প্রবণতা শুরু হয়েছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করা।
মূলত এই তিন দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যেই শ্রমিকরা তাদের কর্মক্ষেত্র ত্যাগ করে রাজপথে নেমে আসেন। মহাসড়কের মতো একটি স্পর্শকাতর স্থানে এত বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের আকস্মিক অবস্থানে ওই এলাকার যান চলাচল মুহূর্তের মধ্যেই সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়ে এবং দূরপাল্লার সাধারণ যাত্রীরা চরম দুর্ভোগের শিকার হন।
সরেজমিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ থেকে জানা যায়, এদিন সকালে শুধু হেমায়েতপুর বাসস্ট্যান্ড নয়, সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত পদ্মার মোড় এলাকাতেও বিক্ষুব্ধ পোশাকশ্রমিকেরা জড়ো হয়ে বিশাল বিক্ষোভ মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
পরিস্থিতি ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং মহাসড়কে বড় ধরনের অরাজকতা সৃষ্টি হতে পারে বুঝতে পেরে সেখানে দ্রুত উপস্থিত হয় পুলিশ ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) বিশাল একটি দল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা শুরুতে অত্যন্ত ধৈর্য ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে শ্রমিকদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন।
কিন্তু আন্দোলনরত শ্রমিকরা তাদের দাবিতে অনড় থাকায় একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা হঠাৎ করেই পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করলে পরিস্থিতি অত্যন্ত সহিংস আকার ধারণ করে।
নিজেদের আত্মরক্ষা এবং এলাকার জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বাধ্য হয়ে কাঁদানে গ্যাস বা টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে শ্রমিকদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়। এ সময় পুরো এলাকা রীতিমতো রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
শ্রমিক অসন্তোষ ও সংঘাতের এই আঁচ সবচেয়ে ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক রূপ নেয় সকাল সাড়ে দশটার দিকে। হেমায়েতপুর-সিংগাইর সংযোগ সড়কে অবস্থানরত একদল চরম বিক্ষুব্ধ শ্রমিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেন।
দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা ওই গাড়ির লেলিহান শিখা পুরো এলাকার মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কীভাবে চরম সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, এই অগ্নিসংযোগের ঘটনাই তার প্রমাণ। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হলো, এই অরাজক পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে চরম রোষানলের শিকার হন সেখানে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা।
বস্তুনিষ্ঠ তথ্য তুলে ধরার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করা স্টার টেলিভিশনের সাংবাদিক সোহন সিরাজী, ৭১ টিভির প্রতিবেদক রায়হান বিন এবং চিত্রগ্রাহক উজ্জ্বল হোসেনের ওপর অতর্কিত ও বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। হামলাকারীদের বেধড়ক মারধরে এই সংবাদকর্মীরা গুরুতর জখম হন।
পুলিশের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও শ্রমিকদের মধ্যে থেমে থেমে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলতে থাকে, যার ফলে সাংবাদিক ও পুলিশ সদস্যসহ মোট অন্তত দশজন আহত হয়ে স্থানীয় বিভিন্ন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা গ্রহণ করেন।
সাভারের এই শ্রমিক অসন্তোষের ঢেউ খুব দ্রুতই পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল আশুলিয়াতেও আছড়ে পড়ে। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর এলাকায় অবস্থিত বেশ কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় পোশাক কারখানার শ্রমিকরা এদিন সকাল থেকেই তাদের কর্মস্থলে প্রবেশ করে উৎপাদন কাজে অংশ নেওয়ার বদলে আকস্মিক কর্মবিরতি পালন শুরু করেন।
কারখানার অভ্যন্তরে শ্রমিকদের এই নীরব কিন্তু জোরালো প্রতিবাদ একসময় বাইরের রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ার উপক্রম হয়। শ্রমিক অসন্তোষ যাতে কোনোভাবেই ভাঙচুর বা কারখানার সম্পত্তির ক্ষতির কারণ না হতে পারে, সে কথা বিবেচনা করে কারখানা মালিক ও প্রশাসন দ্রুত ও সতর্কতামূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং ওইসব কারখানায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন।
কারখানা ছুটি ঘোষণার পরপরই হাজার হাজার শ্রমিক রাস্তায় বেরিয়ে আসেন এবং তারা সংঘবদ্ধ হয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাইপাইল-আব্দুল্লাহপুর সড়কটি অবরোধ করার চেষ্টা চালান। তবে সাভারের ঘটনার পর থেকেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওই অঞ্চলে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকায়, তারা অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করেন এবং শ্রমিকদের মহাসড়কে অবস্থান নিতে না দিয়ে বুঝিয়ে সরিয়ে দেন।
মহাসড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের মতো ঘটনাবহুল এই দিনটিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। বেলা এগারোটার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ ও দাঙ্গা দমনকারী বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত সুকৌশলে পোশাকশ্রমিকদের ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মূল পয়েন্টগুলো থেকে সরিয়ে দিতে সক্ষম হন।
অবরুদ্ধ মহাসড়ক দীর্ঘ দুই ঘণ্টা পর ধীরে ধীরে উন্মুক্ত হতে শুরু করে এবং আটকে পড়া শত শত যানবাহন পুনরায় তাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। পুরো ঘটনার সার্বিক বিষয়ে সাভার হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান নূর গণমাধ্যমের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রদান করেন।
তিনি অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে জানান যে, শ্রমিকেরা মূলত তাদের পূর্বনির্ধারিত তিন দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্য নিয়েই মহাসড়কে অবস্থান নিয়েছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে তাদের মহাসড়ক থেকে সরিয়ে দিয়েছেন।
বর্তমানে ওই এলাকার যান চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। তবে পরবর্তীতে যাতে নতুন করে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা, ভাঙচুর বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হতে পারে, সে জন্য শিল্পাঞ্চলের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এবং কারখানার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন রাখা হয়েছে।
বর্তমানে আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর ও সাভারের হেমায়েতপুর এলাকায় চরম থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানি আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস এবং লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান মাধ্যম।
আন্তর্জাতিক বাজারে এই শিল্পের সুনাম ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে কারখানার অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং শ্রমিক-মালিকের মধ্যে একটি সুসম্পর্ক অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি এবং কর্মপরিবেশের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোকে কেন্দ্র করে বারবার এই ধরনের সড়ক অবরোধ, সংঘাত ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আন্তর্জাতিক ক্রেতারা সাধারণত একটি স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ উৎপাদন পরিবেশ প্রত্যাশা করেন, যেখানে সরবরাহ ব্যবস্থা কোনোভাবেই বিঘ্নিত হবে না। তাই শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবিগুলোর বিষয়ে যেমন মালিকপক্ষ ও সরকারকে আরও বেশি মনোযোগী ও সংবেদনশীল হওয়া প্রয়োজন, ঠিক তেমনি দাবি আদায়ের নামে মহাসড়ক অবরোধ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা, গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর হামলা বা রাষ্ট্রীয় সম্পত্তিতে আগুন দেওয়ার মতো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিল্প পুলিশ, কারখানা মালিকপক্ষ এবং শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে একটি কার্যকর, স্বচ্ছ ও নিয়মিত সংলাপের মাধ্যমেই কেবল এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংস পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব।
অন্যথায়, সাভার ও আশুলিয়ার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শিল্পাঞ্চলগুলোতে বারে বারে ঘটা এই সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে একটি বিশাল প্রতিবন্ধকতা হিসেবেই থেকে যাবে।