পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা এবং নিরপেক্ষতা বজায় রেখে রাষ্ট্রের সেবা করাই হতে হবে তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। রোববার, ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ৪৫তম বিসিএস (পুলিশ) ও বিসিএস (আনসার) ক্যাডারে সদ্য যোগদান করা কর্মকর্তাদের এক বিশেষ ব্রিফিং ও পরিচিতি সভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ এই বাহিনীগুলোতে নতুন প্রজন্মের কর্মকর্তাদের পদার্পণকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি দিকনির্দেশনামূলক বার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন কর্মজীবনে পদার্পণ করা নবীন কর্মকর্তাদের উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোতে তাদের ভূমিকার অপরিহার্যতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সুপিরিয়র সার্ভিসের সদস্য হিসেবে তাদের সবচেয়ে বড় এবং প্রাথমিক দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সুদৃঢ়ভাবে নিয়ন্ত্রণ ও সমুন্নত রাখা।
এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরই মূলত দেশের অন্যান্য সমস্ত উন্নয়নমূলক ও প্রাত্যহিক কার্যক্রম সুচারুরূপে সম্পন্ন হওয়ার অনুকূল পরিবেশ নির্ভর করে। দেশের প্রশাসন যন্ত্রের গতিশীলতা, আর্থসামাজিক উন্নয়ন, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সামগ্রিক নিরাপত্তা এবং সাধারণ জনগণের প্রাত্যহিক জীবনের স্বস্তি-এসব কিছুই অনেকাংশে পুলিশ ও আনসার বাহিনীর সততা, দক্ষতা ও নিরপেক্ষ কার্যক্রমের ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কর্মজীবনের প্রতিটি ধাপে শৃঙ্খলা ও নিয়মাবর্তিতা মেনে চলার ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি নবীন কর্মকর্তাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, যেকোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীর মূল ভিত্তিই হলো এর শৃঙ্খলাবোধ এবং সার্ভিস রুলস বা চাকরি বিধিমালার প্রতি অবিচল আনুগত্য।
সার্ভিস লাইফে সর্বদা এই শৃঙ্খলাবোধ বজায় রাখার পাশাপাশি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আইনানুগ নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করার জন্য তিনি তাদের প্রতি আহ্বান জানান। কোনো অবস্থাতেই যেন চেইন অব কমান্ড বা শৃঙ্খলার ব্যত্যয় না ঘটে, সে বিষয়ে তিনি শুরুতেই নবীন কর্মকর্তাদের সতর্ক করে দেন, কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যেকোনো ক্ষুদ্র বিচ্যুতি রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে।
পেশাগত চ্যালেঞ্জ ও সংবেদনশীলতার দিকটি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের অন্যান্য সাধারণ ক্যাডার সার্ভিসের চেয়ে পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর কাজের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই দুটি বাহিনীকে প্রতিনিয়ত অত্যন্ত সংঘাতময়, অনিশ্চিত এবং চরম চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে কাজ করতে হয়।
মাঠপর্যায়ের কাজের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, এমন অনেক পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে কর্মকর্তাদের মুহূর্তের মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। এ ধরনের জটিল ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে কোনো ধরনের আবেগ বা উত্তেজনার বশবর্তী না হয়ে কেবল বুদ্ধিমত্তা, নিখুঁত পেশাদারিত্ব এবং উপস্থিত বুদ্ধি বা 'প্রেজেন্স অব মাইন্ড'-এর সর্বোত্তম ব্যবহার অত্যন্ত জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হয়, সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও বিচক্ষণতা প্রদর্শনের জন্য তিনি নবীন কর্মকর্তাদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাবমূর্তি রক্ষার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেন।
তিনি বলেন, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এই বাহিনীর সদস্যদের কোনো অবস্থাতেই অর্পিত ক্ষমতার অপব্যবহার করা চলবে না। ক্ষমতার অপব্যবহার কেবল ব্যক্তিগত অপরাধই নয়, বরং এটি পুরো বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ভাবমূর্তিকে চরমভাবে ক্ষুণ্ন করে।
তিনি নবীন কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন তাদের কর্মের মাধ্যমে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করতে সক্ষম হন এবং বাহিনীর সম্মানকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। এই গুরুত্বপূর্ণ পরিচিতি সভায় সভাপতিত্ব করেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নবীন কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রদান করেন বাংলাদেশ পুলিশের আইজিপি (ইনচার্জ) ও অতিরিক্ত আইজিপি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন এবং বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
তারা উভয়েই তাদের দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নবীন কর্মকর্তাদের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশল এবং পেশাদারিত্ব বজায় রাখার বিষয়ে মূল্যবান পরামর্শ প্রদান করেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ৪৫তম বিসিএস পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারে মোট ৮০ জন এবং বিসিএস (আনসার) ক্যাডারে ২৫ জন মেধাবী কর্মকর্তাকে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিল।
পরবর্তীতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে নিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন জারির পর, আজ ১ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারে ৬৫ জন এবং বিসিএস (আনসার) ক্যাডারে ১৯ জন কর্মকর্তা যোগদান করেন। রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার এই মহান ব্রতে তাদের এই নবযাত্রা দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় নতুন মাত্রিকতা যোগ করবে বলে সংশ্লিষ্টরা প্রত্যাশা করছেন।