শনিবার, অক্টোবর ৩১, ২০২৬
১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

তাহসিফ হত্যা: প্রধান সন্দেহভাজন আসামি দীপের রিমান্ড মঞ্জুর

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ০৪:৩৫ পিএম

তাহসিফ হত্যা: প্রধান সন্দেহভাজন আসামি দীপের রিমান্ড মঞ্জুর
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানী ঢাকার অদূরে তুরাগ নদের শান্ত জলে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার হওয়া বিমানবাহিনীর সাবেক এক কর্মকর্তার রহস্যজনক ও মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তদন্তের পালে নতুন হাওয়া লেগেছে।

 

সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির চাঞ্চল্যকর ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জালে আটক হওয়া প্রধান সন্দেহভাজন আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য চার দিনের পুলিশি রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

 

শনিবার বিকেলে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিজ্ঞ বিচারক হাসিব উল্লাহ পিয়াস উভয় পক্ষের আইনজীবীদের দীর্ঘ আইনি তর্ক-বিতর্ক ও শুনানি শেষে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আদেশ প্রদান করেন।

 

রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও মর্যাদাপূর্ণ বাহিনীর সাবেক সদস্যের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক পরিণতি দেশজুড়ে সাধারণ মানুষ এবং সচেতন মহলে ব্যাপক আলোড়ন ও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর মানদণ্ডে বিচার করলে, এ ধরনের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড একটি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই পরিগণিত হয়।

 

শনিবার, একত্রিশে অক্টোবর, কড়া পুলিশি প্রহরার মধ্য দিয়ে দুপুর আনুমানিক সোয়া দুইটার দিকে মামলার সন্দিগ্ধ আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের এজলাসে হাজির করা হয়।

 

মামলার অত্যন্ত সংবেদনশীল দিকগুলো বিবেচনা করে এবং একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ তদন্তের স্বার্থে আসামিকে পুলিশি হেফাজতে নিয়ে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা।

 

নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন আসামির বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড চেয়ে একটি সুদীর্ঘ ও লিখিত আবেদন বিচারকের সামনে পেশ করেন। শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষে অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর আজিজুল হক দিদার রিমান্ড আবেদনের পক্ষে অত্যন্ত বলিষ্ঠ, আইনানুগ ও যৌক্তিক আইনি যুক্তি উপস্থাপন করেন।

 

তিনি বিজ্ঞ বিচারককে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে অবহিত করেন যে, এই বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত রহস্য উন্মোচন এবং অপরাধীদের জালের শিকড় পর্যন্ত পৌঁছানোর জন্য আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা আইনি প্রক্রিয়ার একটি অপরিহার্য ও অলঙ্ঘনীয় অংশ।

 

দীর্ঘক্ষণ চলা আইনি বিতর্ক এবং সার্বিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মূল্যায়ন করে আদালত আসামির চার দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার সূত্রপাত ঘটে গত সাতাশে অক্টোবর, মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।

 

মামলার আনুষ্ঠানিক এজাহার এবং তদন্তকারী সংস্থার প্রণীত প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত কে এম তাহসিফ সাউরি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একজন প্রাক্তন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ছিলেন, যিনি কর্মজীবনে অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিজ দায়িত্ব পালন করেছেন।

 

তিনি রাজধানীর উত্তরা সংলগ্ন তুরাগ থানার অন্তর্গত আঠারো নম্বর সেক্টরের একটি অভিজাত ও সুরক্ষিত আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। পরিবারের শোকাহত সদস্যদের দেওয়া তথ্যমতে, ঘটনার দিন আনুমানিক সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপ, যাকে নিহতের একজন পরিচিত ও জুনিয়র বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তাহসিফ সাউরিকে তার বাসা থেকে ডেকে বাইরে নিয়ে যান।

 

এরপর থেকেই সাবেক এই সামরিক কর্মকর্তা সম্পূর্ণভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। পরিবারের সদস্যরা সম্ভাব্য সব জায়গায়, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের কাছে হন্যে হয়ে খোঁজ করেও তার কোনো সন্ধান পেতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হন।

 

একজন প্রাপ্তবয়স্ক এবং সাবেক চৌকস সামরিক কর্মকর্তার আকস্মিক ও রহস্যজনক এই অন্তর্ধান পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও গভীরভাবে ভাবিয়ে তোলে।

 

নিখোঁজ হওয়ার ঠিক পরদিন, আঠাশে অক্টোবর বুধবার বিকেল আনুমানিক সাড়ে চারটার দিকে একটি অপ্রত্যাশিত এবং হৃদয়বিদারক খবরের মাধ্যমে এই অন্তর্ধান রহস্যের এক মর্মান্তিক সমাপ্তি ঘটে।

 

জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর '৯৯৯'-এর মাধ্যমে স্থানীয় এক অজ্ঞাত নাগরিক পুলিশ কন্ট্রোল রুমে ফোন করে অবহিত করেন যে, উত্তরখান থানার আওতাধীন তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট সংলগ্ন এলাকায় একটি অজ্ঞাতপরিচয় মৃতদেহ পানিতে ভাসমান অবস্থায় রয়েছে।

 

এই উদ্বেগজনক সংবাদ প্রাপ্তির সাথে সাথেই স্থানীয় পুলিশের একাধিক দল এবং নৌ পুলিশের বিশেষায়িত ইউনিট কালক্ষেপণ না করে ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। তারা নদী থেকে মৃতদেহটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে উদ্ধার করে প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ শুরু করে।

 

মৃতদেহ তল্লাশি ও উদ্ধারের সময় নিহতের পরিহিত ট্রাউজারের পকেটে একটি আধুনিক ও মূল্যবান মুঠোফোন পাওয়া যায়। সেই মুঠোফোনের সূত্র ধরে এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পুলিশ অতি দ্রুততার সাথে নিশ্চিত হয় যে, উদ্ধারকৃত মৃতদেহটি আগের দিন নিখোঁজ হওয়া বিমানবাহিনীর সেই সাবেক কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরির।

 

সন্তানের এমন মর্মান্তিক, অপ্রত্যাশিত এবং অস্বাভাবিক মৃত্যুর সংবাদে পরিবারটিতে এক গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। প্রিয় সন্তানকে হারানোর এই অপূরণীয় ক্ষতি ও বেদনার মাঝেও এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার চেয়ে নিহতের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম বাদী হয়ে শুক্রবার দিবাগত রাত এক টা পাঁচ মিনিটে রাজধানীর উত্তরখান থানায় একটি আনুষ্ঠানিক হত্যা মামলা দায়ের করেন।

 

মামলা দায়েরের প্রাথমিক পর্যায়ে আসামিদের নাম ও পরিচয় অজ্ঞাত হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে তাদের তদন্ত কার্যক্রম জোরদার করে।

 

তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণ, মুঠোফোনের কল রেকর্ড, অবস্থান শনাক্তকরণ প্রযুক্তি এবং গোপন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, নিখোঁজ হওয়ার দিন নিহত সাউরিকে নিয়ে টঙ্গী পশ্চিম থানার অন্তর্গত মাজার বস্তি এলাকার দিকে গিয়েছিল এই আসামি দীপ।

 

এই অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে পুলিশ দীপকে সন্দিগ্ধ বা প্রধান সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেপ্তার দেখায়। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ও নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃত আসামি দীপ ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেছেন বলে জানা গেছে।

 

তিনি তদন্তকারীদের কাছে স্বীকার করেছেন যে, নিহত তাহসিফ সাউরি তার পূর্বপরিচিত এবং বয়সে বড় বা সিনিয়র বন্ধু ছিলেন। পুলিশি প্রতিবেদনে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ, সিসিটিভি ফুটেজের বিশ্লেষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির উপাত্তে এই নৃশংস ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সাথে আসামি দীপের সরাসরি এবং ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকার ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট ও জোরালো প্রমাণ পুলিশের হাতে এসেছে।

 

তদন্তকারী সংস্থা আদালতকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে অবহিত করেছে যে, আসামিকে যদি এই মুহূর্তে জামিনে মুক্ত হওয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া হয়, তবে সে অত্যন্ত সুকৌশলে মামলার গুরুত্বপূর্ণ আলামত ধ্বংস করতে পারে এবং পলাতক অন্যান্য অপরাধীদের সাথে যোগসাজশে তদন্ত প্রক্রিয়ায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটাতে পারে, যা ন্যায়বিচারের পথকে রুদ্ধ করে দেবে।

 

ফলশ্রুতিতে, একটি নিখুঁত তদন্ত নিশ্চিত করার বৃহত্তর স্বার্থে তাকে পুলিশি হেফাজতে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আদালতে পেশ করা রিমান্ড আবেদনে পুলিশ বেশ কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সুনির্দিষ্ট আইনি কারণ বিশদভাবে উল্লেখ করেছে, যা এই মামলার ভবিষ্যৎ তদন্তের গতিপথ নির্ধারণ করবে।

 

প্রথমত, এই চাঞ্চল্যকর ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা মূল উদ্দেশ্য বা প্রকৃত কারণটি এখনো পুরোপুরি উদ্ঘাটিত হয়নি, যা আসামিকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমেই কেবল জানা সম্ভব।

 

দ্বিতীয়ত, পুলিশের দৃঢ় বিশ্বাস যে, সাবেক একজন সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করে মৃতদেহ গুম করার মতো বড় ও জটিল অপরাধ কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সংঘটন করা প্রায় অসম্ভব; এর সাথে নিশ্চিতভাবেই আরও বেশ কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় আসামি জড়িত রয়েছে।

 

ওই পলাতক ও চক্রের অন্যান্য আসামিদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে শনাক্ত করা এবং তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার জন্য দীপের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি। তৃতীয়ত, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত প্রাণঘাতী অস্ত্র এবং মামলার সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত অন্যান্য বস্তুতান্ত্রিক আলামত এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।

 

চতুর্থত, নিহত সাবেক বিমানবাহিনী কর্মকর্তা তাহসিফ সাউরি ঘটনার দিন যে ব্যক্তিগত মোটরসাইকেলটি ব্যবহার করে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন, সেটিও এখনো নিখোঁজ রয়েছে। আসামিকে সাথে নিয়ে বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে সেই নিখোঁজ মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা মামলার তদন্তের একটি বড় অগ্রাধিকার।

 

সর্বোপরি, এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ঠিক কোন নির্দিষ্ট স্থানে, কী ধরনের বিরূপ পরিস্থিতিতে এবং কীভাবে সংঘটিত হয়েছিল, সেই মূল অপরাধস্থল সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করার জন্য আসামির কাছ থেকে সরাসরি জবানবন্দি গ্রহণ করা পুলিশের তদন্ত প্রক্রিয়ার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

 

দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই স্পর্শকাতর মামলার তদন্তভার পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করছেন। একজন দেশপ্রেমিক সাবেক সামরিক কর্মকর্তার এমন রহস্যজনক মৃত্যু সমাজে যে ভীতি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, তা নিরসনে পুলিশ দ্রুততম সময়ের মধ্যে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে বদ্ধপরিকর।

 

রিমান্ডের এই চার দিনে আসামি দীপের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের জট খুলতে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে আশা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।