মঙ্গলবার, নভেম্বর ৩, ২০২৬
১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র চলতে পারে

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৩ নভেম্বর, ২০২৬, ১২:৫২ পিএম

হাসিনা জীবিত থাকা পর্যন্ত দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র চলতে পারে
ছবি : Collected

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিরাজমান অস্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ এবং এর পেছনের কারণ সম্পর্কে নিজেদের সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করেছে সরকার। বিশেষ করে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্রের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।

 

সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন তার পক্ষ থেকে দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টির চেষ্টা অব্যাহত থাকতে পারে।

 

তবে রাষ্ট্রযন্ত্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যেকোনো মূল্যে এ ধরনের ধ্বংসাত্মক অপতৎপরতা কঠোরভাবে প্রতিহত করতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে। মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমের অগ্রগতি এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

এ সময় সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে তথ্য অধিদপ্তরের প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদ উপস্থিত ছিলেন। সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, বিশেষ করে পোশাক খাতে বিরাজমান অসন্তোষের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়।

 

উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে শ্রমিকদের দাবির বিষয়টি বিশ্লেষণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর অন্তর শ্রমিকদের মজুরি কাঠামো পর্যালোচনা ও পুনর্নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।

 

এর আগে ২০০৬, ২০১০, ২০১৩, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৩ সালে শ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই প্রতিষ্ঠিত নিয়ম এবং ধারাবাহিকতা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের পর ২০২৬ সালে এসে নতুন করে কোনো মজুরি বোর্ড গঠনের কথা ছিল না।

 

তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, দেশীয় বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাপক মূল্যস্ফীতি এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, সরকার সে বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করেছে।

 

দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ এবং পোশাকশ্রমিকদের এই সীমাহীন কষ্টের কথা বিবেচনা করে সরকার সম্পূর্ণ সহানুভূতিশীল ও মানবিক অবস্থান থেকে নির্ধারিত সময়ের আগেই নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করার মতো একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

 

শ্রমিকদের প্রতি সরকারের সহমর্মিতা প্রকাশ করে উপদেষ্টা বলেন, সরকার এটি খুব ভালোভাবে বুঝতে পারছে যে, জীবনযাত্রার ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং এর ফলে তৈরি পোশাকশিল্পের কর্মীদের জীবনযাপন অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে। এখানে অস্বীকার করার মতো কিছু নেই।

 

দেশে মূল্যস্ফীতি বিরাজমান, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির কারণে পরিবহন থেকে শুরু করে নিত্যব্যবহার্য প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে। মূলত এই রূঢ় বাস্তবতার কথা মাথায় রেখেই সরকার স্বপ্রণোদিত হয়ে শ্রমিকদের দাবি ওঠার আগেই একটি নতুন মজুরি কমিশন গঠন করেছে।

 

সরকারের এই আগাম এবং ইতিবাচক পদক্ষেপের ফলে শ্রমিকদের মূল যে দাবি বা আন্দোলনের প্রধান যে কারণ, সেটি ইতিমধ্যেই অনেকাংশে নিরসন হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট মহল এই ইস্যুটিকে কেন্দ্র করে ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে।

 

শ্রমিকদের ন্যায্য ও যৌক্তিক দাবির আড়ালে যে সহিংসতা, ভাঙচুর ও নাশকতার ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়ে সরকার অত্যন্ত কঠোর মনোভাব পোষণ করে। ডা. জাহেদ উর রহমান স্পষ্ট ভাষায় জানান, রাজপথে যে ধরনের ভয়াবহ সহিংসতা ও ধ্বংসাত্মক আচরণ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা কোনোভাবেই প্রকৃত ও সাধারণ পোশাকশ্রমিকদের কাজ হতে পারে না।

 

দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত করেছেন যে, এই ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে সীমান্তের ওপারের একটি গোষ্ঠীর ইন্ধন এবং সরাসরি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান মূল্যায়ন করে উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিকভাবে রাজপথে ঘুরে দাঁড়ানোর বা সক্রিয় হওয়ার মতো কোনো সাংগঠনিক সক্ষমতা দলটির আর অবশিষ্ট নেই।

 

তবে দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার সুবাদে তাদের কাছে যে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থের মজুত রয়েছে, সেই কালো টাকা ব্যবহার করে তারা বিভিন্ন স্থানে সন্ত্রাসী ও বহিরাগতদের মাধ্যমে নাশকতা সৃষ্টির গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে।

 

আগামী ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের যে গুঞ্জন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়েছে, সে বিষয়েও সাংবাদিকরা উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

 

এর জবাবে তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ষড়যন্ত্রের এই বিষয়টি কেবল ডিসেম্বর মাসকেন্দ্রিক নয়। সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এটি মনে করা হয় যে, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা যতদিন জীবিত থাকবেন, ততদিন পর্যন্ত দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট করার এবং অস্থিরতা সৃষ্টির এই অপচেষ্টা তিনি অব্যাহত রাখবেন।

 

সরকার এই ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সম্পূর্ণ সজাগ রয়েছে এবং যেকোনো মূল্যে তা প্রতিহত করতে বদ্ধপরিকর। এই প্রসঙ্গে তিনি ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশনে শেখ হাসিনার দেওয়া একটি বিতর্কিত বক্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেন।

 

সে সময় নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর শেখ হাসিনা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তিনি তৎকালীন সরকারকে এক দিনও শান্তিতে দেশ পরিচালনা করতে দেবেন না। উপদেষ্টা মনে করেন, সেই একই ধ্বংসাত্মক ও অসহিষ্ণু মানসিকতার প্রতিফলন এখনো তার রাজনৈতিক দর্শনে বিদ্যমান রয়েছে।

 

ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে অতীতে দেওয়া নিজের একটি বক্তব্যেরও চমৎকার ও পেশাদার ব্যাখ্যা প্রদান করেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি জানান, ডিসেম্বর মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর এই বিষয়টি নিয়ে তিনি পুনরায় গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলবেন।

 

তবে তিনি এও প্রতিশ্রুতি দেন যে, যদি শেখ হাসিনা সত্যি সত্যিই দেশে ফিরে আসেন এবং উপদেষ্টার পূর্ববর্তী রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা যদি ভুল প্রমাণিত হয়, তবে তিনি প্রকাশ্যে নিজের ভুলের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন।

 

তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বলেন, যদি তিনি দেশে এসে হাজির হন, তবে এরপরও তো কোনো না কোনো মঙ্গলবার আসবে। সেই মঙ্গলবারের সংবাদ সম্মেলনে যদি তিনি দায়িত্বে বহাল থাকেন, তবে তিনি নিজে উপস্থিত হয়ে স্বীকার করবেন যে তার রাজনৈতিক মূল্যায়নটি সঠিক ছিল না এবং এর জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করতে কুণ্ঠাবোধ করবেন না।

 

পোশাকশ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকদের বদলে বহিরাগত, কিশোর ও তরুণদের অংশগ্রহণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার বিষয়েও সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করা হয়।

 

ডা. জাহেদ উর রহমান অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান, পূর্ববর্তী স্বৈরাচারী সরকারের মতো বর্তমান সরকার কোনোভাবেই দমন-পীড়ন, গুম, খুন বা নির্বিচার বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের পথ অনুসরণ করতে চায় না।

 

তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বাংলাদেশের বর্তমান পুলিশ বাহিনী কখনোই আর শেখ হাসিনার আমলের মতো দলীয় লাঠিয়াল বাহিনীতে পরিণত হবে না। তবে একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি মনে করেন, রাষ্ট্রের জানমাল রক্ষার স্বার্থে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আইনানুগভাবে বলপ্রয়োগ করার অধিকার রয়েছে।

 

কিন্তু সেই বলপ্রয়োগ অবশ্যই আইনি প্রক্রিয়ার কঠোর গণ্ডির মধ্যে থাকতে হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী তা হতে হবে আনুপাতিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ভিডিওতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা কোথাও কোথাও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বলপ্রয়োগের যে চিত্র দেখা গেছে, সে বিষয়ে তিনি সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, বরং একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকার সর্বদা এটি নিশ্চিত করতে চায় যে, যেকোনো ধরনের অস্থিরতা বা নৈরাজ্য নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে যেন কোনো আতঙ্ক তৈরি না হয় এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যেন সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকে।

 

সবশেষে, তৈরি পোশাকশিল্পের এই অনাকাঙ্ক্ষিত অস্থিতিশীলতা খুব দ্রুতই অবসান হবে বলে সরকার গভীর আশাবাদ ব্যক্ত করেছে। উপদেষ্টা বলেন, আন্দোলনের শুরুতে সাধারণ শ্রমিকদের কিছু অত্যন্ত যৌক্তিক ও ন্যায্য দাবি ছিল, যা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে সরকার ইতিমধ্যে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে তাদের প্রতি যে সদিচ্ছা দেখিয়েছে, তা শ্রমিকদের বোঝাতে সক্ষম হলে তারা খুব দ্রুতই নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরে যাবেন।

 

আর প্রকৃত শ্রমিকরা যখন রাজপথ ছেড়ে কারখানায় ফিরে যাবেন, তখন তাদের আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো পক্ষের পক্ষে আর নাশকতা বা অস্থিরতা সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না। প্রকৃত শ্রমিকরাই এই শিল্পের প্রাণ, আর তাদের উপস্থিতি ছাড়া বহিরাগতদের ষড়যন্ত্র কখনোই সফল হতে পারে না বলে সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে।