বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ আজ (শনিবার) ঢাকার শিল্পকলা একাডেমিতে দৈনিক নয়া দিগন্তের ২১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় এই গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তার এই বক্তব্য বিরোধী শিবিরে বৃহত্তর ঐক্যের আবশ্যকতাকে সামনে নিয়ে আসে।
সালাহউদ্দিন আহমেদ স্পষ্টভাবে বলেন যে, দেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছে, কিন্তু সেই অর্জন আজ হুমকির মুখে। তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে 'ফ্যাসিবাদী' শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, এই শক্তিকে স্থায়ীভাবে প্রতিহত করতে সকল দলকেই ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে এবং তাদের প্রত্যাবর্তনের প্রতিটি পথ বন্ধ করে দিতে হবে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, "যদি আমাদের অনৈক্য ও বিভেদ কখনোই দেশে ফ্যাসিবাদী শক্তির প্রত্যাবর্তনের দরজা খুলে দেয়, তবে জাতি আমাদের কখনোই ক্ষমা করবে না। তাই, আমাদের অবশ্যই এই কঠিন সময়ে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।" তিনি উপস্থিত সকলকে এই ঐক্যের অঙ্গীকারে অটল থাকার শপথ নেওয়ার আহ্বান জানান।
দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলন, বিশেষ করে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, দেশের সোনালী সন্তান ও শহীদদের রক্তের বিনিময়ে যে গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতির জন্ম হয়েছে, সকল রাজনৈতিক দলকেই সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, "আমি আশা করি, আগামী দিনগুলিতে আমরা মতপার্থক্য ও আদর্শগত ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও দেশের স্বার্থ, গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকব।"
সালাহউদ্দিন আহমেদের মতে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সত্যিই শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা সকলের পবিত্র দায়িত্ব। তিনি বলেন, "আমরা আমাদের ছাত্র আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এবং সংগ্রামের রক্তক্ষয়ী দিনগুলো শুনেছি। সেই গৌরবময় অতীতের ওপর দাঁড়িয়ে এখন আমাদের ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে হবে। আমাদেরই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়তে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি দৃঢ় গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা রেখে যাওয়া আমাদের নাগরিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক দায়িত্ব।"
বিএনপি নেতা তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামে ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করা দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, "মাত্র কয়েকটি কলাম লেখার অপরাধে আমাকে প্রায় সাড়ে নয় বছর নির্বাসনে থাকতে হয়েছে, আয়নাঘরের নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে এবং কারাবাস করতে হয়েছে।"
ব্যক্তিগত সংগ্রামের একটি মর্মস্পর্শী স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, একসময় 'আমার দেশ' পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান এবং তাকে পিজি হাসপাতালে পৃথক কারাকক্ষে রাখা হয়েছিল। মাহমুদুর রহমান তখন অনশন ধর্মঘট করছিলেন। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, "আমি তাকে অনশন ভাঙতে বোঝানোর চেষ্টা করি। আমি তাকে বলি যে, তিনি মারা গেলে শেখ হাসিনা খুশি হবেন।" পরে জ্যেষ্ঠ নেতাদের হস্তক্ষেপে ছয় বা সাত দিন পর তিনি অনশন ভাঙতে রাজি হন। তার এই স্মৃতিচারণ রাজনৈতিক ভিন্নমতের কারণে কর্মীদের ত্যাগ ও কষ্টের গভীরতাকে প্রকাশ করে।
বক্তব্যের শেষে সালাহউদ্দিন আহমেদ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে তাদের লেখনীর মাধ্যমে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের জন্য দেশের সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতি জোরালো আহ্বান জানান। তিনি বিশ্বাস করেন, একটি স্বাধীন ও নির্ভীক সংবাদমাধ্যমই পারে গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি মজবুত করতে এবং জনগণকে সঠিক তথ্য দিয়ে সচেতন করতে।
সালাহউদ্দিন আহমেদের এই বক্তব্যের মূল বার্তা হলো, বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে সকল বিরোধী দলের বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়া আজ সময়ের দাবি, অন্যথায় দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ চরম সংকটে পড়তে পারে।