প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিতব্য এই সভাটি এমন এক সময়ে ডাকা হলো, যখন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত করার এবং জনগণের হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনার এক জটিল প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। যদিও এ ধরনের সভা বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর আলোচ্যসূচি ও সিদ্ধান্ত দেশের সামগ্রিক গণতান্ত্রিক রূপান্তরের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শনিবার সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই সভার কথা জানানো হয়। হাইকোর্ট বিভাগের অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার (প্রশাসন ও বিচার) মো. আসিফ ইকবাল স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আগামী মঙ্গলবার, ৪ নভেম্বর, বেলা ৩টায় সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসন ভবনের (ভবন নং-৪) কনফারেন্স কক্ষে উভয় বিভাগের বিচারপতিদের অংশগ্রহণে এই ফুল কোর্ট সভা অনুষ্ঠিত হবে।
সুপ্রিম কোর্টের ‘ফুল কোর্ট সভা’ হলো এমন একটি আনুষ্ঠানিক সম্মেলন, যেখানে প্রধান বিচারপতির আহ্বানে আপিল বিভাগ এবং হাইকোর্ট বিভাগের সকল বিচারপতিরা একত্রিত হন। এটি বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী ফোরাম। সাধারণত, বিচার বিভাগের প্রশাসন, কার্যপদ্ধতি, বিধিমালা প্রণয়ন, বিচারপতিদের আচরণবিধি এবং বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও নীতিগত বিষয়ে ঐক্যমত্যে পৌঁছানোর জন্য এ ধরনের সভা আহ্বান করা হয়। এটি কোনো প্রাত্যহিক বা রুটিনমাফিক সভা নয়, বরং এর আয়োজন একটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
বিশেষ করে, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রের যে মৌলিক সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিচার বিভাগের আমূল পরিবর্তন। পূর্ববর্তী ব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার, নিপীড়নের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করা, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে বিচার ব্যবস্থার প্রতি গভীর 'আস্থার সংকট' তৈরি করেছিল।
গত ১১ আগস্ট, ২০২৪ তারিখে প্রধান বিচারপতি হিসেবে ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ শপথ গ্রহণের পর থেকেই এই হারানো আস্থা পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া শুরু করেন। তিনি ২০২৫ সালকে বিচার বিভাগের জন্য একটি 'নবযাত্রার বছর' হিসেবে ঘোষণা করেন এবং নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ পৃথক ও প্রভাবমুক্ত করার একটি উচ্চাভিলাষী ‘রোডম্যাপ’ বা কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন। মঙ্গলবারের এই ফুল কোর্ট সভা সেই রোডম্যাপ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়ায় সকল বিচারপতির সম্মিলিত অংশগ্রহণ ও দিকনির্দেশনা চূড়ান্ত করার মঞ্চ হিসেবে কাজ করবে।
যদিও ফুল কোর্ট সভার সুনির্দিষ্ট আলোচ্যসূচি গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয় না, তবে বিচার বিভাগের চলমান সংস্কার কার্যক্রম এবং প্রধান বিচারপতির ঘোষিত কর্মপরিকল্পনা বিশ্লেষণ করে ধারণা করা হচ্ছে, বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী বিষয় এই সভার আলোচনায় প্রাধান্য পাবে।
১. বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন: জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত ‘বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন’ সম্প্রতি সরকারের কাছে একটি átf`র্চা (২৮-দফা) সুপারিশমালা জমা দিয়েছে। এই সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে বিচার বিভাগে দুর্নীতি প্রতিরোধে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা চালু করা, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতাকে একটি বোর্ডের সুপারিশের অধীন করা, আইনজীবীদের দুর্নীতি প্রতিরোধে বার কাউন্সিলের মাধ্যমে তদন্ত কমিটি গঠন এবং একটি স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস প্রতিষ্ঠা করার মতো বৈপ্লবিক প্রস্তাব। এই সুপারিশগুলো আইনে পরিণত করার প্রক্রিয়া এবং বিচার বিভাগের পক্ষ থেকে এর বাস্তবায়নে কৌশলগত অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে বিচারপতিদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা ও মতৈক্য প্রয়োজন।
২. বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা: বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রথম ধাপ হলো বিচারপতি নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা আনা। প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ ইতোমধ্যেই উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগে একটি স্বাধীন কাউন্সিল গঠনের কথা বলেছেন। এরই মধ্যে ‘সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে এবং ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গত আগস্ট মাসে ২৫ জন অতিরিক্ত বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোবদ্ধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। এই নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং এর কার্যকারিতা নিয়ে বিচারপতিদের মতামত গ্রহণ এই সভার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।
৩. সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিলের কার্যকারিতা: ষোড়শ সংশোধনীর রিভিউ আবেদন চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তির পর প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে ‘সুপ্রিম জুডিসিয়াল কাউন্সিল’ (এসজেসি) পুনর্গঠিত হয়েছে, যা বিচারপতিদের জবাবদিহিতার সর্বোচ্চ ফোরাম। এই কাউন্সিলের পূর্ণ কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় এর ভূমিকা শক্তিশালী করার বিষয়ে সভায় আলোচনা হবে।
৪. বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়: বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা করার যে সাংবিধানিক অঙ্গীকার, তার বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত হলো একটি পৃথক বিচার বিভাগীয় সচিবালয় প্রতিষ্ঠা করা। প্রধান বিচারপতির সংস্কার রোডম্যাপে এই বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পেয়েছে। এই সচিবালয় প্রতিষ্ঠার আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো কী হবে, তা নিয়ে ফুল কোর্ট সভায় নীতিগত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
৫. ই-জুডিসিয়ারি ও মামলার জট নিরসন: দেশের আদালতগুলোতে জমে থাকা লক্ষ লক্ষ মামলার জট বিচারপ্রার্থীদের ভোগান্তির প্রধান কারণ। এই সংকট থেকে উত্তরণে ‘ই-জুডিসিয়ারি’ বা ডিজিটাল বিচার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। সংস্কার কমিশনও তাদের সুপারিশে ই-ফাইলিং, ই-পেমেন্ট এবং অনলাইনভিত্তিক সাক্ষ্যগ্রহণের ওপর জোর দিয়েছে। এই প্রযুক্তিগত রূপান্তরের রোডম্যাপ বাস্তবায়ন এবং মামলার জট কমাতে হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের কর্মপদ্ধতিতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, তা নিয়েও বিশদ আলোচনা হবে।
মঙ্গলবারের এই সভাটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিচার বিভাগ কেবল তার অভ্যন্তরীণ সংস্কার নিয়েই ব্যস্ত নয়, বরং জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকে উদ্ভূত অসংখ্য সাংবিধানিক ও আইনি চ্যালেঞ্জেরও মোকাবিলা করছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাংবিধানিক বৈধতা, বিভিন্ন নতুন অধ্যাদেশ এবং পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের আইনি পর্যালোচনার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সর্বোচ্চ আদালতের কাঁধেই ন্যস্ত।
এছাড়াও, প্রধান বিচারপতির ঘোষিত ১২-দফা নির্দেশনা এবং বিচারপ্রার্থীদের অভিযোগ জানানোর জন্য 'হেল্পলাইন' চালুর মতো জনমুখী পদক্ষেপগুলো বিচার বিভাগের সেবার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। এই সংস্কারগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা এবং নতুন নিযুক্ত বিচারপতিদের (আগস্টে নিযুক্ত ২৫ জন) এই সংস্কার প্রক্রিয়ার সাথে সম্পূর্ণরূপে একীভূত করাও এই সভার অন্যতম উদ্দেশ্য।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ফুল কোর্ট সভা কেবল একটি প্রশাসনিক বৈঠক নয়, এটি স্বাধীন বিচার বিভাগের পথে বাংলাদেশের অভিযাত্রার একটি মাইলফলক। এই সভায় বিচারপতিদের সম্মিলিত প্রজ্ঞা, ঐক্য এবং সংস্কারের প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারই নির্ধারণ করে দেবে, প্রধান বিচারপতির ঘোষিত ‘নবযাত্রার বছর’ কতটা সফল হবে এবং বিচার বিভাগ জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণে কত দ্রুত তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে। মঙ্গলবার বিকেলের এই সভার দিকে তাই তাকিয়ে থাকবে পুরো জাতি।