শনিবার, ডিসেম্বর ১৩, ২০২৫
২৯ অগ্রহায়ণ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিদ্যুৎ খাতের ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হবে- রিজভী

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ নভেম্বর, ২০২৫, ০১:০০ পিএম

বিএনপি ক্ষমতায় এলে বিদ্যুৎ খাতের ইনডেমনিটি আইন বাতিল করা হবে- রিজভী
ছবি: UNB

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় ফিরলে দেশের বিদ্যুৎ খাতের বহুল বিতর্কিত ‘ইনডেমনিটি’ বা দায়মুক্তির বিধান বাতিল করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শনিবার এই ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, এই দায়মুক্তি আইনটি ব্যবহার করেই পূর্ববর্তী ‘ফ্যাসিস্ট শাসনামলে’ বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক দুর্নীতিকে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়েছিল এবং এর মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।

 

শনিবার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত "ক্যাব ইয়ুথ পার্লামেন্ট ২০২৫" শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে রুহুল কবির রিজভী এই জোরালো রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি জ্বালানি খাতের সংস্কার, নবায়নযোগ্য জ্বালানির অপরিহার্যতা এবং এ সংক্রান্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়েও দলের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন।

 

রুহুল কবির রিজভী তার ভাষণে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের জ্বালানি নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, "ফ্যাসিস্ট শাসনামলে জ্বালানি খাত থেকে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে। ইনডেমনিটি আইনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সেই টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।"

 

তিনি বলেন, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে পূর্ববর্তী সরকার জ্বালানি খাতে "লুটপাটের বন্যা" বইয়ে দিয়েছিল এবং এই ‘ইনডেমনিটি’ বিধানই পরবর্তী সময়ে আরও বড় আকারের দুর্নীতির পথ প্রশস্ত করে দেয়।

 

বিশ্লেষকদের মতে, রিজভী মূলত "বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০"-এর দিকেই ইঙ্গিত করেছেন। তীব্র বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার কথা বলে ২০১০ সালে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল, যা পরবর্তীকালে একাধিকবার মেয়াদ বাড়ানো হয়। এই বিশেষ আইনের অধীনে, বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রচলিত দরপত্র প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাওয়ার এবং এই প্রক্রিয়ায় জড়িত কর্মকর্তাদের আইনি সুরক্ষা (ইনডেমনিটি) দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছিল।

 

ক্যাবসহ বিভিন্ন ভোক্তা অধিকার সংগঠন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেমন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি), দীর্ঘদিন ধরেই এই আইনটিকে "কালো আইন" হিসেবে অভিহিত করে আসছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, এই আইনের সুযোগ নিয়ে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় অসংখ্য বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও সেগুলোকে বিপুল পরিমাণ অর্থ "ক্যাপাসিটি চার্জ" বা কেন্দ্র ভাড়া হিসেবে পরিশোধ করতে হয়েছে, যার সম্পূর্ণ বোঝা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর পড়েছে।

 

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও এই আইনটির বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। ২০২৪ সালের নভেম্বরে "বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, ২০২৪" জারি করা হয় এবং এই আইনের অধীনে স্বাক্ষরিত চুক্তিগুলো পর্যালোচনার জন্য একটি উচ্চ পর্যায়ের জাতীয় কমিটিও গঠন করা হয়।

 

তবে, রুহুল কবির রিজভীর আজকের বক্তব্য প্রমাণ করে যে, বিএনপি অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপকে যথেষ্ট মনে করছে না। তিনি বলেন, "বিএনপি এই ধরনের লুটপাটের বিরুদ্ধে দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়েছে। ক্ষমতায় এলে বিএনপি অবশ্যই এই ইনডেমনিটি বাতিল করবে।" তার এই অঙ্গীকার মূলত অধ্যাদেশটিকে স্থায়ীভাবে বাতিল করা এবং এই আইনের অধীনে সংঘটিত কথিত দুর্নীতির বিচার ও চুক্তিগুলো পর্যালোচনার একটি জোরালো রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

 

বিএনপির এই সিনিয়র নেতা তার ভাষণে দেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়েও কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং বাংলাদেশকে অবশ্যই এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে সর্বাত্মক মনোযোগ দিতে হবে।

 

পূর্ববর্তী সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, "আগের সরকার কখনো জনগণের জন্য জ্বালানির কথা ভাবেনি।" বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে রুহুল কবির রিজভী এক সতর্ক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিষয়ে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সদিচ্ছা ঠিক আছে বলেই মনে হয়, কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ড এখনো দৃশ্যমান নয়।"

 

বিশ্লেষকদের মতে, রিজভীর এই মন্তব্য অন্তর্বর্তী সরকারের সম্প্রতি অনুমোদিত "নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ২০২৫"-এর প্রতি ইঙ্গিত করে। সরকার এই নীতিমালায় ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও, সমালোচকরা বলছেন যে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীর এবং প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের রূপরেখা অস্পষ্ট।

 

রিজভী বলেন, দেশের জাতীয় গ্রিডে বর্তমানে মাত্র ৪.৭১ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে আসছে, যা অত্যন্ত নগণ্য। তিনি বলেন, "বিএনপির ৩১ দফা সংস্কার রূপরেখায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।" তিনি উল্লেখ করেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার বিভিন্ন বক্তৃতায় বারবার এই বিষয়টির ওপর আলোকপাত করেছেন।

 

রুহুল কবির রিজভী কেবল সমালোচনাই নয়, বিএনপি ক্ষমতায় এলে কী ধরনের পদক্ষেপ নেবে, তারও একটি রূপরেখা দেন। তিনি বলেন, বিএনপি পরিবেশগত বিষয়গুলোকে সবসময় গুরুত্বের সাথে দেখে। "বিএনপি সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর অঙ্গীকার করেছে," তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, "গাছ লাগানো ছাড়াও আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বারবার ২০,০০০ কিলোমিটার খাল, জলাভূমি এবং মরা নদীগুলোর নাব্য পুনরুদ্ধারের কথা বলেছেন।"

 

নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা নিয়ে রিজভী বলেন, বাংলাদেশকে সৌর ও বায়ু শক্তির বাইরেও বিকল্প উৎসের সন্ধান করতে হবে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, "ব্রাজিল যেভাবে আখ ও অন্যান্য উপজাত থেকে বায়োফুয়েল (জৈব জ্বালানি) উৎপাদন করে, বাংলাদেশও যদি তা করতে পারে, তবে এই খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন সম্ভব।"

 

তবে এই খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোও তিনি স্বীকার করেন। রুহুল কবির রিজভী বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সবচেয়ে বড় বাধা হলো বিনিয়োগ। তিনি অভিযোগ করেন, "আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রায়শই বিলম্বিত হয় বা আটকে যায়।" তিনি জোর দিয়ে বলেন, "নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে এগিয়ে নিতে হলে এই চ্যালেঞ্জগুলো অবশ্যই কাটিয়ে উঠতে হবে।"

 

সব মিলিয়ে, ক্যাব ইয়ুথ পার্লামেন্টের এই মঞ্চ থেকে রুহুল কবির রিজভী একদিকে যেমন পূর্ববর্তী সরকারের জ্বালানি নীতিকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করেছেন, তেমনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ধীরগতির সমালোচনা করে বিএনপিকে একটি সংস্কারমুখী ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।