বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পান্তা ভাতের অবিশ্বাস্য স্বাস্থ্য উপকারিতা

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৪:৫৩ পিএম

গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পান্তা ভাতের অবিশ্বাস্য স্বাস্থ্য উপকারিতা
ছবি : Collected

গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, তখন শরীরকে ভেতর থেকে শীতল ও সতেজ রাখতে বাঙালির এক ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন খাবারের নাম বারবার সামনে আসে; আর তা হলো পান্তা ভাত।

 

 আবহমানকাল ধরেই গ্রাম-বাংলার সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে কৃষিজীবীদের প্রতিদিনের সকালের প্রধান খাবার হিসেবে পান্তা ভাতের কদর অতুলনীয়। প্রখর রোদে সারাদিন মাঠে কঠোর পরিশ্রম করার জন্য প্রয়োজনীয় অফুরন্ত প্রাণশক্তি জোগাতে এই অতি সাধারণ অথচ পুষ্টিকর খাবারটি এক জাদুকরী ভূমিকা পালন করে আসছে।

 

বর্তমানে কেবল গ্রামেই নয়, বরং শহুরে জীবনের অনেক পরিবারেই প্রখর গরমের দিনে সরিষার খাঁটি তেল, কুঁচি করা পেঁয়াজ, ঝাল কাঁচামরিচ, সামান্য লবণ এবং ভাজা মাছের সুস্বাদু অনুষঙ্গের সাথে পান্তা ভাত খাওয়ার চমৎকার চল রয়ে গেছে।

 

বিশেষ করে বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখের মতো সার্বজনীন উৎসবগুলোতে পান্তা ও ইলিশ মাছের পরিবেশন যেন বাঙালি সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য এবং অত্যন্ত জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী আয়োজনে পরিণত হয়েছে, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সমাদৃত।

 

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে ঠান্ডা ও আর্দ্র রাখতে পান্তা ভাতের কোনো বিকল্প নেই। তবে শুধু শরীর শীতল রাখাই নয়, পুষ্টিবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সাধারণ পানিসিক্ত ভাতে লুকিয়ে রয়েছে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বেশ কিছু অবিশ্বাস্য স্বাস্থ্য উপকারিতা।

 

সাধারণত রান্না করা ভাত সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রাখার ফলে সেখানে এক ধরনের স্বাস্থ্যকর গাজন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভাতের ভেতরে থাকা পুষ্টিগুণ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পান্তা ভাতে প্রচুর পরিমাণে উপকারী অণুজীব তৈরি হয়।

 

এই উপকারী অণুজীবগুলো মানুষের অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে, হজমশক্তি বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে এবং সর্বোপরি শরীরের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে এক শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে সাহায্য করে।

 

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের বিস্তারিত গবেষণায় পান্তা ভাতের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে চমকপ্রদ সব বৈজ্ঞানিক তথ্য উঠে এসেছে। হলিক্রস মেডিকেল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ মাহিনুর ফেরদৌস এই খাবারটির নানাবিধ গুণাগুণ সম্পর্কে গভীরভাবে আলোকপাত করেছেন।

 

তিনি জানিয়েছেন, আধুনিক যান্ত্রিক জীবনে যারা দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য পান্তা ভাত একটি অত্যন্ত উপকারী ও প্রাকৃতিক ঔষধ হিসেবে কাজ করতে পারে। এই ভাত নিয়মিত গ্রহণ করলে স্নায়ু শান্ত হয় এবং গভীর ঘুমে সহায়তা করে।

 

এছাড়া তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, পান্তা ভাতে মানবদেহের জন্য অপরিহার্য বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অণু পুষ্টি উপাদান ভরপুর মাত্রায় বিদ্যমান রয়েছে। এর মধ্যে মানবদেহের জন্য অত্যন্ত জরুরি আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম, জিঙ্ক, ফসফরাস এবং ভিটামিন বি-৬ ও ভিটামিন বি-১২ এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, যা আমাদের সামগ্রিক সুস্থতা নিশ্চিত করে।

 

পুষ্টিবিদ মাহিনুর ফেরদৌস একটি সুনির্দিষ্ট ও তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরে জানান যে, পান্তা ভাতে সাধারণ গরম ভাতের তুলনায় খনিজ উপাদানের মাত্রা অভাবনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, ১০০ মিলিগ্রাম সাধারণ রান্না করা চালে যেখানে মাত্র ৩.৫ মিলিগ্রাম আয়রন উপস্থিত থাকে, সেখানে একই পরিমাণ চালের তৈরি পান্তা ভাতে আয়রনের পরিমাণ অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৭৩.৯ মিলিগ্রামে।

 

একইভাবে ক্যালসিয়ামের মতো হাড় গঠনে সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের পরিমাণও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। সাধারণ চালে যেখানে ২১ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম থাকে, সেখানে পান্তা ভাতে এর পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৮৫ মিলিগ্রাম পর্যন্ত হতে পারে।

 

এই বিপুল পরিমাণ আয়রন মানবদেহের রক্তশূন্যতা দূর করতে অত্যন্ত সহায়ক ভূমিকা পালন করে। পাশাপাশি, এতে পটাশিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম ও জিঙ্কের মাত্রাও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি পাওয়া যায়, যা হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে এবং পেশির গঠনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

 

পুষ্টিগত দিক থেকে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাধারণ গরম ভাতের তুলনায় পান্তা ভাতে চর্বির পরিমাণ অনেকটাই কম থাকে। ফলে যারা স্বাস্থ্য সচেতন এবং নিজেদের শরীরের অতিরিক্ত ওজন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, তাদের জন্য সকালের নাস্তায় এটি একটি আদর্শ, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে।

 

পান্তা ভাতকে চিকিৎসকরা শরীরের জন্য একটি চমৎকার প্রাকৃতিক শীতলকারী খাবার হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। গ্রীষ্মের কাঠফাটা রোদে এটি শরীরের তাপমাত্রাকে স্বাভাবিক ও সহনশীল মাত্রায় ধরে রাখতে বিস্ময়করভাবে সহায়তা করে।

 

শুধু তাই নয়, দীর্ঘ সময় ধরে নিরলসভাবে কর্মক্ষম থাকতে এবং শরীরে নিরবচ্ছিন্ন শক্তির জোগান দিতে এটি অত্যন্ত কার্যকর। পাশাপাশি, পর্যাপ্ত প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদানের উপস্থিতির কারণে মানুষের ত্বকের সতেজতা, উজ্জ্বলতা ও তারুণ্য দীর্ঘকাল ধরে রাখতেও পান্তা ভাত বিশেষ সহায়ক বলে মনে করা হয়।

 

তাই প্রচণ্ড গরমের এই প্রতিকূল সময়ে সকালের শুরুতে সামান্য সরিষার তেল, পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ ও লবণের সাথে এক প্লেট পান্তা ভাত হতে পারে প্রতিদিনের স্বাদ, তৃপ্তি ও সুস্থতার এক অনন্য ও দারুণ সমন্বয়।