বৃহস্পতিবার, জুলাই ২, ২০২৬
১৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে

বিবাহসূত্রে যেসব দেশের বৈধ নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ রয়েছে

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ০১ জুলাই, ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম

বিবাহসূত্রে যেসব দেশের বৈধ নাগরিকত্ব লাভের সুযোগ রয়েছে
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে মানুষের পারস্পরিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি অত্যন্ত সাবলীল এবং স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।

 

জন্মসূত্রে একটি নির্দিষ্ট দেশের নাগরিক হলেও উন্নততর জীবনযাপন, উচ্চশিক্ষা, পেশাগত সমৃদ্ধি কিংবা নির্বিঘ্ন বিশ্বভ্রমণের সুবিধার্থে অনেকেই একাধিক দেশের নাগরিকত্ব লাভের গভীর আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে থাকেন।

 

এর পাশাপাশি, বিদেশে অবস্থানকালে ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার মানুষের সঙ্গে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বপূর্ণ বা প্রগাঢ় প্রেমের সম্পর্ক অনেক সময়ই পরিণয়ে রূপ নেয়। আন্তর্জাতিক অভিবাসন ও আইনি কাঠামো অনুযায়ী, বিশ্বের বেশ কিছু আধুনিক রাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের সঙ্গে আইনিভাবে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বিদেশি নাগরিকদের অত্যন্ত সহজ ও বৈধ প্রক্রিয়ায় স্থায়ী নাগরিকত্ব প্রদানের সুযোগ দিয়ে থাকে।

 

বৈশ্বিক অভিবাসন ও নাগরিকত্ব বিষয়ক প্রখ্যাত গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল সিটিজেন সলিউশনস এবং নোম্যাড ক্যাপিটালিস্টের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এমন কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দেশের অভিবাসন নীতির বিস্তারিত দিকগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা হলো, যা বিবাহসূত্রে নাগরিকত্ব লাভের পথকে সুগম করে।

 

ইউরোপ ও এশিয়ার ঐতিহাসিক সংযোগস্থলে অবস্থিত তুরস্ক বিবাহসূত্রে নাগরিকত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে একটি অন্যতম আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে বিশ্বব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছে। দেশটির প্রচলিত আধুনিক অভিবাসন আইন অনুসারে, কোনো বিদেশি নাগরিক যদি একজন তুর্কি নাগরিককে আইনসম্মতভাবে বিয়ে করেন এবং তারা একত্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে তিন বছর দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করেন, তবে ওই বিদেশি নাগরিক তুরস্কের স্থায়ী নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করার পূর্ণ যোগ্যতা অর্জন করেন।

 

এই নাগরিকত্ব লাভের একটি প্রধান ও উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ হলো তুরস্কের শক্তিশালী পাসপোর্ট, যার মাধ্যমে বিশ্বের একশরও বেশি দেশে কোনো পূর্বানুমোদন ছাড়াই কিংবা গন্তব্যে পৌঁছানোর পর তাৎক্ষণিক ভিসার সুবিধায় ভ্রমণের অবারিত সুযোগ পাওয়া যায়।

 

অন্যদিকে, দক্ষিণ ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ, সমৃদ্ধ ও প্রভাবশালী রাষ্ট্র স্পেনের অভিবাসন নিয়মকানুন অত্যন্ত সহজ, সাবলীল ও আবেদনকারী-বান্ধব। স্প্যানিশ অভিবাসন ও নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী, স্পেনের কোনো বৈধ নাগরিকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর মাত্র এক বছর একত্রে বসবাসের দালিলিক প্রমাণ দাখিল করতে পারলেই স্প্যানিশ নাগরিকত্বের জন্য আইনিভাবে আবেদন করা সম্ভব হয়।

 

এই প্রক্রিয়ার জন্য মূলত বৈধ বিবাহের আনুষ্ঠানিক সনদ এবং একত্রে বসবাসের উপযুক্ত প্রমাণের প্রয়োজন হয়। স্পেনের নাগরিকত্ব লাভ করলে তা ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যান্য সুবিধার পাশাপাশি লাতিন আমেরিকা বা পর্তুগালের মতো দেশের ক্ষেত্রে দ্বৈত নাগরিকত্বের এক অনন্য সুযোগ তৈরি করে, যা বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে ব্যক্তির আইনি অধিকারকে আরও সম্প্রসারিত করে।

 

লাতিন আমেরিকার দুই বৃহৎ ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র আর্জেন্টিনা এবং মেক্সিকো বিবাহসূত্রে নাগরিকত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে প্রায় সমধর্মী এবং তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য আইনি কাঠামো অনুসরণ করে থাকে।

 

আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে নিয়মটি হলো, কোনো বিদেশি ব্যক্তি সে দেশের নাগরিককে আইনিভাবে বিয়ে করার পর মাত্র দুই বছর অতিবাহিত হলেই স্থায়ী নাগরিকত্বের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে পারেন।

 

তবে এই স্পর্শকাতর আবেদনের ক্ষেত্রে বৈধ বিবাহের দালিলিক প্রমাণের পাশাপাশি আবেদনকারীর কোনো পূর্ববর্তী অপরাধমূলক রেকর্ড না থাকার সরকারি প্রশংসাপত্র এবং স্থানীয় স্প্যানিশ ভাষায় সাধারণ যোগাযোগের পর্যাপ্ত দক্ষতার প্রমাণ প্রদান করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মেক্সিকোর অভিবাসন নীতিও প্রায় একই ধরনের শর্তাবলি ধারণ করে।

 

একজন মেক্সিকান নাগরিককে বিয়ে করে তার সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে দুই বছর বসবাসের পর আইনিভাবে মেক্সিকোর নাগরিকত্ব দাবি করা যায়। মেক্সিকোর ক্ষেত্রেও আবেদনকারীকে স্প্যানিশ ভাষার মৌলিক ও প্রায়োগিক জ্ঞান, আইনিভাবে সম্পন্ন বিয়ের বৈধ সনদ এবং দেশে একত্রে বসবাসের অকাট্য প্রমাণপত্র যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করতে হয়।

 

ইউরোপের অন্যতম অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং কঠোর অভিবাসন নীতির দেশ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত সুইজারল্যান্ডও বিবাহসূত্রে নাগরিকত্ব লাভের একটি সুনির্দিষ্ট, স্বচ্ছ ও বৈধ পথ উন্মুক্ত রেখেছে।

 

দেশটির আইনি কাঠামো অনুযায়ী, কোনো বিদেশি নাগরিক যদি একজন সুইস নাগরিককে বিয়ে করেন, তবে তিন বছর একত্রে বসবাসের পর এবং সামগ্রিকভাবে দেশটিতে বৈধভাবে পাঁচ বছর অবস্থান করার শর্ত পূরণের মাধ্যমে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারবেন।

 

এমনকি তারা যদি ব্যক্তিগত বা পেশাগত কারণে সুইজারল্যান্ডের বাইরেও অবস্থান করেন, সেক্ষেত্রে বৈবাহিক সম্পর্কের সফল ছয় বছর পূর্ণ হওয়ার পর এই আবেদন করার সুযোগ অটুট থাকে। সুইস নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ার একটি বড় সুবিধা হলো এটি সাধারণত খুব দ্রুত সম্পন্ন হয়।

 

তবে এর জন্য দেশটির নিজস্ব ভাষা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, ইতিহাস ও সামাজিক মূল্যবোধ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। একইসঙ্গে আবেদনকারীর নিষ্কলুষ আইনি অতীত এবং দাম্পত্য সম্পর্কের ধারাবাহিকতার বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ থাকা বাঞ্ছনীয়।

 

এই দেশের নাগরিকত্ব একবার লাভ করতে পারলে তা সমগ্র ইউরোপে স্বাধীনভাবে বসবাস ও কাজ করার এক বিশাল দরজা উন্মুক্ত করে দেয়। এছাড়া, আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে অবস্থিত এবং পশ্চিম আফ্রিকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য লীলাভূমি হিসেবে পরিচিত দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্ড বিবাহসূত্রে অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে নাগরিকত্ব প্রদান করে থাকে।

 

আইনিভাবে সে দেশের কোনো স্থায়ী নাগরিকের সঙ্গে বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার ঠিক পরপরই একজন বিদেশি নাগরিক স্থায়ী নাগরিকত্বের জন্য আনুষ্ঠানিক আবেদন করার অধিকার লাভ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের এই আইনি ও কাঠামোগত সহজ প্রক্রিয়াগুলো বিশ্বব্যাপী আন্তঃদেশীয় বৈবাহিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থাকে বর্তমানে আরও বেশি গতিশীল, মানবিক ও যুগোপযোগী করে তুলেছে।