আধুনিক জীবনযাত্রার এই নেতিবাচক এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব নিয়ে যখন চারদিকে তীব্র হতাশা বিরাজ করছে, ঠিক তখনই বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ও যুগান্তকারী তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষকরা নিবিড় পর্যালোচনার পর অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে দাবি করেছেন যে, ডিজিটাল বা প্রযুক্তিগত আসক্তির ফলে সৃষ্ট এই মানসিক ও শারীরিক ক্ষতিগুলো কোনোভাবেই স্থায়ী নয়। বরং মুঠোফোনের ইন্টারনেট সংযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখলে বা এর ব্যবহার কমিয়ে আনলে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই মানুষের হারানো মানসিক স্বাস্থ্য এবং মনোযোগের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় ফিরিয়ে আনা সম্পূর্ণভাবে সম্ভব।
আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞান সাময়িকী ‘পিএনএএস নেক্সাস’-এ সম্প্রতি প্রকাশিত একটি বৃহৎ ও বিস্তারিত গবেষণাপত্রে এই ইতিবাচক তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ওই গবেষণায় চার শতাধিক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনন্দিন প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর দুই সপ্তাহব্যাপী একটি নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হয়।
গবেষণার স্বার্থে অংশগ্রহণকারীদের মুঠোফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘ফ্রিডম’ নামের একটি বিশেষায়িত অ্যাপ্লিকেশনের সাহায্য নেওয়া হয়। এই দুই সপ্তাহ তাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার এবং সাধারণ ইন্টারনেট ব্রাউজিং সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।
তবে জরুরি প্রয়োজনে তাদের সাধারণ ভয়েস কল বা খুদে বার্তা আদান-প্রদানের মৌলিক সুবিধাটি চালু রাখা হয়েছিল। এই নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে দেখা যায়, ওই ব্যক্তিদের প্রতিদিন মুঠোফোনের পর্দায় কাটানো গড় সময় পাঁচ ঘণ্টা থেকে কমে তিন ঘণ্টারও নিচে নেমে এসেছে।
গবেষণার নির্ধারিত সময় শেষে প্রাপ্ত ফলাফল ছিল আক্ষরিক অর্থেই অভাবনীয়। দেখা গেছে, ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকা অংশগ্রহণকারীদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা, চিন্তার গভীরতা এবং সামগ্রিক মানসিক সুস্থতায় এক অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই উন্নতির মাত্রা এতটাই ব্যাপক ও গভীর ছিল যা মানুষের প্রায় এক দশকের বয়সজনিত মানসিক ও বুদ্ধিভিত্তিক অবনতিকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার সমতুল্য। আরও একটি অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য যুগান্তকারী তথ্য হলো-প্রযুক্তিগত জগৎ থেকে এই সাময়িক দূরত্ব বা বিরতি মানুষের বিষণ্ণতা কমানোর ক্ষেত্রে বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন বিষণ্ণতা নিরোধক ওষুধের চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
এমনকি এটি মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসায় ব্যবহৃত অত্যন্ত জনপ্রিয় ও বিজ্ঞানসম্মত ‘আচরণগত চিকিৎসা পদ্ধতি’ বা কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপির সমান সুফল প্রদান করেছে। সবচেয়ে স্বস্তির বিষয় হলো, এই অভাবনীয় সুফল পেতে অংশগ্রহণকারীদের দৈনন্দিন জীবন থেকে সম্পূর্ণভাবে প্রযুক্তিকে বর্জন করতে হয়নি, বরং তারা কেবল মুঠোফোনের ইন্টারনেট সংযোগ থেকে নিজেদের দূরে রেখেই এই অসাধারণ পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন।
গবেষকরা তাদের বিশ্লেষণে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহৃত ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের চেয়ে স্মার্টফোনকেই মানুষের মনোযোগ ও মানসিক প্রশান্তির সবচেয়ে বড় অন্তরায় হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এর প্রধান কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেছেন যে, মুঠোফোন সারাক্ষণ মানুষের হাতের নাগালে থাকে।
ফলে পরিবারের সাথে খাবার খাওয়া, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া কিংবা অবসরে সিনেমা দেখার মতো একান্ত ব্যক্তিগত মুহূর্তগুলোতেও এটি বারবার মানুষের মনোযোগ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত করে। এই তাৎপর্যপূর্ণ গবেষণার ফলাফল এমন এক সংকটময় সময়ে প্রকাশ্যে এলো, যখন বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আসক্তি তৈরির অভিযোগে বিভিন্ন দেশে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে।
অতি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের একটি জুরি বোর্ড মেটা ও ইউটিউবের মতো বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্ল্যাটফর্মের চরম আসক্তিমূলক নকশার জন্য দায়ী সাব্যস্ত করেছে এবং এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এক তরুণকে বিপুল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ প্রদানের ঐতিহাসিক নির্দেশ দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’ এবং বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা বিষয়ক সাময়িকী ‘জামা নেটওয়ার্ক ওপেন’-এর মতো স্বনামধন্য প্রকাশনাগুলোও এই গবেষণার মূল সুরের সাথে একমত পোষণ করে সমর্থন জানিয়েছে।
তাদের প্রকাশিত বিস্তারিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র এক সপ্তাহ স্মার্টফোনের ব্যবহার পরিমিত পর্যায়ে নিয়ে এলে মানুষের ভেতরের প্রবল উদ্বেগ, গভীর বিষণ্ণতা এবং অনিদ্রার মতো জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার কমানোর মতো ছোট একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগও মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
পরিশেষে সার্বিক আলোচনা থেকে এটিই প্রমাণিত হয় যে, প্রযুক্তিগত আসক্তির এই ক্ষতিকর চক্র ভেঙে বাস্তব জীবনের প্রকৃত অভিজ্ঞতা, পারিবারিক সম্পর্ক এবং মানসিক প্রশান্তির মান বাড়াতে দৈনন্দিন জীবনে ডিজিটাল জগৎ থেকে একটি নিয়ন্ত্রিত ও সাময়িক বিরতি গ্রহণ করা এখন বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় ও জরুরি দাবি।