তিনি বলেছেন, আপাতদৃষ্টিতে এই বিশাল আকারের বাজেটকে স্বপ্নবিলাসী ও উচ্চাভিলাষী মনে হলেও এটি মূলত বাংলাদেশকে এক অভাবনীয় নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এবং একটি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর রাষ্ট্র গঠনের পথ সুগম করবে।
বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের চলমান বাজেট অধিবেশনে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। আইনমন্ত্রী তার বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, অতীতের বাজেটগুলো সংসদে উপস্থাপনের পরপরই প্রায়শই ‘গরিব মারার বাজেট’ কিংবা ‘ধনী তোষণের বাজেট’ হিসেবে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ত।
কিন্তু এবারের বাজেট ঘোষণার পর দেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে সে ধরনের কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি জানান, এই বাজেটে দেশের গরিব, মধ্যবিত্ত, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, সৎ ব্যবসায়ী এবং কর্মপ্রত্যাশী বিপুল তরুণ সমাজের সার্বিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন দর্শনের ধারাবাহিকতায় অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে এটি প্রণয়ন করা হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলে যারা সমালোচনা করছেন, তাদের জবাবে মন্ত্রী দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, যে জাতি বড় স্বপ্ন দেখতে পারে না, তাদের পক্ষে কোনো অবস্থাতেই কাঙ্ক্ষিত জাতীয় অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব নয়।
বাজেটের বিভিন্ন খাতভিত্তিক বরাদ্দের ইতিবাচক দিকগুলো অত্যন্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরে আইনমন্ত্রী জানান, দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি কৃষি খাতে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি অব্যাহত রাখা হয়েছে।
কৃষকদের নিরবচ্ছিন্ন সহায়তা প্রদান এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে সরাসরি সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় পারিবারিক সহায়তা কর্মসূচির পরিধি আরও সম্প্রসারিত করার যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
শিক্ষা খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি অত্যন্ত গঠনমূলক মত প্রকাশ করে বলেন, সরকার এখন কেবল পুঁথিগত ও সনদনির্ভর শিক্ষার পরিবর্তে আধুনিক, কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর সর্বাধিক জোর দিচ্ছে।
এই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার মান উন্নয়নে বাজেটে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, যুব উন্নয়ন এবং দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে নদী ও খাল পুনঃখনন এবং ব্যাপক পরিসরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি হাতে নেওয়ার কথা তিনি সংসদকে অবহিত করেন। সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়েও মন্ত্রী অত্যন্ত খোলামেলা ও বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা করেন।
তিনি অকপটে স্বীকার করেন যে, বর্তমান সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে, তখন অর্থপাচার, ব্যাংক খাতের চরম ভঙ্গুরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতার মতো বহুমুখী ও জটিল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছিল।
তা সত্ত্বেও সরকার একটি অত্যন্ত বাস্তবমুখী, জনকল্যাণকর ও উন্নয়নবান্ধব বাজেট প্রণয়নে সক্ষম হয়েছে। এই বাজেটে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, জনবান্ধব কর-সুবিধা সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
ব্যাংক খাতে হারানো শৃঙ্খলা দ্রুত ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষের কষ্টার্জিত আমানতের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন তিনি। পরিশেষে তিনি বলেন, দেশের সম্পদ লুণ্ঠন ও অর্থপাচারনির্ভর অর্থনীতির চিরস্থায়ী অবসান ঘটিয়ে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং মানবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এই বাজেটের মূল লক্ষ্য।