একই সঙ্গে এই জঘন্য অপরাধের কারণে তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড এবং জরিমানার টাকা অনাদায়ে আরও এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বুধবার চট্টগ্রামের ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস জনাকীর্ণ আদালতে আসামির উপস্থিতিতে এই যুগান্তকারী রায় ঘোষণা করেন।
আদালত এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডকে সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত, অত্যন্ত নিষ্ঠুর, অমানবিক এবং সমাজে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টিকারী একটি কাজ বলে নিজেদের পর্যবেক্ষণে তুলে ধরেছেন।
বিচারক তার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, আসামি টেলিভিশনের একটি জনপ্রিয় অপরাধমূলক অনুষ্ঠান থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এই ধরনের নৃশংস অপরাধ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিল, যা সমাজের জন্য একটি গভীর চিন্তার বিষয়।
চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের সহকারী সরকারি কৌঁসুলি মোহাম্মদ রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী রায়ের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে জানান, আসামির নিজের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, সুরতহাল প্রতিবেদন, চিকিৎসকদের ময়নাতদন্তের ফল, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া আলামত এবং আদালতে উপস্থিত সাক্ষীদের নিখুঁত বর্ণনার ভিত্তিতে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
রাষ্ট্রপক্ষের আরেক সরকারি কৌঁসুলি জালাল উদ্দিন নিশ্চিত করেছেন যে, মামলাটির স্বচ্ছ বিচারকাজ চলাকালীন সময়ে মোট ৩৩ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে এবং দীর্ঘ যুক্তিতর্ক পর্যালোচনার পরেই আদালত এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পটভূমি থেকে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রামের ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার মেয়ে শিশু আয়াত হঠাৎ করেই নিখোঁজ হয়।
এই ঘটনার পর উদ্বিগ্ন পরিবারের পক্ষ থেকে স্থানীয় থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হলে পুলিশের বিশেষ তদন্তকারী সংস্থা দ্রুততার সঙ্গে ঘটনার ছায়া তদন্ত শুরু করে।
তদন্তের এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে এক ভয়ংকর ও মর্মান্তিক তথ্য। মূলত মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে তাদেরই বাসার ভাড়াটে আবির শিশুটিকে সুকৌশলে অপহরণ করেছিল।
কিন্তু সেই ঘৃণ্য পরিকল্পনা কোনো কারণে ব্যর্থ হলে সে চরম নির্মমতার পথ বেছে নেয় এবং আয়াতকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। এরপর নিজের অপরাধ আড়াল করতে এবং প্রমাণ পুরোপুরি লোপাট করার উদ্দেশ্যে শিশুটির খণ্ডিত মরদেহ সাগরপাড় এবং পাশের একটি নির্জন খালে ফেলে দেয় সে।
নিখোঁজ হওয়ার দশ দিন পর, ২৫ নভেম্বর তদন্তকারী দলের সদস্যরা আবিরকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হন এবং পরবর্তীতে আদালতে সে নিজের সব অপরাধ অকপটে স্বীকার করে আইনি জবানবন্দি প্রদান করে।
দীর্ঘ ও নিবিড় তদন্তের পর ২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর তদন্তকারী পরিদর্শক মনোজ দে আদালতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র জমা দেন। এই অমানবিক অপরাধে মো. আবিরের পাশাপাশি তার সতেরো বছর বয়সী এক কিশোর বন্ধুকেও আসামি করা হয়েছিল।
তবে সে আইন অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তার বিচারকাজ বর্তমানে আলাদাভাবে শিশু আদালতে চলমান রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই রায়ের মধ্য দিয়ে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।