দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে সাময়িকভাবে হলেও গৃহহীন এই মানুষগুলোর দৈনন্দিন জীবনযাপন কার্যত থমকে গেছে।
বসতঘর, শৌচাগার ও রান্নাঘর হঠাৎ করে বিশাল মাটির স্তূপে চাপা পড়ায় চরম মানবেতর ও অবর্ণনীয় জীবন পার করছেন এখানকার খেটে খাওয়া অধিবাসীরা। প্রকল্প এলাকার বাসিন্দা তপতি দাস ও মুন্নি বেগমের কণ্ঠে এই আকস্মিক দুর্ভোগের চরম হতাশা ও কষ্টের সুর স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
গণমাধ্যমের কাছে নিজেদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে তারা জানান, এলাকার শৌচাগারগুলো পুরোপুরি মাটিতে পূর্ণ হয়ে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে গেছে। রান্নাঘর ভেঙে পড়ায় বাধ্য হয়ে বাইরে খোলা আকাশের নিচে ইট পেতে রান্নার কাজ সারতে হচ্ছে তাদের।
প্রকৃতির বিরূপ আচরণে বৃষ্টির সময় এই বিকল্প ব্যবস্থাও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, ফলে ক্ষুধার্ত শিশুদের মুখে ঠিকমতো দুই বেলা খাবার তুলে দেওয়া তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আর্থিক অনটনের কারণে দিনমজুর বা শ্রমিক রেখে মাটি সরানোর ন্যূনতম সামর্থ্যও তাদের নেই। পরিবারের অসুস্থ সদস্য ও ছোট সন্তানদের নিয়ে অসহায় নারীরা নিজেরাই মাটি সরানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
আরেক ভুক্তভোগী বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জানান, গত জানুয়ারি মাস থেকেই নদী খননের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে হঠাৎ করেই প্রকল্প এলাকায় বিশাল মাটির পাহাড় তৈরি করা হয়েছে।
ভারী খননযন্ত্রের প্রচণ্ড কম্পনে দুর্বল ঘরগুলো কেঁপে ওঠে এবং মাটির অতিরিক্ত চাপে ইতোমধ্যে অনেক ঘরের দেয়াল ফেটে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় এই তীব্র গরমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।
বেবি বেগম ও চামেলী দাসের মতো অন্যান্য বাসিন্দারা জানান, একদিকে ঘরের চালে ফাটল, অন্যদিকে তীব্র গরম এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে শিশু ও বয়স্করা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন।
পেটে কঠিন রোগ নিয়েও মাটি সরানোর কাজ করতে হচ্ছে কাউকে কাউকে। বিদ্যুতের অভাবে এবং বাসস্থানের এমন শোচনীয় অবস্থার কারণে শিশুদের পড়াশোনাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এ বিষয়ে ডুমুরিয়ার আটলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বেলাল হোসেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আশ্বস্ত করে জানান, বরাতিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের মোট ১২৫টি ঘরের মধ্যে অন্তত ১০টি ঘর মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে স্থানীয় ও জেলা প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপে ইতোমধ্যে মাটি অপসারণের কাজ পুরোদমে শুরু হয়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত ঘরগুলো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মঙ্গলবার খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত সশরীরে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
তিনি উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, মূলত যশোর-ভবদহ ও খুলনা অঞ্চলের দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ভদ্রাসহ কয়েকটি নদী খননের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে চলছে।
বৃহত্তর জনস্বার্থে পরিচালিত এই মেগা প্রকল্পের কারণে যেসব সাধারণ সুফলভোগী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, সরকার ও প্রশাসন তাদের পাশে রয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়াসহ যাবতীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এই বিশাল প্রকল্পের আওতায় ভদ্রাসহ ছয়টি নদীর প্রায় সাড়ে ৮১ কিলোমিটার অংশ খনন করা হচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে নদী তীরবর্তী এলাকার শত শত ছিন্নমূল পরিবার বর্তমানে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও গভীর সংকটের সম্মুখীন হয়েছেন।