পরিস্থিতি এমন একটি সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছায় যে, স্পিকারের বারবার হস্তক্ষেপ এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, চিফ হুইপসহ জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্যদের দফায় দফায় ব্যাখ্যার পর সংসদের পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়। ধর্মীয় অনুভূতির মতো স্পর্শকাতর বিষয় সংসদে উত্থাপিত হওয়ায় ঘটনাটি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্পিকার পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত অংশটি নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখার আনুষ্ঠানিক আশ্বাস দিয়েছেন। ঘটনার সূত্রপাত হয় বুধবার জাতীয় সংসদের নির্ধারিত বাজেট আলোচনায়।
এদিন বিতর্কে অংশ নিয়ে কক্সবাজার-২ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ বিরোধী দলের রাজনৈতিক আচরণ ও নানামুখী কৌশলের কঠোর সমালোচনা করেন।
এই সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি আরবি ভাষায় পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দেন। সংসদ অধিবেশনে তিনি বলেন, আল্লাহ নিজেই সর্বশ্রেষ্ঠ কৌশলী এবং যারা আল্লাহর বান্দাদের বিরুদ্ধে কিংবা অন্যায্য কৌশল প্রয়োগ করে, তাদের পরিণতি অত্যন্ত শোচনীয় হয়।
তিনি তার বক্তব্যের পরিধিতে আরও যুক্ত করেন, যারা সরকারের উন্নয়নমূলক ও জনমুখী কর্মকাণ্ডকে স্বীকার না করে রাস্তায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে, তাদের কঠিন আজাবের সম্মুখীন হতে হবে। মূলত কোরআনের আয়াতকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার এই চেষ্টার পরই সংসদে আকস্মিক উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে।
সরকারি দলের ওই সংসদ সদস্যের বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ জানান জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন।
তিনি অভিযোগ করেন যে, বাজেট বক্তৃতায় সরকারি দলের সংসদ সদস্য কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করে যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়েছেন, তা পবিত্র ধর্মগ্রন্থের স্পষ্ট অপব্যাখ্যা এবং এটি একধরনের ঠাট্টা-বিদ্রুপের শামিল। তিনি বিষয়টিকে অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত বলে আখ্যায়িত করেন।
তিনি বলেন, সরকারের প্রশংসা করলে তারা সুযোগ-সুবিধা বাড়িয়ে দেবেন আর না করলে দমন-পীড়ন চালাবেন-এমন একটি রাজনৈতিক বার্তা দিতে গিয়ে পবিত্র কোরআনের সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বিগত শাহবাগ আন্দোলনের সময়কার একটি ঐতিহাসিক ঘটনার কথা স্মরণ করেন।
মোমেন জানান, সে সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছে কোরআনের অবমাননা সংক্রান্ত একটি চিঠি নিয়ে যাওয়া হলে তিনি সূরা তাওবার একটি আয়াত উল্লেখ করে সতর্ক করেছিলেন যে, আল্লাহর আয়াত নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করার পরিণাম হবে জাহান্নাম।
কোরআনের ভুল ব্যাখ্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না জানিয়ে তিনি এ বিষয়ে স্পিকারের জরুরি ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করেন। বিরোধী দলের এই তীব্র আপত্তির জবাবে স্পিকার সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ একজন অত্যন্ত প্রবীণ ও অভিজ্ঞ সংসদ সদস্য।
তিনি পবিত্র কোরআন বা হাদিস নিয়ে জেনেশুনে কোনো ধরনের ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে মনে হয় না। তবে বিষয়টি যেহেতু অত্যন্ত সংবেদনশীল, তাই তিনি এটি পরীক্ষা করে দেখার সুস্পষ্ট আশ্বাস দেন।
স্পিকার জানান, যদি যাচাই-বাছাইয়ের পর দেখা যায় যে সত্যিই কোনো ভুল ব্যাখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তা সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে বিধি মোতাবেক বাদ দেওয়া হবে। তিনি সদস্যদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, বাংলাদেশ একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং এখানে কোরআন-হাদিসের ভুল ব্যাখ্যা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
পরবর্তীতে এই বিতর্কে অংশ নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নেন। তিনি জানান, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোরআনের ভুল ব্যাখ্যার যে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে, তা দেশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে একটি ভুল ও নেতিবাচক বার্তা পৌঁছাতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে জানান যে, আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ নিজে একজন বিজ্ঞ আলেম এবং মাদ্রাসার সাবেক ছাত্র। তিনি সম্পূর্ণ সৎ উদ্দেশ্যেই কথাটি বলেছেন। তার মূল বক্তব্য ছিল, আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করলে তিনি তা বাড়িয়ে দেন, আর অকৃতজ্ঞ হলে আজাব নেমে আসতে পারে।
বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে পয়েন্ট অব অর্ডার তোলা মোটেও সমীচীন হয়নি বলে তিনি বিরোধী দলের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন, ৯২ ভাগ মুসলমানের এই দেশে সরকার নিজেও ইসলামের সামান্যতম অবমাননা সহ্য করবে না, তবে এক্ষেত্রে অবমাননার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ব্যাখ্যার পরও বিতর্ক থামেনি; বরং বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান দাঁড়িয়ে এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আয়াতের নাজিল হওয়ার মূল প্রেক্ষাপটকে আড়াল করে বিষয়টিকে সম্পূর্ণ দলীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
তিনি বলেন, আল্লাহ এই দুনিয়ায় অগণিত নেয়ামত দিয়েছেন যা গণনা করে শেষ করা যায় না এবং মানুষের উচিত সেই শক্তি দিয়ে আল্লাহর বিধিনিষেধের পক্ষে কথা বলা। তার অভিযোগ, সরকারি দল তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে এটাই বোঝাতে চাইছে যে, বিরোধী দল যদি সরকারের এই বাজেটের প্রশংসা না করে, তবে তাদের ওপর আল্লাহর আজাব নেমে আসবে।
এই ধরনের মনগড়া রাজনৈতিক ব্যাখ্যার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি প্রয়োজনে কোনো নিরপেক্ষ আলেম বা ইসলামী বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করার জোর দাবি জানান। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হতে শুরু করলে স্পিকার আবারও সদস্যদের শান্ত হওয়ার নির্দেশ দেন এবং স্মরণ করিয়ে দেন যে ট্রেজারি বেঞ্চেও অনেক মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিত আলেম রয়েছেন।
এই পর্যায়ে সরকারি দলের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান বিতর্কে অংশ নিয়ে আলেম-ওলামাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, পবিত্র কোরআনের আয়াতেই বলা হয়েছে যে আমরা শুনলাম এবং তা পালন করলাম। তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান, যা সঠিক, সবার উচিত তার ওপর আমল করা এবং সেই আমলের মধ্য দিয়ে পরিশুদ্ধতা অর্জন করা।
সবশেষে চলমান এই দীর্ঘ বিতর্কের অবসান ঘটাতে সংসদে বক্তব্য রাখেন চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মণি। তিনি স্পিকারের মাধ্যমে সকল সংসদ সদস্যের প্রতি সংসদীয় শিষ্টাচার বজায় রাখার অনুরোধ জানান।
তিনি বলেন, আমরা সবাই যেহেতু আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী এবং অভিযুক্ত সদস্য মাহফুজুল্লাহ সাহেব নিজে একজন আলেম, তাই তিনি কোনো ব্যঙ্গাত্মক বা পরিহাসের উদ্দেশ্যে এই কথা বলেননি।
বরং সকলের আমলকে আরও বিশুদ্ধ এবং শক্তিশালী করার জন্যই তিনি হৃদয় খুলে কথাটি বলেছেন। তার এই গঠনমূলক বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংসদে কোরআনের আয়াত কেন্দ্রিক এই উত্তপ্ত বিতর্কের পরিসমাপ্তি ঘটে।