শুক্রবার, জুন ২৬, ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ১৩০০ উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমান প্রশাসনের জন্য বিশাল দায়

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ০১:৫৫ পিএম

বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ১৩০০ উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমান প্রশাসনের জন্য বিশাল দায়
ছবি: সংগৃহীত

বিগত সরকারের আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত প্রায় এক হাজার তিনশত উন্নয়ন প্রকল্পকে বর্তমান সরকারের জন্য এক বিশাল দায় বা বোঝা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

 

বৃহস্পতিবার, পঁচিশে জুন, ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্সে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত 'বাজেট ও এর ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা' শীর্ষক এক বিশেষ সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই মন্তব্য করেন।

 

দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি বিগত সরকারের নেওয়া এই প্রকল্পগুলোর তীব্র সমালোচনা করেন। অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, অবকাঠামো ও উন্নয়ন খাতের এই বিপুলসংখ্যক প্রকল্পের কাজ অর্ধেক বা তারও বেশি শেষ হয়ে যাওয়ার কারণে চাইলেও এগুলোকে এখন পুরোপুরি বাতিল করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

তিনি বলেন, বিগত পনেরো বছরে নেওয়া এই প্রকল্পগুলো বর্তমান বাস্তবতায় গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই প্রকল্পগুলোর ধরন ও প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন মহল অবগত আছেন এমন ইঙ্গিত করে তিনি জানান, সরকার বাধ্য হয়ে কিছু প্রকল্প বাতিল করতে সক্ষম হলেও সবগুলোর ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না।

 

ফলে এগুলোকে বাদ দেওয়া বা বাস্তবায়ন করা-উভয় ক্ষেত্রেই সরকারকে চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বর্তমান সরকারকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে সৃষ্ট বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং তাৎক্ষণিক অর্থায়নের মতো নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে বলে অর্থমন্ত্রী জানান।

 

তবে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও গতানুগতিক চিন্তাধারা থেকে বেরিয়ে এসে সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বাজেটের মূল দর্শনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য হলো অর্থনীতির গণতন্ত্রীকরণ।

 

বিগত বছরগুলোতে দেশের অর্থনীতি মূলত গুটিকয়েক সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত হয়েছিল। ফলে সাধারণ ও প্রান্তিক মানুষ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বাইরে থেকে গিয়েছিল। সরকার এখন প্রান্তিক পর্যায়ের কামার, কুমার, কুটির শিল্পী, তাঁতি, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং গ্রামীণ নারীদের অর্থনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে বদ্ধপরিকর।

 

গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে পরিবার কার্ড চালুর পাশাপাশি কৃষকদের জন্য বিশেষ কৃষক কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথা জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কৃষকদের পক্ষে তা পরিশোধ করা প্রায়শই অসম্ভব হয়ে পড়ে, যার প্রমাণ হিসেবে অতীত সরকারের রেখে যাওয়া দশ হাজার কোটি টাকার কৃষি ঋণ মওকুফের বিষয়টি তিনি তুলে ধরেন।

 

তাই কৃষকদের ওপর নতুন করে ঋণের বোঝা না চাপিয়ে সার ও বীজের মতো মৌলিক কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করতে এই কৃষক কার্ড দেওয়া হচ্ছে। সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও সরকার এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সচেষ্ট রয়েছে।

 

দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সর্বজনীন প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার সরকারি সিদ্ধান্তের কথাও সেমিনারে উঠে আসে। অর্থমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন যে, এই উদ্যোগের ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমবে এবং ব্যক্তিগত সঞ্চয় বৃদ্ধি পাবে।

 

এছাড়াও গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটি, মৃৎশিল্প বা তাঁতশিল্পকে আধুনিক ইন্টারনেটভিত্তিক বাণিজ্যিক মাধ্যমের সাথে যুক্ত করে সৃজনশীল অর্থনীতির মাধ্যমে জাতীয় আয়ে অবদান বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

 

পাশাপাশি দেশের সংগীত, নাটক ও চলচ্চিত্র খাতকে বাণিজ্যিকভাবে সফল করে তুলতে পূর্বাচলে একটি আধুনিক নাট্যপল্লি গড়ার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানান। দেশের কর ও দেশজ উৎপাদনের আনুপাতিক হার অত্যন্ত হতাশাজনক বলে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী।

 

আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে সরকারি অর্থায়ন কমে আসার প্রেক্ষাপটে বড় আকারের ঋণের জন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে তিনি পুঁজিবাজারকে পুনরুজ্জীবিত করার ওপর জোর দেন।

 

তিনি জানান, পুঁজিবাজারে সুশাসন ফেরাতে সম্পূর্ণ পেশাদার ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যক্তিদের নিয়ে একটি নতুন কমিশন গঠন করা হয়েছে। বিভিন্ন আইনি ও কর কাঠামোগত সংস্কারের কারণে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তহবিল ব্যবস্থাপকরা ইতিমধ্যে বাংলাদেশে বিনিয়োগে গভীর আগ্রহ দেখাচ্ছেন, যা দেশের অর্থনীতিকে ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে সহায়তা করবে।

 

বর্তমান সরকারকে প্রায় এক লাখ পঁচিশ হাজার কোটি টাকার বিশাল ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হচ্ছে, যার ফলে সরকারের আর্থিক সক্ষমতার পরিসর অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে বলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

 

এত বাধা সত্ত্বেও আগামী দিনে দেশে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও গতিশীলতা আনতে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক তথ্যফলক ব্যবহারের ঘোষণা দেন তিনি।

 

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো থেকে সরাসরি প্রতিদিনের কাজের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোথাও কোনো ধীরগতি বা বিচ্যুতি দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

 

সবশেষে অর্থমন্ত্রী আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, প্রস্তাবিত বাজেটের অন্তত আশি শতাংশ সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে দেশের কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করা সম্ভব হবে।

 

সেমিনারটিতে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির আহ্বায়ক ড. মাহবুব উল্লাহ্ এবং সঞ্চালনার দায়িত্ব পালন করেন সমিতির সদস্য সচিব ড. মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক।

 

এছাড়া প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত থেকে মূল্যবান মতামত ব্যক্ত করেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আবু আহমেদ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ড. ইমরান মতিন।

 

পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বিআইডিএস এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক বরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও গবেষক এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।