শুক্রবার, জুন ২৬, ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লাল গালিচা সংবর্ধনা

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ০৭:১৫ পিএম

বেইজিংয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লাল গালিচা সংবর্ধনা
ছবি: সংগৃহীত

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাজকীয় অভ্যর্থনা জানানো হয়েছে। চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং ঐতিহ্যবাহী ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’ প্রাঙ্গণে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানকে উষ্ণ ও আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান।

 

বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে চারটায় আয়োজিত এই বর্ণাঢ্য সম্মাননা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রীয় লাল গালিচা সংবর্ধনা এবং সম্মানসূচক ‘গার্ড অব অনার’ প্রদান করা হয়।

 

এই রাষ্ট্রীয় আয়োজনের মধ্য দিয়ে এশিয়ার এই দুই গুরুত্বপূর্ণ দেশের মধ্যকার গভীর কূটনৈতিক সম্পর্ক, ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে উন্মোচিত হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই উষ্ণ অভ্যর্থনা দুই দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্কের জন্য একটি অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা বহন করছে। এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সফরের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিল বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নেওয়া বেশ কিছু যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত।

 

জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা ও রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুই দেশের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে বিভিন্ন উদীয়মান খাতে মোট ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কূটনৈতিক মহল ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই চুক্তিগুলো দুই দেশের মধ্যকার চলমান অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোকে একটি সম্পূর্ণ নতুন ও সুদৃঢ় উচ্চতায় নিয়ে যেতে সক্ষম হবে।

 

স্বাক্ষরিত এই চুক্তিগুলোর মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে আরও বেশি কার্যকর হবে এবং বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নে চীনের অংশীদারিত্ব আরও প্রসারিত হবে বলে গভীরভাবে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

 

প্রধানমন্ত্রীর চলমান এই চীন সফর এবং এর আগের কূটনৈতিক কর্মসূচিগুলো আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ গুরুত্ব বহন করছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠনের পর এটিই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সফর।

 

সরকারপ্রধান হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি তার প্রথম সরকারি সফরে গত ২১ জুন দুই দিনের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র মালয়েশিয়া গমন করেন।

 

সেখানে শীর্ষ নেতাদের সাথে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শেষে তিনি গত সোমবার রাতে চীনের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র দালিয়ান শহরে এসে পৌঁছান।

 

দালিয়ানে অবস্থানকালে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ ও বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারকারী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সেখানে তিনি বৈশ্বিক অর্থনীতি, ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সম্ভাবনা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন এবং দুই দিনব্যাপী বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বহুপাক্ষিক কর্মসূচি অত্যন্ত সফলতার সাথে সম্পন্ন করেন।

 

দালিয়ানের এই অত্যন্ত ব্যস্ত ও সফল কর্মসূচি সমাপ্ত করার পর তিনি গত বুধবার বিকেলে চীনের আধুনিক প্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম প্রতীক দ্রুতগতির বুলেট ট্রেনে করে রাজধানী বেইজিংয়ে এসে পৌঁছান।

 

বেইজিংয়ের বিখ্যাত গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ দুই দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে নিজ নিজ দেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

 

এই বিশেষ ও তাৎপর্যপূর্ণ শীর্ষ বৈঠকের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক তথ্য তুলে ধরেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, এই শীর্ষ সম্মেলনে মূলত বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আগামীতে আরও কীভাবে অর্থবহ ও গতিশীল করা যায়, তা নিয়ে বিশদ ও খোলামেলা আলোচনা হবে।

 

এর পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রসার, ব্যাপকভিত্তিক বিদেশি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ মেগা কাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর দ্রুত বাস্তবায়ন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিষয়গুলোও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে এই উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় স্থান পাবে।

 

সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক চীন সফর, যা দেশের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে চীনের এই ঐতিহাসিক গ্রেট হলের সাথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দীর্ঘদিনের একটি স্মৃতি নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে।

 

এর আগে ২০০১ সালে তৎকালীন সরকারপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চীন সফরের সময় তিনি সফরসঙ্গী হিসেবে বেইজিং এসেছিলেন। কাকতালীয়ভাবে সেই সময়েও তিনি গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ আয়োজিত প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে দেওয়া লাল গালিচা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন।

 

দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় পর এবার তিনি নিজেই স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে সেই একই স্থানে দাঁড়িয়ে চীনের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা গ্রহণ করলেন, যা এই সফরের একটি অন্যতম ঐতিহাসিক, আবেগঘন ও তাৎপর্যপূর্ণ দিক হিসেবে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।