শুক্রবার, জুন ২৬, ২০২৬
১১ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মা ও তিন বোনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ সিফাত, এক নিমিষেই শেষ সাজানো সংসার

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৫ জুন, ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম

মা ও তিন বোনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ সিফাত, এক নিমিষেই শেষ সাজানো সংসার
ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলায় এক ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একটি পরিবারের চার নারী সদস্য মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। বৃহস্পতিবার, পঁচিশে জুন সকালে নিজ বাসায় অত্যন্ত নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় এক মা এবং তাঁর তিন মেয়েকে।

 

এই অকল্পনীয় ও নৃশংস ঘটনার পর ওই পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য, আঠারো বছর বয়সী তরুণ সিফাত হোসেন তার মা এবং তিন বোনকে চিরতরে হারিয়ে সম্পূর্ণ বাকরুদ্ধ ও দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

 

আজ থেকে প্রায় সাত বছর আগে পিতাকে হারানোর পর যে পরিবারটি চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর নিরন্তর চেষ্টা করছিল, এক নিমিষেই সেই সাজানো সংসারটি যেন এক বিভীষিকাময় মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে।

 

স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইতোমধ্যে এই মর্মান্তিক ঘটনার গভীর তদন্ত শুরু করেছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, নিহতরা হলেন পরিবারের প্রধান আটত্রিশ বছর বয়সী মা শাহিনুর বেগম এবং তাঁর তিন মেয়ে-একুশ বছর বয়সী সায়মা আক্তার, সতেরো বছর বয়সী ইকরা আক্তার এবং নয় বছর বয়সী শিশু শিফা আক্তার।

 

স্থানীয় বাসিন্দা ও আত্মীয়দের তথ্যমতে, পরিবারটির জীবনে এই বিপর্যয় একেবারেই নতুন নয়। আজ থেকে ঠিক সাত বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৯ সালে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যুবরণ করেন সিফাতের বাবা কামাল হোসেন।

 

স্বামীর এমন আকস্মিক ও অকালমৃত্যুর পর তিন মেয়ে ও একমাত্র ছোট ছেলেকে নিয়ে অথৈ সাগরে পড়েন শাহিনুর বেগম। জীবনের প্রতিটি পদে অনেক কষ্ট, বাধা-বিপত্তি ও সীমাহীন ত্যাগের বিনিময়ে তিনি সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করার কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

 

কিন্তু বৃহস্পতিবার সকালে এক অজ্ঞাত ও অশুভ কারণে তাঁদের জীবনে নেমে আসে এক ভয়াবহ কালো মেঘ। ঘাতকের নির্মম ও নিষ্ঠুর অস্ত্রের আঘাতে অকালেই নিভে যায় একই পরিবারের সম্ভাবনাময় চারটি তরতাজা প্রাণ।

 

সৌভাগ্যক্রমে ভয়াবহ এই ঘটনার সময় বাসায় উপস্থিত না থাকায় প্রাণে বেঁচে যান পরিবারের একমাত্র ছেলে সিফাত হোসেন। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে এবং সংসারের হাল ধরতে নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত চাকরি করতেন।

 

অন্যান্য সাধারণ দিনের মতোই বৃহস্পতিবার সকালেও তিনি তাঁর বাসার কাছাকাছি অবস্থিত নিজ কর্মস্থলে চলে যান। রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম মুরাদ গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, প্রতিদিনের মতো সকালে সিফাত যথারীতি দোকানে তার কাজে যোগ দেয়।

 

কিন্তু বেলা আনুমানিক এগারোটার দিকে হঠাৎ করেই খবর আসে যে, তার মা ও তিন বোনকে বাসায় ঢুকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদের বর্তমান বাসাটি ছিল মুরাদের দোকানের ঠিক পেছনেই। এমন ভয়ানক ও অকল্পনীয় দুঃসংবাদ শোনার পর সিফাত দ্রুত তার বাসায় ছুটে যান।

 

সেখানে গিয়ে পরিবারের সবার রক্তাক্ত ও নিথর দেহ মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখে তিনি বুক চাপড়ে এক গগনবিদারী কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাঁর সেই হৃদয়ছেঁড়া আর্তনাদে চারপাশের পরিবেশ চরম ভারী হয়ে ওঠে এবং সেখানে উপস্থিত কোনো মানুষই নিজেদের চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

 

আকস্মিক এই শোকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া সিফাতকে স্থানীয় লোকজন প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান এবং প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে পুনরায় বণিক সমিতির নেতার বাসায় সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হয়।

 

হতভাগ্য এই পরিবারের সন্তানেরা চরম দারিদ্র্য ও নানা প্রতিকূলতার মাঝেও নিজেদের পড়াশোনায় অত্যন্ত মনোযোগী ও নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন। সিফাত নিজে বর্তমানে রায়পুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত আছেন।

 

তাঁর বড় বোন নিহত সায়মা আক্তার ছিলেন একজন অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল ছাত্রী। বাবার আকস্মিক মৃত্যুর সময় তিনি রায়পুর মার্চেন্টস একাডেমিতে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনা করতেন। পরবর্তীতে তিনি রাজধানীর স্বনামধন্য আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

 

নিহত সায়মার সাবেক সহপাঠী প্রমি আক্তার সংবাদমাধ্যমের কাছে অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানান যে, সায়মা বরাবরই একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তির জন্য তিনি নিরলস প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

 

মেজো বোন ইকরা আক্তার স্থানীয় লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজে দ্বাদশ শ্রেণির নিয়মিত ছাত্রী ছিলেন এবং সবার ছোট শিফা আক্তার স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করত। শত অভাব ও টানাপোড়েনের সংসারেও মা শাহিনুর বেগম সন্তানদের শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার যে স্বপ্ন সযত্নে লালন করেছিলেন, ঘাতকের মাত্র এক নির্মম আঘাতে তা চিরতরে ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

 

এদিকে, দিনেদুপুরে এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পরপরই স্থানীয় শত শত ক্ষুব্ধ জনতা ঘটনাস্থলে জড়ো হতে শুরু করে। একপর্যায়ে তারা রতন মজুমদার নামের আটাশ বছর বয়সী এক বহিরাগত যুবককে এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত সন্দেহে আটক করে এবং ব্যাপক গণপিটুনি দেয়।

 

উত্তেজিত জনতার ক্ষোভের মুখে পিটুনির শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই ওই যুবকের মৃত্যু হয়। রায়পুর থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীন মিয়া এই ভয়াবহ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বিপুলসংখ্যক পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিজেদের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়।

 

তিনি গণমাধ্যমকে আরও জানান, নিহত শাহিনুর বেগমের পরিবারের মূল আদি নিবাস কুমিল্লা জেলায়। পরিবারের একমাত্র জীবিত সদস্য সিফাতের মাধ্যমে তাঁদের গ্রামের বাড়ির আত্মীয়স্বজনকে খবর দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

নিহত চারজনের মরদেহ বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্তের জন্য সরকারি হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। আত্মীয়স্বজনরা সেখানে পৌঁছানোর পর যাবতীয় আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহগুলো তাঁদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

 

অন্যদিকে, গণপিটুনিতে নিহত সন্দেহভাজন যুবক রতন মজুমদারের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচরে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হলেও, তার সঠিক পরিচয় ও ঠিকানার বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখনো তাদের বিস্তারিত ও নিবিড় অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে।