একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক কাঠামোতে স্থানীয় সরকারের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এখান থেকেই সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক সেবা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সরাসরি পরিচালিত হয়। এই ধারাবাহিকতায় আগামী অক্টোবর মাস থেকেই সারা দেশে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের সার্বিক ও চূড়ান্ত প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে সাংবিধানিক এই প্রতিষ্ঠানটি।
এই নির্বাচনি মহাযজ্ঞের আনুষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে চলতি জুলাই অথবা আগামী আগস্ট মাসের মধ্যেই প্রথম ধাপের বহুল প্রতীক্ষিত নির্বাচনি তফসিল ঘোষণা করা হতে পারে বলে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।
বুধবার বিকেলে রাজধানীর নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় তিনি আসন্ন নির্বাচনকেন্দ্রিক এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন। নির্বাচন কমিশনার তার বক্তব্যে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, নির্বাচন কমিশন একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দিতে বদ্ধপরিকর।
বিশেষ করে যেসব স্থানীয় সরকার এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই এবং আইনি জটিলতা বা অন্য কোনো কারণে যেগুলোর মেয়াদ ইতোমধ্যে উত্তীর্ণ হয়ে গেছে, আসন্ন প্রথম ধাপের নির্বাচনে সেই এলাকাগুলোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
স্থানীয় পর্যায়ের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা এবং সাধারণ ভোটারদের নিরাপত্তার বিষয়টি গভীরভাবে বিবেচনা করে নির্বাচন কমিশন একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। পরিস্থিতি ও প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধাজনক স্থানগুলোতে উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন একই সঙ্গে আয়োজন করার সম্ভাবনা রয়েছে।
এর ফলে যেমন রাষ্ট্রের নির্বাচনি ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাবে, তেমনি স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রমেও দ্রুত গতিশীলতা আসবে বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে। এই নির্বাচনে প্রবাসীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার।
তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রবাসীদের জন্য ডাকযোগের মাধ্যমে বা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার যে আধুনিক সুবিধাটি নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে আলোচনা হচ্ছিল, তা আপাতত আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যকর থাকছে না।
এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীদের ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণের বিষয়েও এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারেনি কমিশন। তবে বিষয়টি নিয়ে নীতি-নির্ধারকদের মধ্যে বিশদ পর্যালোচনা চলমান রয়েছে।
দেশের উচ্চ আদালতের বিভিন্ন সময় দেওয়া নির্দেশনা এবং পার্শ্ববর্তী গণতান্ত্রিক দেশগুলোর আইনি কাঠামো ও নির্বাচনি ব্যবস্থা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে অদূর ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সময়োপযোগী ও যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে তিনি গণমাধ্যমকে আশ্বস্ত করেন।
নির্বাচনি আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর কারণে আসন্ন নির্বাচন কোনোভাবেই বিলম্বিত হওয়ার সুযোগ নেই বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অত্যন্ত জোরালোভাবে জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেন যে, দেশে বর্তমানে যে আইনি কাঠামো বিদ্যমান রয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই একটি সম্পূর্ণ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্পন্ন করা সম্ভব।
সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু আইনি অস্পষ্টতা পরিলক্ষিত হয়েছিল। মূলত সেই অস্পষ্টতাগুলো দূর করতে এবং নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করতে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণসহ আইনের কিছু সংশোধনের প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হচ্ছে।
যদি যথাসময়ের মধ্যে প্রস্তাবিত সংশোধিত আইনটি কার্যকর হয়, তবে নতুন আইনেই নির্বাচন পরিচালিত হবে। আর যদি কোনো কারণে সেটি কার্যকর হতে বিলম্ব হয়, তবে বিদ্যমান আইনেই পূর্বনির্ধারিত সময়ে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। অর্থাৎ, আইনি সংস্কারের দোহাই দিয়ে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
তৃণমূল পর্যায়ে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে নির্বাচনি আচরণবিধি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনার কাজ প্রায় শেষ করে এনেছে। সংশোধিত ও যুগোপযোগী এই আচরণবিধির চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য খুব শিগগিরই তা আইন মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হবে।
স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার ও আধিপত্যকে কেন্দ্র করে প্রায়শই যে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে, তা কঠোর হস্তে দমন করতে কমিশন বদ্ধপরিকর। এর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রাখা হবে এবং নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা হবে।
একই সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের বর্তমান প্রশাসকদের আসন্ন ভোটে অংশগ্রহণের বিষয়ে যে আইনি অস্পষ্টতা বা ধোঁয়াশা রয়েছে, নির্বাচন কমিশন খুব দ্রুতই তা দূর করে সকল প্রার্থীর জন্য একটি সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার।