অভিযোগ উঠেছে, বিগত সরকারের আমলে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) তৎকালীন সভাপতি শেখ কবীর হোসেন নিজের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যেভাবে নিবন্ধন ফি সাড়ে তিন টাকা থেকে কমিয়ে এক টাকা করেছিলেন, বর্তমান প্রশাসনও অনেকটা সেই একই পথে হাঁটছে।
এর ফলে বীমা কোম্পানিগুলো সাময়িকভাবে আর্থিকভাবে লাভবান হলেও আইডিআরএ তার নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক সক্ষমতা চিরতরে হারাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বীমা খাতের সামগ্রিক সংকট ও এই নিবন্ধন ফি প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, আইডিআরএ-এর জন্য নিবন্ধন ফি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি রাজস্ব উৎস, কারণ নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির আয়ের অন্য কোনো উল্লেখযোগ্য খাত নেই।
তিনি উল্লেখ করেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর বীমা খাতের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এবং অংশীজনদের সার্বিক মতামতের ভিত্তিতে এই ফি যৌক্তিকভাবে আড়াই টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কিন্তু বর্তমান চেয়ারম্যান কোনো ধরনের পূর্ব আলোচনা ছাড়াই তা কমিয়ে পুনরায় এক টাকা করার যে চেষ্টা করছেন, তা নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ড. ইমাম আরও যুক্ত করেন, ফি কমানোর পেছনে ‘ব্যবসাবান্ধব’ পরিবেশ তৈরির যে খোঁড়া যুক্তি দেওয়া হচ্ছে, তা বাস্তবতার সঙ্গে একেবারেই সংগতিপূর্ণ নয়।
বর্তমানে দেশের ৮২টি বীমা কোম্পানির মধ্যে প্রায় ৪২টিরই আর্থিক ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে এবং অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে। শুধুমাত্র নিবন্ধন ফি কমালে এসব প্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত দুর্বলতার কোনো স্থায়ী সমাধান হবে না।
বরং ব্যাংকিং খাতের মতো এখানেও একটি বিশেষ রেজোলিউশন আইন প্রণয়ন করা জরুরি, যার মাধ্যমে দুর্বল কোম্পানিগুলোর একীভূতকরণ বা অবসায়নের মতো কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বীমা কোম্পানির নিবন্ধন ফি ছিল প্রতি এক হাজার টাকা প্রিমিয়ামের বিপরীতে সাড়ে তিন টাকা। পরবর্তীতে তৎকালীন বিআইএ সভাপতি প্রভাব খাটিয়ে ভারতের বীমা বাজারের উদাহরণ দেখিয়ে দেশীয় বীমা খাতের সক্ষমতা বিবেচনা না করেই তা কমিয়ে এক টাকা নির্ধারণ করিয়েছিলেন।
সেই সময়ে এই নীতি পরিবর্তনের পেছনে বড় ধরনের অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছিল। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আইডিআরএ-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন ড. এম. আসলাম আলম।
তিনি গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও ডিজিটাল আধুনিকায়নের লক্ষ্যে গত বছরের ডিসেম্বরে নিবন্ধন ফি এক টাকা থেকে বাড়িয়ে আড়াই টাকা নির্ধারণ করেন, যার প্রজ্ঞাপন ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে জারি হয়।
তবে চলতি বছরের ২ মার্চ তিনি পদত্যাগ করার পর বীমা কোম্পানিগুলো পুনরায় এই বর্ধিত ফি নিয়ে আপত্তি তোলে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের (এফআইডি) কাছে এটি পুনর্বিবেচনার জোরালো দাবি জানায়।
গত ১৮ জুন মীর নাদিয়া নিভিন আইডিআরএ-এর নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর অদৃশ্য চাপে এফআইডি-এর অবস্থান পরিবর্তন হয় এবং ফি পুনরায় এক টাকায় নামিয়ে আনার প্রশাসনিক কাজ শুরু হয়। আর্থিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, আড়াই টাকা ফি বহাল থাকলে ২০২৬ সালে আইডিআরএ-এর সম্ভাব্য আয় হতো প্রায় ৪৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
কিন্তু এটি এক টাকায় নেমে এলে সম্ভাব্য আয় দাঁড়াবে মাত্র ১৮ কোটি ২৫ লাখ টাকায়। অর্থাৎ একটিমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের কারণে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি প্রায় ২৭ কোটির বেশি রাজস্ব হারাবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুল অর্থ আইডিআরএ-এর তদারকি কার্যক্রম, ঝুঁকিভিত্তিক সুপারভিশন, আইটি সিস্টেম বা ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হওয়ার কথা ছিল।
ফি কমানোর কারণে এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এর পাশাপাশি, যেসব কোম্পানি সাধারণ গ্রাহকদের বীমা দাবি পরিশোধ করছে না, তাদের জন্য নতুন চেয়ারম্যানের বেইল আউট বা আর্থিক সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণার পরিকল্পনা পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করেছে, যা খাতটির ভবিষ্যতের জন্য একটি অশনিসংকেত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে আইডিআরএ-এর বর্তমান চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান, বীমা কোম্পানিগুলোর ২০২৬ সালের নবায়ন আবেদনের শেষ সময় ছিল ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর।
সে সময় আইনিভাবে নিবন্ধন ফি এক টাকাই নির্ধারিত ছিল এবং কোম্পানিগুলো সেই হারেই ফি জমা দিয়েছিল। পরবর্তীতে আড়াই টাকা নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি হলেও সম্পূর্ণ আইনি মতামতের ভিত্তিতেই ২০২৬ সালের জন্য পূর্বের এক টাকা ফি বহাল রাখা হয়েছে।
সংশোধিত প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ২০২৭ ও ২০২৮ সাল থেকে বর্ধিত আড়াই টাকা ফি পুরোপুরি কার্যকর হবে। তিনি জোরালোভাবে দাবি করেন, এই সিদ্ধান্তে কোনো ধরনের ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতিত্ব নেই এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতেই তা গ্রহণ করা হয়েছে।
এছাড়া, নিজের পছন্দের লোক নিয়োগের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে তিনি স্পষ্ট জানান যে, জনপ্রশাসন অনুমোদিত ১৫৫ জনের জনবল কাঠামো বর্তমানে শতভাগ পূর্ণ রয়েছে এবং সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতির কারণে নতুন করে কাউকে নিয়োগ বা চাকরিচ্যুত করার কোনো সুযোগ এই মুহূর্তে নেই।