বুধবার, জুলাই ২২, ২০২৬
৬ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

অনলাইন জুয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা বরখাস্ত

আর এন এস ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২ জুলাই, ২০২৬, ১২:৫২ এএম

অনলাইন জুয়ায় জড়িত থাকার অভিযোগে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা বরখাস্ত
ছবি: সংগৃহীত

দেশের কেন্দ্রীয় আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পদস্থ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়ম, ডিজিটাল প্রতারণা, নিষিদ্ধ অনলাইন জুয়া এবং অবৈধ ভার্চুয়াল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের মতো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

 

এই অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা এবং চলমান পুলিশি তদন্তের পরিপ্রেক্ষিতে রকিবুল হাসান খান রকি নামের ওই সহকারী পরিচালককে তাঁর পদ থেকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন চাঞ্চল্যকর অভিযোগ আর্থিক খাত ও জনমনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।

 

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ প্রশাসন গত রোববার এক বিশেষ অফিস আদেশের মাধ্যমে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যা আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ ও পেশাদার সংবাদ উপস্থাপনার মতোই ব্যাপক গুরুত্ব বহন করছে।

 

বাংলাদেশ ব্যাংকের জারি করা ওই আনুষ্ঠানিক আদেশে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা সাইবার অপরাধ ও আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল।

 

তাই বাংলাদেশ ব্যাংক স্টাফ রেগুলেশনস, ২০০৩-এর ৪৫(৫) ধারার বিধান অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও তদন্তের স্বার্থে তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে আইন অনুযায়ী, এই বরখাস্তকালীন সময়ে তিনি সম্পূর্ণ বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত হবেন না।

 

বাংলাদেশ ব্যাংক প্রশাসনিক নির্দেশিকা, ২০০৩-এর ২১(ক) ধারায় বর্ণিত নিয়মাবলি অনুসরণ করে তিনি নির্ধারিত হারে তাঁর জীবিকা ভাতা বা খোরপোষ ভাতা নিয়মিতভাবে প্রাপ্য হবেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, আদেশটি জারির মুহূর্ত থেকেই তা কার্যকর বলে গণ্য হয়েছে।

 

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার সবচেয়ে নাটকীয় অধ্যায়টি রচিত হয় গত সপ্তাহে, যখন দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বিশেষায়িত দল সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে।

 

নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন প্রধান মো. শফিকুল ইসলামের প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই আকস্মিক অভিযান চালানো হয়েছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল অভিযুক্ত সহকারী পরিচালক রকিবুল হাসানকে নিজ কার্যালয় থেকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা।

 

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি টের পেয়ে অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। পুলিশ ও অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থা তাঁকে গ্রেপ্তারের জন্য সম্ভাব্য সকল স্থানে চিরুনি অভিযান অব্যাহত রেখেছে, তবে প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত তাঁকে আইনের হেফাজতে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

 

গোয়েন্দা পুলিশ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ তদন্তকারী সূত্রগুলো সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে যে, রকিবুল হাসানের আর্থিক লেনদেনের ধরন ছিল অত্যন্ত জটিল ও সন্দেহজনক। দেশের বিভিন্ন প্রথম সারির বাণিজ্যিক ব্যাংকে তাঁর নিজ নামে এবং বেনামে একাধিক ব্যাংক হিসাব বা অ্যাকাউন্ট পরিচালনার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে।

 

এসব হিসাব ব্যবহার করে বিগত কয়েক মাসে কোটি কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। তদন্তকারীদের ধারণা, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মূলত অবৈধ অনলাইন জুয়া বা বেটিং প্ল্যাটফর্ম এবং আন্তর্জাতিক নিষিদ্ধ ভার্চুয়াল মুদ্রার বাজার থেকে উপার্জিত।

 

একজন কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্মকর্তা হয়েও দেশের প্রচলিত আর্থিক আইন অমান্য করে এহেন কার্যকলাপে যুক্ত থাকার বিষয়টি রাষ্ট্রের সাইবার নিরাপত্তা ও আর্থিক কাঠামোর জন্য এক বিশাল হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। ইতিমধ্যেই এই গুরুতর অপরাধের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

 

বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আনুষ্ঠানিক অবস্থান অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও কঠোর। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও দায়িত্বপ্রাপ্ত মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সংবাদমাধ্যমের কাছে এই বরখাস্তের খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

 

তিনি অত্যন্ত পেশাদার মনোভাব নিয়ে গণমাধ্যমকে জানান যে, রকিবুল হাসানের বিরুদ্ধে কেবল সাধারণ কোনো অনিয়ম নয়, বরং সাইবার অপরাধ, অনলাইন বেটিং এবং অন্যান্য অত্যন্ত গুরুতর আইনি অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে।

 

মুখপাত্র ব্যাখ্যা করে বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রচলিত ও অপরিবর্তনীয় নিয়ম অনুযায়ী, যদি কোনো কর্মরত কর্মচারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয় এবং পুলিশি তদন্ত শুরু হয়, তবে সেই তদন্ত প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করে রাখা বাধ্যতামূলক।

 

এটি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করার স্বার্থেই করা হয়ে থাকে। তবে তিনি এ কথাও পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, আইনি প্রক্রিয়ায় যদি ওই কর্মকর্তা নির্দোষ প্রমাণিত হন এবং আদালত থেকে অব্যাহতি লাভ করেন, তবে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর বরখাস্তের আদেশ প্রত্যাহার করে তাঁকে পুনরায় স্বপদে বহাল করা হবে।

 

পরিশেষে, দেশের সর্বোচ্চ ব্যাংকিং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভ্যন্তরে এমন একটি ঘটনা প্রতিষ্ঠানের নজরদারি ও কর্মীদের নৈতিকতার মাপকাঠি নিয়ে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে সারা দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবৈধ ভার্চুয়াল মুদ্রা এবং মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশনা প্রদান করে থাকে, সেখানে খোদ নিজেদের একজন কর্মকর্তার এমন আন্তর্জাতিক সাইবার অপরাধ চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সত্যিই উদ্বেগজনক।

 

এখন দেখার বিষয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কত দ্রুত এই পলাতক কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি করতে পারে এবং এই বিশাল আর্থিক জালিয়াতির নেপথ্যে আর কারও ইন্ধন রয়েছে কি না, তা জনসমক্ষে উন্মোচন করতে পারে।