রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সমসাময়িক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার নানা দিক নিয়ে আয়োজিত এক বিশেষ ও জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি গণমাধ্যমের সামনে এই মন্তব্য করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে রাতের আঁধারে অতর্কিত ককটেল বিস্ফোরণ এবং রাস্তার পাশে পার্কিং করে রাখা যাত্রীবাহী বাসে অগ্নিসংযোগের মতো নাশকতামূলক ঘটনার তীব্র সমালোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, তথাকথিত লকডাউন কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেই মূলত দেশে একটি অস্থিতিশীল ও ভীতিকর পরিবেশ তৈরির অপতৎপরতা চালানো হয়েছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তবে সরকার এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক ও কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
ইতোমধ্যে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত আসামিদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেলসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এমনকি সুপ্রিম কোর্ট সংলগ্ন হাইকোর্ট ফটক এবং রাজধানীর ব্যস্ততম যাত্রাবাড়ী এলাকায় ঘটা অনাকাঙ্ক্ষিত নাশকতার ঘটনাগুলোর সঙ্গে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল, তাদের অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
এর পাশাপাশি, ঘটনাস্থল ও এর আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ এবং অন্যান্য প্রযুক্তিগত তথ্য নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করে অন্যান্য নাশকতামূলক ঘটনায় জড়িত দুর্বৃত্তদের দ্রুত শনাক্ত করার কাজও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে পুরোদমে চলমান রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, সাধারণ মানুষ ও সরকার এসব বিচ্ছিন্ন অপতৎপরতায় বিন্দুমাত্র শঙ্কিত নয়; বরং দেশের শান্তিকামী ও সচেতন নাগরিক সমাজ ইতোমধ্যে এসব সহিংস কর্মকাণ্ড এবং এর নেপথ্যের কুশীলবদের সম্পূর্ণভাবে বর্জন ও প্রত্যাখ্যান করেছে।
অন্যদিকে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গণতান্ত্রিক চর্চা এবং বিরোধী দলের বিভিন্ন কর্মসূচির বিষয়েও অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি জানান, একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে যেকোনো রাজনৈতিক দলের গঠনমূলক সমালোচনা করার এবং জনমত গঠনে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করার পূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে।
এর একটি উজ্জ্বল ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে তিনি সম্প্রতি দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম এবং উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় অনুষ্ঠিত বিরোধী দলের দীর্ঘ লংমার্চ কর্মসূচির কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন।
এই বৃহৎ রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলো সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে এবং কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ছাড়াই সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অত্যন্ত পেশাদারিত্বের সঙ্গে বিরোধী দলের এই কর্মসূচিতে তাদের সার্বিক নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করেছে, যা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক।
রাজনীতিতে সবসময় জনমতের মাধ্যমেই সবকিছুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে বলে তিনি মনে করেন। তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, বর্তমান সরকারের প্রধান ও পবিত্র দায়িত্ব হলো দেশে যেকোনো মূল্যে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দীর্ঘদিনের লালিত বিচারহীনতার সংস্কৃতির সম্পূর্ণ মূলোৎপাটন করে যেকোনো অপরাধের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা, যাতে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনে দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের মতো সবচেয়ে আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ইস্যু নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক ও অস্থিতিশীল মূল্যবৃদ্ধি এবং বিগত সরকারগুলোর দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে চরম ব্যর্থতা ও উদাসীনতাকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
বিগত আমলের পুঞ্জীভূত অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি এবং ভবিষ্যৎ দূরদর্শিতার অভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বর্তমানে এক ধরনের সাময়িক সংকট তৈরি হলেও, বর্তমান সরকার দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের দিকে সর্বোচ্চ ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মনোযোগ নিবদ্ধ করেছে।
দেশের ক্রমবর্ধমান শিল্প খাতে গ্যাসের নিরবচ্ছিন্ন ও স্থিতিশীল সরবরাহ বজায় রাখার লক্ষ্যে আগামী ২০৩০-৩১ সালের মধ্যে দেশজুড়ে নতুন ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের একটি বৃহৎ, সময়োপযোগী ও কৌশলগত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
এই মহাপরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস গ্যাসক্ষেত্রের ২৮ নম্বর কূপ থেকে দৈনিক আরও ১২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সফলভাবে উত্তোলন করে তা জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে একটি বড় স্বস্তি এনেছে।
নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ও পরিকল্পিত ব্যবহারের মাধ্যমেই বাংলাদেশ খুব দ্রুত গ্যাসে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হবে এবং এর মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের একটি স্থায়ী ও টেকসই সমাধান মিলবে বলে তিনি অত্যন্ত দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে রাজধানীর তেজগাঁও এলাকার একটি সাম্প্রতিক ও স্পর্শকাতর ঘটনা প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের করা প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
তিনি জানান, গত শুক্রবার তেজগাঁওয়ের একটি মসজিদে জুমার নামাজ শেষে কতিপয় ব্যক্তি সন্দেহজনকভাবে গোপন বৈঠকে মিলিত হলে, সুনির্দিষ্ট ও পূর্বনির্ধারিত গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সেখানে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে ২৩ জনকে আটক করে।
পরবর্তীতে আটককৃতদের ব্যবহৃত মুঠোফোনগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর যাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অপরাধ বা নাশকতার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, এমন ১১ জনকে তাদের পরিবারের জিম্মায় সসম্মানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করার যে নীতি সরকারের রয়েছে, এটি তারই প্রমাণ। তবে বাকিদের বিষয়ে প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট ও চাঞ্চল্যকর তথ্য অনুযায়ী, তারা ‘ইত্তেহাদুল উম্মাহ’ নামে সম্পূর্ণ নতুন একটি উগ্রবাদী ও চরমপন্থি সংগঠন গড়ে তোলার গভীর ও সুদূরপ্রসারী অপচেষ্টা চালাচ্ছিল।
দেশের অভ্যন্তরে যেকোনো ধরনের উগ্রবাদী তৎপরতা, সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদের বিষয়ে বর্তমান সরকারের জিরো টলারেন্স বা শূন্য সহনশীলতা নীতির কথা আবারও অত্যন্ত জোরালোভাবে স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্ত্রী জানান, জড়িত ওই ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ায় মামলা দায়ের করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী অত্যন্ত স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে এর নিবিড় তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।