জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় এবং সাধারণ ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এই কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) রাজধানী ঢাকার প্রাণকেন্দ্র বাংলাদেশ সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম, বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আয়োজিত এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থাগুলোর বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনার ধারায় দেশের বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার এই স্পর্শকাতর খাতের স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা নিয়ে অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টি রাখছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সরবরাহকৃত সাম্প্রতিক এবং নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে দেশের জ্বালানি মজুতের একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরেন।
তিনি বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে জানান যে, বিদায়ী আগস্ট মাসে দেশে মোট এক লাখ সাতান্ন হাজার সাতশত ষাট মেট্রিক টন তরলীকৃত গ্যাস সফলভাবে আমদানি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, চলমান সেপ্টেম্বর মাসের বর্তমান সময় পর্যন্ত আরও প্রায় এক লাখ আঠারো হাজার মেট্রিক টন গ্যাস দেশে এসে পৌঁছেছে।
আমদানির এই ধারাবাহিক এবং ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, দেশের বাজারে ভোক্তার চাহিদার তুলনায় সরবরাহের কোনো ঘাটতি নেই। সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উপস্থাপিত এই পরিসংখ্যানগত তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সরবরাহ শৃঙ্খল এবং মজুত পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও অত্যন্ত সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে।
একটি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নিয়ামক। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বর্তমান প্রশাসনের এই আমদানি নীতি এবং মজুত ব্যবস্থাপনা নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এর আগে, দেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর সাথে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্ণধার এবং বিপণনকারী সংস্থাগুলোর একটি অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও গঠনমূলক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে দেশের বাজারের সামগ্রিক সরবরাহ পরিস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ মজুত পরিকল্পনা নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জানান, এই বৈঠকে জ্বালানি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ীরা মন্ত্রীকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে আশ্বস্ত করেছেন যে, দেশের বাজারে বর্তমানে বিন্দুমাত্র কোনো সংকট নেই এবং অদূর ভবিষ্যতেও এমন কোনো সংকট হওয়ার গাণিতিক বা বাস্তবিক কোনো আশঙ্কা নেই।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি প্রক্রিয়া, দেশের অভ্যন্তরীণ মজুত সক্ষমতা, সরবরাহ পরিস্থিতি এবং খুচরা বাজারের মূল্যস্তর গভীরভাবে পর্যালোচনার লক্ষ্যে আয়োজিত ওই বিশেষ মতবিনিময় সভায় আমদানিকারক ও বিপণনকারী সংস্থাগুলো সরকারের কাছে এই নিশ্চয়তা প্রদান করেন।
সরকারের নীতিনির্ধারক মহল এবং বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীদের মধ্যকার এই ধরনের সরাসরি এবং উন্মুক্ত আলোচনা দেশের যেকোনো সম্ভাব্য অস্থিরতা আগে থেকেই মোকাবিলা করার জন্য একটি অত্যন্ত কার্যকরী কৌশল।
তবে, একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক বিষয় হলো-সরকারি পর্যায় এবং বেসরকারি আমদানিকারকদের কাছে পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে খুচরা বাজারে দাম অযৌক্তিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে।
সরবরাহ স্বাভাবিক থাকা সত্ত্বেও কেন ভোক্তাদের বেশি দামে এই অতিপ্রয়োজনীয় জ্বালানিটি কিনতে হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। এই প্রসঙ্গটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা কঠোর ভাষায় সতর্ক করে বলেন, কতিপয় অসাধু ব্যবসায়ী অতি মুনাফার লোভে পরিকল্পিতভাবে পণ্য মজুত করে বাজারে একটি কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অতিরিক্ত অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনমনে একটি ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করা। তিনি অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দেন যে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এই ধরনের যেকোনো অপতৎপরতা সম্পর্কে সবাইকে সর্বোচ্চ মাত্রায় সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
যারা জনগণের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাজারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করবে, তাদের কোনোভাবেই বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতির সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে ডা. জাহেদ উর রহমান আন্তর্জাতিক বাজারের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকের প্রতিও সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে বলেন, বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে এক ধরনের জল্পনামূলক প্রবণতা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতি, সরবরাহ শৃঙ্খলে অনাকাঙ্ক্ষিত বিঘ্ন এবং বড় বড় বৈশ্বিক করপোরেট সংস্থাগুলোর বাজার নিয়ন্ত্রণের অপচেষ্টার কারণে বিশ্ববাজারে প্রায়শই দামের আকস্মিক ওঠানামা দেখা যায়।
এর একটি পরোক্ষ এবং অবধারিত প্রভাব হিসেবে অনেক সময় স্থানীয় বাজারেও দাম বাড়ার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা তৈরি হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের এই অস্থিরতার অজুহাত দেখিয়ে দেশের ভেতরে যাতে কেউ অন্যায্যভাবে ফায়দা লুটতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারের গতিপ্রকৃতি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে সমন্বয় সাধন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পুরো বিষয়টি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সাধারণ ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় এবং বাজারের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকার যেকোনো ধরনের প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছে।
দৈনন্দিন রান্নার কাজ থেকে শুরু করে শিল্পকারখানার উৎপাদন-সর্বত্রই এই পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার দিন দিন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলের গণ্ডি পেরিয়ে গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও এখন এটি একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।
এমন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং স্পর্শকাতর খাতের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা যেকোনো দেশের জন্যই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে পারলেই কেবল সাধারণ মানুষ এর প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারবে।
কৃত্রিম মজুতদারদের বিরুদ্ধে এই কঠোর অবস্থান যদি মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে অচিরেই বাজার সম্পূর্ণ স্থিতিশীল হবে এবং ভোক্তাদের মনে স্বস্তি ফিরে আসবে। একটি টেকসই অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার পথে জ্বালানি নিরাপত্তার এই সুদৃঢ় ভিত্তি নিঃসন্দেহে একটি বড় মাইলফলক।